ফুটপাতে ক্ষমতার গাড়ি কিংবা ঢাকার ‘জলি এলএলবি’
ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া
সামছুর রহমান আদিল
প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ২২:২৫
সিনেমার শুরুটা একটি সড়ক দুর্ঘটনা দিয়ে। দ্রুতগতির একটি গাড়ি ফুটপাতে উঠে কয়েকজন মানুষকে চাপা দেয়। অভিযুক্ত চালক প্রভাবশালী পরিবারের সন্তান। তাকে বাঁচাতে তদন্তের গতিপথ বদলানোর চেষ্টা হয়, সাক্ষ্য-প্রমাণ নিয়ে কারসাজি হয়, আর এমন একজনকে সামনে আনার চেষ্টা করা হয়, যিনি প্রকৃত চালক নন। শেষ পর্যন্ত আদালতে প্রশ্ন ওঠে ক্ষমতা ও অর্থ কি সত্যকে বদলে দিতে পারে?
বলিউডের সিনেমা জলি এলএলবির এই গল্পকে হয়তো অতিরঞ্জিত মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবের একটি ঘটনা সেই প্রশ্নটাকেই আবার সামনে এনে দিয়েছে। ২৪ বছরের মেহেদী মঙ্গলবার বিকেলে বারিধারা ডিপ্লোম্যাটিক জোনের একটি ফুটপাতে বসে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। দ্রুতগতির একটি প্রাইভেটকার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফুটপাতে উঠে তাকে চাপা দেয়। গাড়ির চাকায় পিষ্ট হয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান তিনি।
দুর্ঘটনার পর উপস্থিত লোকজন গাড়ির চালকের আসনে থাকা এক কিশোরকে আটক করে পুলিশের কাছে দেন। পুলিশও তাকে হেফাজতে নেয়। কিন্তু জিজ্ঞাসাবাদ শেষে রাতে তাকে তার চাচার জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়।
এরপর ঘটনাটি আরও প্রশ্ন তৈরি করে। মেহেদীর বড় ভাইয়ের করা মামলায় ওই কিশোরের নাম নেই। মামলায় গাড়ির চালক হিসেবে আকাশ মারক নামের একজনকে আসামি করা হয়েছে। তিনি ঘটনার পর থেকে পলাতক। অথচ দুর্ঘটনার একটি ভিডিও ফুটেজে গাড়ির চালকের পাশ থেকে ওই কিশোরকে বের হয়ে আসতে দেখা যাচ্ছে।
কিশোরটিই গাড়ি চালাচ্ছিল এই মুহূর্তে এমন চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসার সুযোগ নেই। তদন্তেই সেটি নিশ্চিত হওয়ার কথা। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যে কিশোরকে ঘটনাস্থল থেকে আটক করা হয়েছিল, ভিডিও ফুটেজে যাকে চালকের আসন থেকে বের হতে দেখা যাচ্ছে, তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে ছেড়ে দেওয়ার কারণ কী? মামলায় চালক হিসেবে অন্য একজনের নাম কীভাবে এলো? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর যতক্ষণ না পাওয়া যাচ্ছে, ততক্ষণ মেহেদীর পরিবারের কাছে ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা কোথায়?
জলি এলএলবি সিনেমাতেও পুলিশের তদন্ত নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। শেষ পর্যন্ত অখ্যাত আইনজীবী জলি সেই তদন্তের অসংগতিগুলো সামনে আনার চেষ্টা করেন এবং প্রকৃত প্রত্যক্ষদর্শী ও প্রমাণ আদালতে হাজির করেন। সিনেমাটি ১৯৯৯ সালের সঞ্জীব নন্দা হিট অ্যান্ড রান মামলার ঘটনা থেকে অনুপ্রাণিত ছিল।
সিনেমাটিতে যে প্রশ্নটি সামনে নিয়ে এসেছিল তা হলো ‘আইন কি সবার জন্য সমান?’। একজন নির্মাণশ্রমিক আর একজন প্রভাবশালী পরিবারের সন্তানের মধ্যে আইনের কাছে কোনো পার্থক্য থাকার কথা নয়। দুর্ঘটনা ঘটলে গাড়ির মালিক কে, চালক কে, তার বাবা কী করেন, পরিবারের সামাজিক অবস্থান কী এসবের কোনোটিই তদন্তের বিষয় হওয়ার কথা নয়। তদন্তের বিষয় হওয়ার কথা একটাই কী ঘটেছিল এবং দায়ী কে?
বাস্তব জীবন অবশ্য সিনেমার মতো নয়। এখানে শেষ দৃশ্যে কোনো নায়ক এসে সব রহস্যের সমাধান করে দেবেন না। একজন দরিদ্র পরিবারের পক্ষে বছরের পর বছর মামলা চালিয়ে যাওয়া, সাক্ষী ধরে রাখা কিংবা তদন্তের প্রতিটি ধাপের ওপর নজর রাখা সহজ নয়। এখানেই ক্ষমতা ও সাধারণ মানুষের মধ্যে পার্থক্যটা সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
একজন প্রভাবশালী পরিবারের কাছে অর্থ আছে, যোগাযোগ আছে, আইনজীবী নিয়োগের সামর্থ্য আছে। প্রয়োজনে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে পৌঁছানোর সুযোগও আছে। বিপরীতে একজন নির্মাণশ্রমিকের পরিবারের হাতে থাকে কী? একজন মৃত স্বজন, একটি মামলা এবং ন্যায়বিচারের আশায় রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকা। এই অসমতার কারণেই আইনকে নিরপেক্ষ রাখার দায়িত্ব রাষ্ট্রের।
সেই কারণেই এই ঘটনাটি শুধু একটি সড়ক দুর্ঘটনার মামলা নয়। এটি আমাদের আইন প্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি মানুষের আস্থারও একটি পরীক্ষা। আর এই পরীক্ষার গুরুত্ব আরও বেড়ে যায় চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পরের বাংলাদেশে। সেই পরিবর্তনের সঙ্গে মানুষের মনে রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান ও ন্যায়বিচার নিয়ে নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। বহু মানুষ এমন একটি রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখেছিলেন, যেখানে আগের মতো ক্ষমতাবানদের জন্য আলাদা নিয়ম থাকবে না। পুলিশ রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী মানুষের স্বার্থ রক্ষার প্রতিষ্ঠান হবে না। প্রশাসন নাগরিককে ক্ষমতার নিচে দাঁড় করিয়ে রাখবে না। আর বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে একজন সাধারণ মানুষ ও একজন ক্ষমতাবান মানুষের মধ্যে পার্থক্য থাকবে না।
দুই বছর পর বারিধারার এই ঘটনা সেই প্রত্যাশার সামনে আরেকটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন রাখে। রাষ্ট্র বদলেছে কি না, সেটি কেবল সংসদ, মন্ত্রণালয় কিংবা সরকারের কাঠামো দিয়ে বোঝা যায় না। রাষ্ট্র কতটা বদলেছে, তার একটি বড় পরীক্ষা হয় থানায়। হয় হাসপাতালের মর্গে, হয় আদালতে। হয় একজন দরিদ্র মানুষের মামলা নিতে পুলিশ কতটা আগ্রহী, তদন্ত করতে কতটা নিরপেক্ষ এবং প্রভাবশালী পরিবারের সদস্যের ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন কতটা কঠোরভাবে করে সেখানে।
জলি এলএলবি সিনেমার শেষ দৃশ্যে আদালত সত্যের পক্ষে দাঁড়ায় বলে গল্পের সমাপ্তি ঘটে। বাস্তব জীবনে অবশ্য কোনো জলি এসে প্রতিটি মামলার প্রমাণ খুঁজে বের করবে না। কোনো সিনেমার বিচারকও এসে তদন্তের অসংগতি ধরিয়ে দেবেন না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা সম্ভবত এটাই যে দায়িত্বটা প্রতিষ্ঠানগুলোর।
আইনের কাছে একজন মানুষের পরিচয় তার পেশা, পোশাক, ব্যাংক হিসাব কিংবা বাবার পদবি দিয়ে নির্ধারিত হওয়ার কথা নয়। মেহেদী হাসান ফুটপাতে বসেছিলেন। ফুটপাত হয়তো তার বিশ্রামের জায়গা ছিল, কিন্তু তার মৃত্যুর পর ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার কোনোভাবেই প্রান্তিক হতে পারে না। প্রশ্নটা তাই শুধু কে গাড়ি চালাচ্ছিল, তা নয়। প্রশ্নটা আরও বড়। এই রাষ্ট্রে সত্যিই কি সবাই আইনের চোখে সমান?
এই প্রশ্নের উত্তর মেহেদীর পরিবারকে শুধু কথায় নয়, সঠিক তদন্ত ও ন্যায়বিচারের মাধ্যমে দিতে হবে।
সামছুর রহমান আদিল: সাংবাদিক ও যোগাযোগবিদ
jagoritoadil@gmail.com
- বিষয় :
- সড়ক দুর্ঘটনা
- গাড়িচাপায় নিহত