অন্যদৃষ্টি
জাতিসংঘকে দুর্বল করার মার্কিন নীতি
মনসেফ খান
প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:২২
| প্রিন্ট সংস্করণ
মঙ্গলবার সকালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) বার্ষিক সাধারণ বিতর্ক নিউইয়র্কে এক নাজুক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে যানজট ও অতিরিক্ত হোটেল ভাড়া, গাড়িবহরের শোভাযাত্রা, একের পর এক শীর্ষ নেতার মেপে মেপে ভাষণ দেওয়ার ভিড়ে এই অধিবেশনে মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস তাঁর মেয়াদের শেষ প্রতিবেদন উপস্থাপন করবেন।
গুতেরেস দীর্ঘ ১০ বছর এই বিশ্ব সংস্থার নেতৃত্ব দিয়েছেন। এই সময়ে জাতিসংঘ যখনই আক্রমণের মুখে পড়েছে, তিনি বারবার তাকে রক্ষায় ব্যর্থ হয়েছেন। এখন তিনি সংস্থাটির সর্বোচ্চ পদ ছাড়ছেন এমন এক মুহূর্তে, যখন এটি আর্থিক ধসের দ্বারপ্রান্তে এবং ইতিহাসের সবচেয়ে কোণঠাসা অবস্থায় রয়েছে। অদ্ভুত বিষয়, এই শোচনীয় পরিস্থিতির জন্য গুতেরেসকে মূলত জাতিসংঘের আয়োজক দেশ যুক্তরাষ্ট্র এবং দেশটির খামখেয়ালি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছেই কৃতজ্ঞ থাকা উচিত।
চলতি বছরের শুরুর দিকে ট্রাম্প প্রশাসন জাতিসংঘের কয়েক ডজন সংস্থা ও অঙ্গপ্রতিষ্ঠান থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নেয় এবং এক অভূতপূর্ব পদক্ষেপ হিসেবে জাতিসংঘের সাধারণ ও শান্তিরক্ষা বাজেট দুটিতেই তাদের বাধ্যতামূলক আর্থিক চাঁদা দেওয়া সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়। তবে এই চরম নীতিগত সিদ্ধান্তগুলো হঠাৎ আকাশ থেকে আসেনি। জাতিসংঘের ওপর ট্রাম্পের ক্ষোভ বহুমুখী, আর ওয়াশিংটনের আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক আর্থিক দায়বদ্ধতা পূরণ বন্ধের এই সিদ্ধান্ত মূলত যুক্তরাষ্ট্রের বহু দশকের পুরোনো নীতিরই স্বাভাবিক পরিণতি বা চূড়ান্ত রূপ।
আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে রিগ্যান প্রশাসন জাতিসংঘকে একটি তৃতীয় বিশ্বের, যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী মঞ্চ হিসেবে অভিযুক্ত করেছিল। সংস্থাটিকে নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় বাধ্য করতে এবং সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার দোহাই দিয়ে– যে ফাঁদে জাতিসংঘের সব মহাসচিবই পা দিয়েছেন; যুক্তরাষ্ট্র তার নির্ধারিত চাঁদা আটকে দেওয়া শুরু করে। সেই সময়ে সংস্থাটির সাধারণ বাজেটের এক-চতুর্থাংশ এবং শান্তিরক্ষা বাজেটের এক-তৃতীয়াংশ আসত যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে।
১৯৮৭ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র চাঁদা আটকে রাখার নীতি কিছুটা শিথিল করলেও ততক্ষণে একটি খারাপ নজির তৈরি হয়ে যায়। ওয়াশিংটন পরে অনবরত চাঁদা না দেওয়ার হুমকিকে কাজে লাগিয়ে সংস্থাটির ওপর নিজেদের কর্তৃত্ব বজায় রাখে। জাতিসংঘকে তারা একটি বহুপক্ষীয় আন্তর্জাতিক সংস্থা হিসেবে না দেখে কেবল নিজেদের জাতীয় স্বার্থ হাসিলের হাতিয়ার মনে করত, যা এখনও বহাল রয়েছে।
রিগ্যানের আমল থেকে যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘকে আর্থিক দিক থেকে বেশ কড়া নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রেখেছে এবং আজও ইচ্ছাকৃতভাবে তাদের বকেয়া জমিয়ে রাখছে। জাভিয়ের পেরেজ দ্য কুয়েলারের পর থেকে পরবর্তী সব মহাসচিবকে যে রূঢ় বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছে; নতুন মহাসচিবকে একই বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে। আর তা হলো মার্কিন বকেয়ার কারণে দীর্ঘস্থায়ী নগদ অর্থ সংকট।
জাতিসংঘের নতুন নেতৃত্বকে উদ্বুদ্ধ করা উচিত, কীভাবে বাজেট তৈরি এবং সদস্য রাষ্ট্রগুলোর চাঁদা কীভাবে বরাদ্দ করা হয় এবং তা নিয়ে নতুন করে ভাবার। ওয়াশিংটনের হাতে অর্থায়নের চাবিকাঠি ছেড়ে দেওয়া মূলত একটা আত্মঘাতী প্রক্রিয়া, যা শেষ পর্যন্ত এই বিশ্ব সংস্থার জন্য প্রাণঘাতী প্রমাণিত হতে পারে।
আরেকটি মৌলিক প্রশ্ন হলো, জাতিসংঘ সদরদপ্তর যুক্তরাষ্ট্রে না থাকলে কি সংস্থাটির জন্য ভালো হতো? দীর্ঘদিন ধরে ওয়াশিংটন জাতিসংঘকে হয় তাদের জাতীয় স্বার্থ হাসিলের হাতিয়ার হিসেবে দেখেছে, নয়তো একটি প্রতিপক্ষ হিসেবে। এমনকি আয়োজক দেশ হওয়ার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে তারা অনেক বিশ্বনেতাকে বাদ দিয়েছে বা বাধা দিয়েছে। যেমন পিএলও চেয়ারম্যান ইয়াসির আরাফাত এবং বর্তমানে ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস। অবশ্যই এসব সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কেবল জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের রয়েছে। তবে দূরদর্শী এবং রাজনৈতিকভাবে দৃঢ় মানসিকতার একজন মহাসচিবেরই উচিত হবে বিশ্ব সংস্থাকে আরও প্রান্তিক হয়ে পড়া ও সম্ভাব্য বিনাশ থেকে বাঁচাতে এসব মৌলিক প্রশ্নে দিকনির্দেশনা ও বলিষ্ঠ নেতৃত্ব দেওয়া।
মনসেফ খান: জাতিসংঘের প্রাক্তন কর্মকর্তা; আলজাজিরা থেকে ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম
- বিষয় :
- অন্যদৃষ্টি