অন্যদৃষ্টি
গবেষণায় সততার সংকট
ইফতেখারুল ইসলাম
ইফতেখারুল ইসলাম
প্রকাশ: ০২ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:১৩ | আপডেট: ০২ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:৫২
| প্রিন্ট সংস্করণ
একটি স্মৃতি দিয়েই শুরু করি। পরিচিত একজন শিক্ষক গবেষণাপত্র নিয়ে আলাপকালে একদিন বলেছিলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি খ্যাতনামা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক ৪০ হাজার টাকায় তাঁকে একটি গবেষণাপত্র লিখে দেওয়ার প্রস্তাব করেছিলেন, যেটি তিনি নিজের নামে ছাপাবেন। তখন শুনে বিস্মিত হয়েছিলাম।
শনিবার প্রথম আলোর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, জালিয়াতির কারণে ২০১৯ থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মানজনক সাময়িকী থেকে অন্তত ৩২৫টি বাংলাদেশি গবেষকের গবেষণাপত্র প্রত্যাহার করা হয়েছে। প্রতিবেদনে দেখা যায়, জালিয়াতির ধরনগুলো কেবল ভুলবশত হওয়া কোনো ত্রুটি নয়; বরং তা পরিকল্পিত ও সুসংগঠিত। ভুয়া পিয়ার রিভিউ বা বিশেষজ্ঞ মূল্যায়ন, উপাত্ত ও ফলাফলের কৃত্রিম হেরফের, চৌর্যবৃত্তি, অপ্রাসঙ্গিক উদ্ধৃতি দিয়ে কৃত্রিমভাবে ইমপ্যাক্ট বাড়ানো এবং ভুয়া পেপার মিল থেকে গবেষণাপত্র কিনে নাম বসানোর মতো গুরুতর নৈতিক অপরাধ এসব ক্ষেত্রে সংঘটিত হয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, এই প্রবণতা কোনো একক বিশ্ববিদ্যালয় বা ব্যক্তিবিশেষে সীমাবদ্ধ নয়। সরকারি-বেসরকারি উভয় খাতের শীর্ষস্থানীয় বিদ্যাপীঠের শিক্ষকরা এসব কাজে যুক্ত। তাহলে স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে, দেশে আদৌ কি একাডেমিক সততা বলতে কিছু আছে?
ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি– এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা এই তালিকায় প্রথমদিকে রয়েছেন। এটি প্রমাণ করে, সমস্যাটি ব্যক্তি পর্যায়ের অপরাধ ছাড়িয়ে সার্বিক কাঠামোগত ব্যাধিতে রূপ নিয়েছে।
এই নৈতিক ধসের মূলে কী রয়েছে তা সুনির্দিষ্ট করে বলা মুশকিল। তবে এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে পদোন্নতি। বিশ্বমানের গবেষণা বা মৌলিক জ্ঞান সৃষ্টির চেয়ে কয়টি পেপার প্রকাশিত হলো, তার সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে পদোন্নতি ও আর্থিক প্রণোদনা দেওয়ার নিয়ম গড়ে উঠেছে। ফলে শিক্ষকরা যে কোনোভাবে গবেষণাপত্রের সংখ্যা বাড়াতে মরিয়া।
অনেক বেসরকারি ও সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বৈশ্বিক র্যাঙ্কিংয়ে এগিয়ে থাকার জন্য শিক্ষকদের দ্রুত গবেষণাপত্র প্রকাশে চাপ দেয় কিংবা অন্ধভাবে সাইটেশন বোনাস প্রদান করে। ফলে গবেষণার গুণগত মানকে বলি দিয়ে সংখ্যাকে প্রাধান্য দেওয়ার এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কার্যকর ইনস্টিটিউশনাল এথিক্স কমিটি বা গবেষণা পর্যবেক্ষণ সেল না থাকায় অসৎ উপায়ে প্রকাশিত কাজগুলো অভ্যন্তরীণভাবে কোনো বাধার মুখে পড়ে না।
প্রতিবেদনের ব্যাপারে ভূতত্ত্ববিদ অধ্যাপক কাজী মতিন উদ্দিন আহমেদ বলেছেন, একটি গবেষণাপত্র প্রত্যাহার হওয়া মানে একাডেমিক অঙ্গনে ‘লাল কার্ড’ পাওয়া। ৩২৫টি লাল কার্ড আন্তর্জাতিক দরবারে বাংলাদেশের পুরো একাডেমিক সম্প্রদায়ের ভাবমূর্তিকে গুরুতর ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক প্রকাশনা সংস্থাগুলো এখন বাংলাদেশি যে কোনো নতুন গবেষকের কাজকে সন্দেহের চোখে দেখবে, যা সৎ ও নিষ্ঠাবান গবেষকদের জন্য প্রকাশনা প্রক্রিয়াকে আরও কঠিন করে তুলবে। দেশের গবেষকদের জন্য এটি বৈশ্বিক সংকটে রূপ নিয়েছে।
এ ঘটনায় স্বাভাবিকভাবে বিশ্বখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় বা গবেষণা সংস্থাগুলো ভবিষ্যতে বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যৌথ গবেষণায় অর্থায়নে অনাগ্রহ প্রকাশ করতে পারে। প্রতিবেদনে আরও ইঙ্গিত মেলে, আন্তর্জাতিক জার্নালগুলো জালিয়াতি ধরে গবেষণাপত্র প্রত্যাহার করলেও নিজ নিজ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ প্রায়ই অভিযুক্ত শিক্ষকদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান বা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা নেয় না। এই শাস্তিহীনতার সংস্কৃতি নতুনদেরও অসদুপায় অবলম্বনে উৎসাহিত করে।
৩২৫টি গবেষণাপত্র প্রত্যাহার কেবল কয়েকজনের ব্যক্তিগত নৈতিক স্খলন নয়। বরং এটি দেশের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা ও গবেষণা অবকাঠামোর জন্য এক বিশাল সতর্কসংকেত। আশু প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও কঠোর জবাবদিহি নিশ্চিত করা না গেলে বিশ্বদরবারে তো প্রশ্নই ওঠে না; সবচেয়ে উদ্বেগজনক ব্যাপার হলো, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধ্বংস হবে। এই গভীর উপলব্ধি আমাদের নীতিনির্ধারকদের আদৌ আছে কিনা, তাও নিশ্চিত করে বলা যায় না। তাহলে সংকটের গভীরতা কতটা ব্যাপক, তা কি আমরা বুঝতে পারছি?
ইফতেখারুল ইসলাম: সহসম্পাদক, সমকাল
- বিষয় :
- অন্যদৃষ্টি