প্রতিস্বর
পরিকল্পনাহীনতার গল্প
ইকরাম কবীর
ইকরাম কবীর
প্রকাশ: ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৭:১২
| প্রিন্ট সংস্করণ
আমাদের জাতীয় পরিকল্পনাহীনতার সামান্য কিছু কথা বলি। অনেকে সংবাদমাধ্যমে প্রায়ই এমন দৃশ্য দেখেন, নদী বা খালের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে সেতু। কংক্রিটের সেতুর রেলিং চকচক করছে; তার মধ্যে অনেকটি আবার ১০-১৫ বছরের পুরোনো। তবে সেতুতে ওঠার কোনো রাস্তা নেই। এক পাশে কাদা, অন্য পাশে ফসলের জমি; কোথাও আবার খাদ। মানুষ সেতু দেখতে সেখানে যায়; ব্যবহার করতে নয়।
এই দৃশ্য দেখলে মনে হয়, আমরা নিজেদের সঙ্গেই তামাশা করছি। এই দৃশ্য শুধু কোনো একটি জেলা বা ইউনিয়নের নয়। এমন সেতু দেশব্যাপী ছড়িয়ে আছে। এটি আমাদের দীর্ঘদিনের রোগ; আমাদের পরিকল্পিত অপচয়, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি এবং দায়হীন শাসনের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
এ ধরনের সেতুবিষয়ক সংবাদ পড়লে সাধারণ নাগরিকের মাথায় প্রথমেই একটি সহজ-সরল প্রশ্ন আসে, রাস্তাই যদি না থাকে, তাহলে সেতু বানালেন কেন? কার জন্য এই সেতু? জনসাধারণের করের টাকা কি কেবল প্রকল্পের সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে ছবি তোলার জন্য? দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার নামে, উন্নয়নের নামে, যোগাযোগ বাড়ানোর নামে যে কোটি কোটি টাকা খরচ করা হলো, তার ফলাফল কী? যানবাহন তো দূরের কথা, মানুষই হাঁটতে পারে না।
সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, এগুলোকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে ভাবা যাচ্ছে না। দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে একই গল্প। কোথাও কালভার্ট আছে, সংযোগ সড়ক নেই। কোথাও স্কুল ভবন আছে, শিক্ষক নেই। কোথাও হাসপাতাল আছে, ডাক্তার নেই। আর কোথাও সেতু আছে, সড়ক নেই। সেতু ব্যবহারে আগ্রহী মানুষ আছে, কিন্তু পৌঁছানোর পথ নেই।
আগে টাকা খরচ করে কিছু একটা বানাও, তারপর চিন্তা কর ব্যবহার নিয়ে। এ যেন জাতীয় অভ্যাসে পরিণত। এই সেতুগুলো অনুমোদন দেয় কারা? প্রকল্প প্রস্তাবনায় কি লেখা থাকে না, সেতুর দুই পাশে সংযোগ সড়ক প্রয়োজন হবে? নকশা অনুমোদনের সময় কি কেউ প্রশ্ন করেনি, রাস্তা ছাড়া সেতু কীভাবে কাজ করবে? প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় উপজেলা প্রকৌশলী, প্রকল্প কর্মকর্তা, জেলা প্রশাসন, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়– এতটি স্তর পার হয়ে কীভাবে এই অযৌক্তিকতা বৈধ হয়? নাকি সবাই জানে, কিন্তু কিছু বলে না? বললে লাভ নেই– ধারণাটাই কি আমাদের প্রশাসনিক সংস্কৃতি?
আমাদের দেশে দুর্নীতি শুধু টাকা চুরিতে সীমাবদ্ধ নয়। চিন্তার দুর্নীতি, দায়িত্বের দুর্নীতি, নৈতিকতার দুর্নীতি ছড়িয়ে পড়েছে। জনগণের প্রয়োজন না বুঝে বা বুঝেও উপেক্ষা করে। কেবল বরাদ্দ শেষ করার জন্য প্রকল্প নেওয়া বড় অপরাধ। কারণ এতে অর্থ যেমন নষ্ট হয়, তেমনি মানুষ ঠকানোও হয়। আমরা ধীরে ধীরে বুঝে ফেলি, রাষ্ট্র আমাদের জন্যে কেবল কাগজ-কলমে।
এই অকাজগুলোর দায় নেবে কে? একজন বলেন, ‘আমি কিছু বলতে পারব না।’ আরেকজন বলেন, ‘আমরা কেবল তদারক করছি।’ আরেকজন বলেন, ‘ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ ছিল।’ এই ‘কেউ না’ সংস্কৃতিই আমাদের অনেক ক্ষতি করে দিচ্ছে। এখানে ব্যর্থতার কোনো মালিক নেই, তবে সাফল্যের দাবিদার অনেক। ছবি তোলার সময় সবাই সামনে দাঁড়িয়ে যায়; জবাবদিহির সময় সবাই উধাও।
অনেক সময় বলা হয়, সেতুগুলো দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার জন্য তৈরি। যদি তা-ই হয়, তাহলে দুর্যোগকালে মানুষ কীভাবে এগুলো ব্যবহার করবে? প্রকল্পপত্রে কি বাস্তব পরিস্থিতি যাচাই করা হয়? নাকি কেবল গুগল ম্যাপ দেখে, অফিসে বসে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়? মাঠে গিয়ে যদি মানুষকে জিজ্ঞেস করা হতো, তাহলে আগেই জানা যেত– আগে রাস্তা দরকার।
এ ধরনের প্রকল্পের মূল্যায়ন কীভাবে হয়? প্রকল্প শেষ হওয়ার পর কি কেউ গিয়ে দেখে, সেতুটি আদৌ কাজে লাগছে কিনা? যদি তা না হয়, তাহলে কি অর্থ ফেরত নেওয়া হয়? সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কি ব্যবস্থা নেওয়া হয়? নাকি কয়েক বছর পর নতুন প্রকল্প আসে এবং পুরোনো ব্যর্থতা ধামাচাপা পড়ে যায়?
নাগরিকরা এসব প্রশ্ন করতেই পারেন। এগুলো রাষ্ট্রের প্রতি তাদের ন্যূনতম দায়িত্ব। কারণ এই অর্থ এসেছে কৃষকের ঘাম, শ্রমিকের মজুরি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর করের টাকা থেকে। যে মানুষটি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নৌকায় চলাচল করে, তারই টাকা দিয়ে বানানো সেতু সে ব্যবহার করতে পারে না। এর চেয়ে বড় প্রতারণা আর কী হতে পারে!
এ ধরনের অপচয় অমার্জনীয় অপরাধ। এই অপচয় আমাদের উন্নয়নকারীদের উদ্দেশ্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। আমরা অনেকবার একটি মিথ্যা কথা শুনেছি– বাংলাদেশ উন্নয়নের রোল মডেল। কিন্তু রোল মডেল কি এমন হয়? আমাদের পরিকল্পনা ও বাস্তবতার মধ্যে কোনো মিল নেই। উন্নয়ন কি আমরা কেবল কংক্রিটের পরিমাণ দিয়ে মাপব? এই মেকি উন্নয়নে মানুষের জীবনে কী পরিবর্তন আসবে? যদি সেতু মানুষের কাজেই না আসে, তাহলে সেটি উন্নয়ন নয়।
সবচেয়ে দুঃখজনক, এসব অপরাধ ঘটে যাবার পরও কিছুই হয় না। দু-এক দিন আলোচনা হয়, তারপর নতুন কোনো খবর এসে এই খবর চাপা দেয়। কেউ ক্ষমা চায় না; কেউ দায়িত্ব নেয় না। কিন্তু মানুষ মনে রাখে– রাষ্ট্র আবারও তাদের ঠকিয়েছে।
এ অবস্থার পরিবর্তন চাইলে আমরা শুধু প্রশ্ন করতে পারি; আর কিছু পারি না। যদি প্রশ্নগুলোর উত্তর না পাই, তাহলে আরও এমন পরিকল্পনাহীন সেতু তৈরি হবে। আমরা প্রতিবার দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখব– কংক্রিট আছে, পথ নেই; প্রতিজ্ঞা ও প্রতিশ্রুতি আছে, কিন্তু তা পূরণের ইচ্ছা নেই।
ইকরাম কবীর: কথাসাহিত্যিক, যোগাযোগ পেশাজীবী
ekabir@gmail.com
- বিষয় :
- ইকরাম কবীর