ঢাকা শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রাইট টার্ন

প্রতিপক্ষের দুর্বলতাই রাজনীতির পুঁজি?

প্রতিপক্ষের দুর্বলতাই রাজনীতির পুঁজি?
×

মোহাম্মদ গোলাম নবী

মোহাম্মদ গোলাম নবী

প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:২৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে একটি নেতিবাচক প্রবণতা স্পষ্ট। জনগণের জন্য কে কত ভালো করতে পারে– তার চেয়ে প্রতিপক্ষের ব্যর্থতা বা বিপাক কিংবা মানুষের অসন্তোষ থেকে রাজনৈতিক সুবিধা নিতে পারার হিসাবই যেন বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা এই প্রবণতাকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে; জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, শিশুর হাতে শিশুহত্যার মতো মর্মান্তিক ঘটনা এবং প্রতিবাদের নামে জনদুর্ভোগের সংকট। এসব সংকট নিয়ে আমাদের রাজনীতি কি সত্যিই সমাধানের পথে হাঁটছে, নাকি চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের আগের মতোই অন্যের ব্যর্থতা থেকে নিজের লাভ খুঁজছে?

জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ে; কৃষকের উৎপাদন খরচ বাড়ে; পরিবহন ব্যয় বাড়ে ও নিত্যপণ্যের দামে চাপ পড়ে। এমন সিদ্ধান্তের সমালোচনা বিরোধী দল করবেই। সেটি গণতান্ত্রিক অধিকার। কিন্তু সমালোচনার সঙ্গে যদি বাস্তবসম্মত বিকল্প না থাকে, তবে সেটি সরকারের বিপাকে রাজনৈতিক সুযোগ খোঁজার দিকেই বেশি ঝুঁকে পড়ে।

একইভাবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি নিরাপত্তাবোধকে দুর্বল করে। ছিনতাই, হামলা, খুন কিংবা সামাজিক সহিংসতার খবর মানুষকে আতঙ্কিত করে। শিশুর হাতে শিশুহত্যার মতো ঘটনা আরও গভীর প্রশ্ন তোলে। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সমাজ ও রাষ্ট্র কোথায় ব্যর্থ হচ্ছে– সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি। অথচ এখানে আমরা প্রায়ই দেখি, এক পক্ষ শুধু ব্যর্থতা প্রমাণে ব্যস্ত; আরেক পক্ষ ব্যস্ত ব্যর্থতা অস্বীকারে। মাঝখানে মানুষ ভয়, অনিরাপত্তা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিনাতিপাত করে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থীকে রেলওয়ের নিরাপত্তাকর্মীদের মারধরের অভিযোগের প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা রেললাইন অবরোধ করেই ক্ষান্ত হয়নি; রেলস্টেশন ভাঙচুর পর্যন্ত করেছে। অন্যায়ের শিকার হলে বিচার চাওয়া কিংবা অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধ্বংস করা রাজনীতির চিরাচরিত দুর্বলতাই তুলে ধরে।

আলাদা ঘটনা রাজনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে একই মানসিকতার ভিন্ন ভিন্ন রূপ। একদিকে মানুষের দুর্ভোগ প্রতিপক্ষকে দুর্বল করলে কেউ কেউ নিজের রাজনৈতিক সুযোগ খুঁজে পায়। অন্যদিকে নিজের দাবি আদায়ের জন্য অন্য মানুষের দুর্ভোগ তৈরি করাকেও চাপ সৃষ্টির বৈধ পদ্ধতি হিসেবে নেওয়া হচ্ছে। সব ক্ষেত্রেই মাঝখানে পড়ে সাধারণ মানুষ।
দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক চর্চার দিকে তাকালে এই মানসিকতার উৎস বোঝা যায়। হরতাল সফল করতে গাড়ি বন্ধ করতে হবে। অবরোধ সফল করতে মহাসড়ক বন্ধ করতে হবে। প্রতিপক্ষকে দুর্বল করতে তার সভা ঠেকাতে হবে। কখনও গাড়ি ভাঙা হয়েছে; কখনও আগুন দেওয়া হয়েছে। আবার কখনও মানুষের জীবন গেছে। বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় যে কাজকে গণতান্ত্রিক আন্দোলন বলা হয়; ক্ষমতায় গিয়ে সেই একই কাজকে জনদুর্ভোগ বলা হচ্ছে। জনদুর্ভোগ সৃষ্টিই রাজনৈতিক চাপ তৈরির স্বীকৃত কৌশলে পরিণত হয়েছে।

এই শিক্ষা শুধু রাজনৈতিক দলের মধ্যে আটকে থাকেনি; সমাজেও ছড়িয়েছে। শিক্ষার্থী বা শ্রমিকের দাবি আদায়েও রাস্তাঘাট বন্ধ করা হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানে ক্ষোভ তৈরি হলে সেটা ভাঙচুর করা হচ্ছে। যেন দাবির যৌক্তিকতা বলাটাই যথেষ্ট নয়; দাবি আদায়ে জনদুর্ভোগ তৈরি ও সম্পদ ধ্বংস করে দাবি আদায় করতে হবে। প্রচলিত ধারণা হলো, জনদুর্ভোগ যত বাড়বে, সরকারের ওপর চাপ তত বাড়বে। চাপ যত বাড়বে, দাবি আদায়ের সম্ভাবনাও তত বাড়বে। এটি রাজনীতির ভয়ংকর শিক্ষা।

এর আরেকটি রূপ দেখা যায় প্রতিপক্ষের সঙ্গে আচরণে। প্রতিপক্ষের নেতা অপমানিত হলে আনন্দ; তার সভা পণ্ড হলে আনন্দ; তার কর্মী মার খেলে উল্লাস। যেন অন্যের মাথা নিচু হলেই নিজের মাথা উঁচু হয়ে দীর্ঘ মেয়াদে এটি জাতিকে এমনভাবে বিভক্ত করে; একই দেশের মানুষ অন্য মানুষের ক্ষতির মধ্যেও রাজনৈতিক লাভ খুঁজতে শেখে।
অথচ বাংলাদেশের বাস্তবতা উল্টো ধরনের রাজনীতি দাবি করে। ছোট ভূখণ্ডে বিপুল সংখ্যক মানুষ, সীমিত সম্পদ। কর্মসংস্থানের প্রয়োজন বিশাল। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সমস্যা আছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, যানজট, জ্বালানি সংকট, দুর্বল প্রতিষ্ঠান, ব্যাংকিং খাতের অস্থিরতা, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিসহ সমস্যার তালিকা দীর্ঘ। সীমিত সম্পদ দিয়ে ১৮ কোটি মানুষের হাজারো সমস্যা সমাধান করতে হলে রাজনৈতিক শক্তির বড় অংশ ব্যয় হওয়ার কথা সমাধান খোঁজায়; প্রতিপক্ষের ক্ষতি করার প্রতিযোগিতায় নয়।

জ্বালানি খরচ বাড়লে; আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হলে বিরোধী দল বলতে পারত, তারা বিকল্প কী উপায়ে সমস্যার সমাধান দিত। শিক্ষার্থীর ওপর অন্যায় হলে নিরপরাধ মানুষের অধিকার কেড়ে না নিয়েও প্রতিবাদ ও বিচার হতে পারে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ভুল করলে তার সমালোচনা হবে। কিন্তু তাকে নিশ্চিহ্ন করে নিজের রাজনৈতিক জায়গা তৈরির চেষ্টা হবে না।
প্রতিপক্ষের ব্যর্থতায় যেমন নিজের সাফল্য হবে না, তেমনি সরকারের ব্যর্থতাও বিরোধী দলের সাফল্য হিসেবে দেখা যাবে না। রেলপথ বন্ধ করে দাবি আদায় করা আন্দোলনের সাফল্য হতে পারে না। একজনের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে হাজার মানুষের অধিকার কেড়ে নেওয়াও ন্যায়বিচার নয়।

বাংলাদেশের সমস্যা অনেক; কিন্তু সম্পদ সীমিত। তাই আমাদের রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা কে কাকে কতটা দুর্বল করতে পারে, সেটা না হয়ে বরং কে দেশের মানুষের কত বেশি সমস্যার সমাধান করতে পারে– সেটা হওয়া দরকার।

অন্যের ক্ষতির ভেতর দিয়ে নিজের রাজনৈতিক লাভ খোঁজা ইতিবাচক রাজনীতি নয়– এই বোধ বর্তমান ও আগামী প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে হবে। সত্যিকারের ইতিবাচক রাজনীতি হলো মানুষের লাভের ভেতর দিয়ে নিজের রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করা। জনদুর্ভোগকে পুঁজি না করে বরং জনস্বার্থকে লক্ষ্য বানানোর মধ্য দিয়ে আমাদের রাজনীতি সত্যিকার অর্থে মানুষের রাজনীতি হয়ে উঠতে পারে।

মোহাম্মদ গোলাম নবী: কলাম লেখক; প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক, রাইট টার্ন

আরও পড়ুন

×