ঢাকা শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

স্মরণ

ভুল থেকে শেখার পরিবেশ তৈরি করেছিলেন তিনি

ভুল থেকে শেখার পরিবেশ তৈরি করেছিলেন তিনি
×

ইরাম মরিয়ম

প্রকাশ: ২০ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৬:৫১

| প্রিন্ট সংস্করণ

এমবিএ শেষ করার পর বুঝতে পারলাম, যে বিষয়ে পড়ালেখা করেছি, সে বিষয়ে ক্যারিয়ার গড়তে চাই না। আমার আগ্রহ ছিল উন্নয়ন খাতে। সুতরাং সেখানে চাকরি খুঁজতে শুরু করলাম। তার আগে একটি গবেষণা প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলাম। ওই প্রকল্প মূলত দেশের স্বাস্থ্য কর্মসূচি বিষয়ে গবেষণা করত। প্রকল্পের কাজে অংশ নিতে ময়মনসিংহের ত্রিশালে ব্র্যাকের স্বাস্থ্য প্রোগ্রাম দেখতে যাই। গ্রামের মায়েরা যেভাবে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কথা বলছিলেন, আর যিনি সভা পরিচালনা করছিলেন তিনি যেভাবে সবাইকে যুক্ত করছিলেন, তা দেখে খুবই অনুপ্রাণিত হই। তখন মনে হলো, সত্যি সত্যিই আমি ব্র্যাকে কাজ করতে চাই।
বাড়ি ফিরে মাকে বললাম, আমি ব্র্যাকে কাজ করব। মা হাসতে হাসতে বললেন, ব্র্যাকে যোগ দিতে হলে তো পদ খালি থাকতে হবে। এরপর আমার জীবনবৃত্তান্ত ব্র্যাকের মানবসম্পদ বিভাগে পাঠালাম। কিছুদিন পর সাক্ষাৎকারের জন্য গেলাম। সেখানে ফজলে হাসান আবেদ ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হলো। আবেদ ভাই জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কী করতে চাও? আমি বললাম, স্বাস্থ্য প্রোগ্রাম দেখে আমার খুব ভালো লেগেছে। আমি সেখানে কাজ করতে চাই। তিনি বললেন, আমরা স্বাস্থ্য নিয়ে অনেক কাজ করেছি। সামনে শিক্ষা নিয়ে অনেক কাজ হবে। আমি তোমাকে শিক্ষা প্রোগ্রামে দেব। আমাদের অনেক স্কুল করতে হবে। সাক্ষাৎকার নেওয়ার কয়েক সপ্তাহ পর একটা কল পেয়ে আবার আবেদ ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে গেলাম। তিনি বললেন, তুমি রোববার যোগ দাও। আমি যোগ দিয়েছিলাম মে মাসের ৩ তারিখ। তার ঠিক এক সপ্তাহ পর হেলথের ওপর একটা ওয়ার্কশপ হচ্ছিল। আবেদ ভাই একদিন কানিজ আপাকে বললেন, ইরাম তো যোগ দিয়েছে। ওর হেলথে কাজ করার খুব ইচ্ছা। এই ওয়ার্কশপে ইরামকেও নিয়ে এসো। 

নতুন কোনো ধারণা ও নতুন কিছু সৃষ্টি করার বিষয়ে আবেদ ভাই খুব গুরুত্ব দিতেন। তিনি বলতেন, কাজ করতে গিয়ে যদি তোমাদের মনে হয়, উদ্ভাবনী কিছু করা যাবে তাহলে করবে। কখনও বলতেন না– এটা করো, ওটা করো। এই স্বাধীনতার কারণে শিক্ষা ফর এথনিক মাইনরিটিজ, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের শিক্ষা, কিশোর-কিশোরীদের জন্য নানা ধরনের উদ্যোগ– এমন অনেক কাজ করতে পেরেছি।

আমাদের শেখার প্রক্রিয়া ছিল পুরোপুরি অভিজ্ঞতানির্ভর। ফজলে হাসান আবেদ একটি পরিবেশ তৈরি করেছিলেন, যেখানে আমরা ভুল-ভ্রান্তি করতে পারতাম এবং সেই ভুল থেকেই শিখতাম। তিনি আমাদের নিয়ে নিয়মিত বসতেন এবং আলোচনা করতেন– কী শিখলাম, কোথায় কী কাজ হচ্ছে, কী পরিবর্তন প্রয়োজন। তাঁর বৈশিষ্ট্যই ছিল শেখার প্রতি ভালোবাসা। আবেদ ভাই সবসময় বলতেন– কাজ করতে থাকো, চেষ্টা করতে থাকো, ডুইং ইজ লার্নিং।

কেউ সার্টিফিকেট বা ডিগ্রি অর্জন করলেই সব সমাধান করে দিতে পারবে– আবেদ ভাই তা মনে করতেন না। তিনি বলতেন, সমাধান কমিউনিটির মধ্যেই রয়েছে। যতক্ষণ তুমি কমিউনিটিতে না যাচ্ছ, সেখানকার মানুষদের সঙ্গে না মিশছ, ততক্ষণ তুমি সমাধান খুঁজে পাবে না। কখনও ভাববে না, তুমি কমিউনিটির সমস্যার সমাধান দিচ্ছ। বরং ভাববে, তাদের সমাধান খুঁজে পাওয়ার প্রক্রিয়াকে সহজ করছ।

আমার ৩১ বছরের কর্মজীবনে দেখেছি, অনেক কিছু করতে গিয়ে ভুল করেছি। যখন কমিউনিটি থেকে দূরে সরে গিয়ে কিছু করেছি তখনই ভুল বেশি হয়েছে। যখন কমিউনিটির সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে কাজ করেছি তখন সেখান থেকেই ভালো ফল এসেছে। আবেদ ভাইয়ের এসব বিষয় খুব ভালোভাবে জানা ছিল। 
আবেদ ভাইয়ের চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গি ছিল স্পষ্ট ও সুসংগঠিত। আশির দশকে তিনি শিশু মৃত্যুহার কমাতে কাজ করেছেন। এরপর নব্বই দশকে দেখলেন, দেশের শিক্ষাক্ষেত্রে শিশুদের ঝরে পড়া গুরুতর সমস্যা। তখন তিনি শিশুদের পড়াশোনায় সহায়তার সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর দর্শন ছিল– সরকার যেখানে পর্যাপ্ত সম্পদ ও অর্থের জোগান দিচ্ছে, আমরা সেখানে কার্যক্রম গুটিয়ে নেব। আর যেখানে দরকার সেখানে কাজ করব। এই ধারণা থেকেই ব্র্যাকের শিক্ষা প্রোগ্রাম তৈরি হয়েছে।

২০১৯ সালের শেষে আবেদ ভাইয়ের মৃত্যুর আগেও তাঁর বাসায় গিয়েছিলাম। তিনি আমাকে বললেন, ‘ইরাম, তোমরা যে শিশুদের সঙ্গে কাজ কর, তাদের স্বপ্ন দেখাতে হবে এবং সাহস দিতে হবে।’ আমি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ও মানসিকতার এক অনন্য মাত্রা অনুভব করলাম। আবেদ ভাই শুধু একটি কর্মসূচি বা 
কাজকে প্রাধান্য দিতেন না, তিনি সবসময় মানুষের কল্যাণ, শিশুদের ভবিষ্যৎ এবং তাদের সক্ষমতার দিকে মনোযোগ দিতেন। আজ মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা।

ইরাম মরিয়ম: নির্বাহী পরিচালক, ইনস্টিটিউট অব এডুকেশনাল ডেভেলপমেন্ট, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি

আরও পড়ুন

×