শিশুর নিরাপত্তা
সন্তানের সুরক্ষা এবং আমাদের শঙ্কিত প্রহর
মাহফুজুর রহমান মানিক
মাহফুজুর রহমান মানিক
প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:২৭ | আপডেট: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১১:১০
| প্রিন্ট সংস্করণ
সন্তান নিয়ে মা-বাবা এমনতিই উদ্বিগ্ন থাকেন। বাবা হওয়ার কারণেই তা উপলব্ধি করি। কোনো অঘটনের খবরে সে উদ্বেগ আরও বেড়ে যায়। রাজধানীর অভিভাবকদের চাপ সম্ভবত আরেকটু বেশি। প্রথম শ্রেণিতে পড়ুয়া মেয়েকে স্কুলে দিয়ে আসি। ছুটির পর নিয়ে আসতে কিছুটা দেরি হলেও চিন্তায় পড়ে যাই। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিজস্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকলেও স্বস্তি পাই না। সোমবার প্রকাশিত সমকালের ‘অনিরাপদ চারপাশ, সহজ শিকার শিশুরা’ শিরোনামই যেন আমাদের চারপাশের নির্মম বাস্তবতা তুলে ধরেছে। সন্তানের নিরাপত্তা নিয়ে যেমন অভিভাবকের চিন্তা থাকে, তেমনি তাদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও বিকাশ নিয়েও উদ্বেগ কম নয়।
এর মধ্যেই ঘটে কুমিল্লার অপ্রতিম হত্যাকাণ্ড। বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তানের এমন বেদনাদায়ক পরিণতি! নিখোঁজ হওয়ার পরদিন ১৩ বছরের শিশুটির লাশ পাওয়ার খবর মেনে নেওয়ার মতো না। এমন প্রাণবন্ত ছেলের মৃত্যুর খবরে সমাজিক মাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নেটিজেনরা। কেউ সহমর্মিতা জানিয়েছেন; কেউ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে দোষ দিয়েছেন; কেউ ভয়ংকর কিশোর গ্যাংয়ের কথা বলেছেন। কারও উদ্বেগ ছিল অন্য শিশুদের নিয়েও। মাস পাঁচেক আগে পল্লবীর শিশু ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের পরও সমাজিক মাধ্যমে মানুষের তীব্র ক্ষোভ আমরা দেখেছি। মানুষ যখনই কোনো বিষয়ে সোচ্চার হয়, সেটি সহজে প্রশাসনের কর্ণকুহরে পৌঁছে। তৎক্ষণাৎ ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হয়। তাতে লাভ এটাই; অন্তত সাময়িকভাব বিষয়টি গুরুত্ব পায়। কিন্তু স্থায়ী সমাধান হয়?
পল্লবীর শিশু হত্যাকাণ্ডের পর সরকার ব্যাপক তৎপরতা দেখিয়েছে; অল্প সময়ের মধ্যে ফাঁসির রায়ও হয়েছে। কিন্তু শিশু ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড থামেনি। প্রতি মাসেই অপরাধের পরিসংখ্যান দেখি, যা অভিভাবক হিসেবে আমাদের আরও উদ্বেগে ফেলে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে সামাজিক অপরাধ কমবে না। এদিকে হাম ও ডেঙ্গুতে শিশুমৃত্যু থেমে নেই। এ দুটি অনেকটা মহামারি আকার ধারণ করলেও এগুলো প্রতিরোধে সরকারের তৎপরতা হতাশাজনক। নিরাপত্তা ও শারীরিক স্বাস্থ্যের মতোই জরুরি বিষয় শিশুর বিকাশ। সেখানে শিশুর শিক্ষা নিয়েও অভিভাবকের বিস্তর উদ্বেগ। শিশুবান্ধব শিখন পরিবেশের কথা বলাই বাহুল্য। একই সঙ্গে আমাদের শিশুরা পানিতে ডুবে যেভাবে প্রাণ হারায়, সে পরিসংখ্যানও শিউরে ওঠার মতো।
আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কিডস রাইটস ইনডেক্সের পাঁচটি বিষয় তথা শিশুদের জীবনের অধিকার, স্বাস্থ্যের অধিকার, শিক্ষার অধিকার, নিরাপত্তা এবং পরিবেশ– সবটাতেই আমাদের নাজুক পরিস্থিতি। হতাশার বিষয় হলো, শিশু সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা নিজের ঘরেই অনেক সময় নির্যাতিত হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও শিশু নিপীড়ন ও যৌন সহিংসতার ঘটনা ঘটছে। এমনকি ছাত্ররাও শিক্ষকের যৌন লালসার শিকার হয়। সাম্প্রতিক সময়ে ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের যে চিত্র উঠে আসছে, সেটা প্রায় অবিশ্বাস্য। পরিসংখ্যান এও বলছে, শিশু যৌন নির্যাতন ও ধর্ষণের ঘটনার বেশির ভাগই ঘটিয়েছে নিকটাত্মীয়, প্রতিবেশী, পরিচিত ব্যক্তি ও শিক্ষক। অর্থাৎ শিশুর সুরক্ষার বিষয়টি শুরু করতে হবে ঘর থেকেই।
সাম্প্রতিক সময়ে শিশু নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাও বেড়ে গেছে। ৪৩ মাসে ৭২ হাজার ৪৮৯ শিশুর নিখোঁজে থানায় সাধারণ ডায়েরির ঘটনা সাধারণ বিষয় নয়। যদিও নিখোঁজ শিশুর ৯০ শতাংশের বেশি উদ্ধার হয়েছে, তারপরও উদ্বেগ থেকে যায়। অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের পর বুধবারও আমরা দেখছি, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে নিখোঁজ শিশুর লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। শিশু নিখোঁজের সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসন জোর তৎপরতা শুরু করলে হয়তো সবাইকেই জীবিত উদ্ধার সম্ভব হতো। একই সঙ্গে পরিবারেরও সতর্ক হওয়ার বিকল্প নেই। যেখানে অনিরাপদ চারপাশ সেখানে অভিভাবকের সঙ্গই শিশুর ভরসা।
এখন যেভাবে সন্তানদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আনা-নেওয়া করি, আমাদের শৈশবের চিত্র এমন ছিল না। এখনও গ্রামের শিশুরা দল বেঁধে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যায় অভিভাবকের উপস্থিতি ছাড়াই। তারপরও পরিস্থিতির কারণে বাবা-মাকে অন্তত এটা নিশ্চিত করা দরকার, সন্তানটি যেন একা না হয়ে পড়ে। দল বেঁধে গেলে বিপদের আশঙ্কা থাকে না। তবে অনেক সময় দেরি হয়ে গেলে অভিভাবকের সঙ্গ প্রয়োজন।
শিশুর সার্বিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার দায়িত্ব কেবল পরিবারের হতে পারে না। রাষ্ট্রের ভূমিকা এখানে যেমন জরুরি, তেমনি সমাজের দায়িত্বও কম নয়। একের পর এক নৃশংসতার ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর কতজন অপরাধী বিচারের আওতায় আসছে? শুধু অপরাধ সংঘটনের পর তৎপরতা কিংবা কয়েকজনকে শাস্তির আওতায় আনাই যথেষ্ট নয়। শিশু সুরক্ষায় প্রতিরোধমূলক প্রশাসনিক কাঠামো নেই বললেই চলে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর অকার্যকর টহল, দৃশ্যমান বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং সমাজজুড়ে কিশোর অপরাধের বিস্তার না থামালে পরিবারে ভয় ও শঙ্কা দূর হবে না।
শিশুদের বিকাশে প্রয়োজনীয় খেলার মাঠ নেই; শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুবান্ধব পরিবেশ গড়ে ওঠেনি। অনেক শিক্ষকেরই সঠিক প্রশিক্ষণ নেই। ফলে শিশুরা জীবনের শুরুতেই এক ধরনের চাপ ও অনিরাপদ পরিবেশে বড় হয়। ঘরের ভেতর বা বাইরের চেনা মানুষ ও শিক্ষকের হাতে যখন শিশু নির্যাতিত হয়, তখন আমরা বুঝতে পারি– সামাজিক, নৈতিক কাঠামোর পচন কতটা গভীর। শিশু সুরক্ষায় অভিভাবক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সমাজ ও রাষ্ট্রকে একসূত্রে বাঁধতেই হবে।
শিশু সুরক্ষায় আইন আছে; আন্তর্জাতিকভাবে আমাদের রাষ্ট্রীয় বাধ্যবাধকতা আছে; সংবিধান শিশু সুরক্ষার তাগিদ দিয়েছে। এমনকি শিশুশ্রম নিষিদ্ধের কথাও বলেছে। কিন্তু বাস্তবে সেগুলোর প্রয়োগ সন্তোষজনক নয়। সত্যিকারের শিশুবান্ধব সমাজ গড়ে তুলতে সর্বাগ্রে সরকারের সদিচ্ছা জরুরি। সমন্বিতভাবে শিশুর জীবন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, নিরাপত্তা, পরিবেশ– সব দিকেই নজর দিতে হবে। তবেই হয়তো অভিভাবকের স্বস্তি আসবে।
মাহফুজুর রহমান মানিক: জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক, সমকাল
mahfuz.manik@gmail.com
- বিষয় :
- মাহফুজুর রহমান মানিক