গণঅভ্যুত্থান
বৈষম্যমুক্ত রাষ্ট্র নির্মাণের স্বপ্ন ও বাস্তবতা
শামসুল হুদা
শামসুল হুদা
প্রকাশ: ০৫ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:০৭ | আপডেট: ০৫ আগস্ট ২০২৬ | ১০:৩৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি আজ। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কার আন্দোলন যখন শুরু হয়েছিল, তখন হয়তো কেউই ভাবেননি, এ আন্দোলন শেষ পর্যন্ত গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেবে। সেই গণঅভ্যুত্থানে শুধু শিক্ষার্থীরা ব্যাপকভাবে যুক্ত থাকেনি। যুক্ত হয়েছিলেন তাদের অভিভাবকসহ দেশের নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। যে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যায়গুলো ছিল ছাত্র রাজনীতিমুক্ত, সেখানকার শিক্ষার্থী-শিক্ষকও এ আন্দোলনে শামিল হয়েছিলেন স্বতঃস্ফূর্তভাবে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিক্ষার্থীশূন্য করতে এক পর্যায়ে যখন বন্ধ ঘোষণা হলো, তখন আন্দোলনের হাল ধরতে এগিয়ে এসেছিলেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরাই।
ততদিনে আন্দোলনের মূল স্লোগানও কোটা সংস্কার থেকে সকল ধরনের বৈষম্যবিরোধী হয়ে উঠেছে। আন্দোলনটি তখন হয়ে উঠেছিল সত্যিকারের বৈষম্যহীন রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রবর্তনের দাবিতে সম্মিলিত প্রতিরোধ যুদ্ধ। তাই ১৮ জুলাইয়ের পর আন্দোলনটি হয়ে উঠেছিল সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর গুণগত পরিবর্তনকামী লাখ লাখ মানুষের প্রাণের সংগ্রাম।
জনমানুষের পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা ঢাকাসহ সারাদেশের শহর-উপশহরের দেয়াল, অলিগলিতে গ্রাফিতি আকারে প্রকাশ পেতে থাকে। এটা নিঃসন্দেহে গণআন্দোলনের অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়। তরুণ প্রজন্ম কারও নির্দেশমতো নয়, স্বতঃস্ফূর্তভাবে ছবি ও ভাষায় যে বার্তা দিয়েছিল, তা এক নতুন সমাজ, রাষ্ট্র বিনির্মাণের প্রত্যয়ের অভিব্যক্তি। দেশজুড়ে লেখা সেই অসংখ্য গ্রাফিতির ক্যামেরাবন্দি ছবিগুলো এখন দেখে স্পষ্ট করেই বলা চলে, তরুণ প্রজন্ম কী ধরনের রাষ্ট্র ও সমাজ চেয়েছিল।
এর পরবর্তী ইতিহাস আমরা জানি। গণঅভ্যুত্থানের চূড়ান্ত পর্বে ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে এবং ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশত্যাগ করে আশ্রয় নেন প্রতিবেশী ভারতে।
গণঅভ্যুত্থানের পর ২০২৪ সালের ৫ থেকে ৮ আগস্ট দেশে কার্যত কোনো সরকার ছিল না। পুলিশি ব্যবস্থা ছিল বিপর্যস্ত। সাধারণ মানুষের মধ্যে অরাজকতার আশঙ্কা থাকলেও বড় কোনো নৈরাজ্য সৃষ্টি হয়নি। কারণ সাধারণ মানুষ ও শিক্ষার্থীরা ছিল সজাগ ও সর্তক। ৮ আগস্ট শিক্ষার্থী সমন্বয়কদের মনোনীত ব্যক্তি হিসেবে গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে বঙ্গভবনে শপথ নেন। একই দিন গঠিত উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হিসেবে যারা শপথ নেন, তারা বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থী আন্দোলনেরও সক্রিয় সমর্থক ছিলেন। খোদ বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থী আন্দোলনের দুজন নেতাও শপথ নেন।
অনুমিতভাবেই বৈষম্যবিরোধী স্লোগানের মূল চেতনা সামনে রেখে কয়েকটি সংস্কার কমিশন গঠন করা হয় অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে। কিন্তু এই গঠন প্রক্রিয়াটি বৈষম্যমুক্ত ছিল না। কমিশনগুলোতে নারী, আদিবাসী বা অন্যান্য সংখ্যালঘু প্রতিনিধিত্ব ছিল না বললেই চলে। এমনকি নারী অধিকারের জন্য প্রথম দফায় কমিশনই গঠিত হয়নি; পরে একটি কমিশন গঠিত হলেও সেই কমিশনের সুপারিশ উপদেষ্টা পরিষদ বা ঐকমত্য কমিশনে আলোচিতই হলো না। ঐকমত্য কমিশন গঠনের সময়ও নারীরা থাকলেন সম্পূর্ণ উপেক্ষিত। পক্ষান্তরে উগ্রবাদীরা নারী কমিশনকে নানা কুৎসিত ভাষায় আক্রমণ করে। প্রত্যাশিত হলেও এর প্রতিবাদ পর্যন্ত অন্তর্বর্তী সরকার করেনি।
নাগরিক সমাজ থেকে বারংবার দাবি জানানো সত্ত্বেও ভূমি, কৃষি সংস্কারের লক্ষ্যে আলাদা কমিশনের দাবি পূরণ হয়নি। হয়নি শিক্ষা সংস্কারের কমিশন। আর অন্য কমিশনগুলোর মধ্যে প্রশাসনিক সংস্কার কমিশন বাধার মুখে ঠিকভাবে কাজই করতে পারেনি। পুলিশ সংস্কার কমিশন দায়িত্ব দায়সারাভাবে পালন করতে পেরেছে, বলা যায়। এসব ঘটেছে প্রশাসনের মধ্যে বিভিন্ন কায়েমি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর প্রভাবের কারণে।
এসবের মধ্যেই গত ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে বিজয়ী বিএনপি সরকার পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে। প্রধান বিরোধী দলের আসনে বসেছে জামায়াতে ইসলামী। নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের প্রায় ছয় মাসেও যে প্রশ্নটি এখনও দেদীপ্যমান; গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে উচ্চারিত বৈষম্যহীন রাষ্ট্র ও সমাজের স্বপ্ন কোন রাজনৈতিক দলের চিন্তায় কতটুকু অবশিষ্ট? বিভিন্ন কমিশনের সুপারিশকৃত সংস্কার প্রস্তাবগুলোর কী হবে?
ক্ষমতাসীন দল বিএনপি বলেছে, তাদের ৩১ দফা এবং নির্বাচনী ইশতেহারের মধ্যে যেসব সংস্কারের প্রতিশ্রুতি তারা দিয়েছে, তা তারা পূরণে বদ্ধপরিকর। জুলাই সনদকেও তারা সম্মান দেখাবে বলে অঙ্গীকার করেছে। বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী এবং এনসিপির অভিযোগ, ক্ষমতাসীনরা জুলাই সনদ বাস্তবায়নে আগ্রহী নয়। তারা এমন কথাও বলছে, সরকার তাদের পূর্বপ্রতিশ্রুতি থেকে সরে গেছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, সাধারণ নাগরিকদের আত্মাহুতি, বিপুল রক্তস্রোতের মধ্য দিয়ে উচ্চারিত বৈষম্যহীন সমাজ গঠনে রাজনৈতিক দলগুলো কতটা আন্তরিক? বৈষম্যবিরোধী গণঅভ্যুত্থানের পর কয়েকটি সংস্কার কমিশন যেসব আশু, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের সুপারিশ করেছিল, সেগুলো কি বর্তমান সরকার বা বিরোধী দলের অগ্রাধিকার তালিকায় আছে? তাদের মধ্যকার বিতর্কে ওইসব সংস্কারের উল্লেখ বড় একটা দেখা যায় না।
জনমনে তাই প্রশ্ন, এত জীবন বিসর্জন দিয়ে যে বৈষম্যহীন রাষ্ট্র ও সমাজ নির্মাণের স্বপ্ন মূর্ত হয়ে উঠেছিল, তা কি ধীরে ধীরে রাজনীতির মারপ্যাঁচে ফিকে হয়ে যাচ্ছে? দেয়াল লিখনে তরুণদের যে আশা-আকাঙ্ক্ষা উঠে এসেছিল, তা ঝাপসা হতে পারে; দেয়াল লিখন মুছে ফেলাও সম্ভব! কিন্তু নানা বয়স, স্তর, পেশা ও শ্রেণির নাগরিকের মনে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা যেভাবে খোদাই হয়ে গেছে, সেটা কি মুছে ফেলা যাবে?
প্রতিটি গণঅভ্যুত্থান দিবসই মানুষকে বারবার মনে করিয়ে দেবে– তাদের প্রত্যাশিত বৈষম্যহীন সমাজ-রাষ্ট্র বিনির্মাণের আশা এখনও অপূর্ণই রয়ে গেছে। সেগুলো পূরণ করতে ভবিষ্যতের তরুণ প্রজন্মসহ খেটে খাওয়া কৃষক-মজুর ও প্রান্তিক অবস্থানের গ্রামীণ নারী, অন্যান্য জনগোষ্ঠী, আদিবাসী ব্রাত্যজনেরা যদি নতুন আন্দোলনের সূচনা করেন, অবাক হওয়ার কিছু নেই।
শামসুল হুদা: অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (এএলআরডি) নির্বাহী পরিচালক
- বিষয় :
- শামসুল হুদা
- গণঅভ্যুত্থান