সাদা কালো
সত্যিকার বিরোধী দল হওয়ার স্বপ্ন ও বাস্তবতা
সাইফুর রহমান তপন
সাইফুর রহমান তপন
প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৩৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
বিএনপি সরকারের মাত্র ছয় মাসের মাথায় বর্তমান সংসদের প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য গত ৬ আগস্ট ঢাকাসহ চারটি বিভাগীয় শহরে ‘লংমার্চ’ ও মহাসমাবেশ কর্মসূচি ঘোষণা করে। ইতোমধ্যে গত ৫ ও ১৯ সেপ্টেম্বর যথাক্রমে চট্টগ্রাম ও রংপুরমুখী ‘লংমার্চ’ হয়েছে; ১০ ও ২৪ অক্টোবর খুলনা ও সিলেটমুখী লংমার্চ শেষে নভেম্বরে হবে ঢাকায় মহাসমাবেশ। সেখান থেকে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণার কথা রয়েছে।
এসব কর্মসূচিতে নেতারা এমন সব বক্তব্য রাখছেন যেন সরকারের পতন আসন্ন। তাদের দফা ছয়টি দিয়ে শুরু হলেও এখন হয়েছে আটটি। ১৯ সেপ্টেম্বর লংমার্চের উদ্বোধন সমাবেশে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘আবার জাতির প্রয়োজনে এটা যে কোনো সময় এক দফায় পরিণত হতে পারে’ (বিবিসি, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬)। একই সমাবেশে ‘গণতন্ত্র ও মানবাধিকার তারেক রহমানের হাতে সুরক্ষিত নয়’ মন্তব্য করে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, ‘এভাবে চলতে থাকলে তারেক রহমানকে ঠিক করতে হবে কীভাবে তিনি পদত্যাগ করবেন’ (বিবিসি, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬)।
সংসদে বিরোধী জোটের কর্মকাণ্ড যারা পর্যবেক্ষণ করছেন, তাদের কাছে এসব বক্তব্য বিস্ময়করই ঠেকার কথা। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন কৌশল নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে মতবিরোধ থাকলেও সবকিছু মোটামুটি ঠিকঠাক চলছিল। ইতোমধ্যে সংসদের তিনটি অধিবেশন হয়ে গেছে। প্রায় প্রতিটিতেই বিরোধী দল দুই-একবার স্বল্প সময়ের জন্য ওয়াকআউট করলেও কোনো অধিবেশন অচলাবস্থায় পড়েনি। এমনকি সরকারকে বিব্রতকারী কোনো বিষয় বিরোধী পক্ষ সংসদে এ পর্যন্ত তোলেনি। এ সময়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় স্বাক্ষরিত প্রশ্নবিদ্ধ মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি, ভঙ্গুর অর্থনীতি, আইনশৃঙ্খলার অবনতি, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট ইত্যাদি জনপরিসরে উদ্বেগ ও দুর্ভোগ সৃষ্টি করলেও সংসদের আলোচনায় তার প্রতিফলন ঘটেনি। সরকার ও বিরোধীপক্ষের এমন সখ্য দেখে কেউ কেউ বিগত তিনটি সংসদের কথাও স্মরণ করছেন। বিতর্কিত নির্বাচন প্রক্রিয়ায় গঠিত ওই তিনটি সংসদে কার্যকর বিরোধী দল বলে কিছু ছিল না।
উল্লেখ্য, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর বেশ কিছুদিন বিশেষত জামায়াতের পক্ষ থেকে তা নিয়ে অনেক প্রশ্ন তোলা হয়। যেমন, দলটির আনুষ্ঠানিক অভিযোগ ছিল, ভোট গ্রহণ সুষ্ঠু হলেও ভোট গণনা ও ফল প্রকাশ ছিল অনিয়মে পূর্ণ। অন্যদিকে, এর জবাবে বিএনপি নেতারা বলেছিলেন, বিএনপির বদান্যতাতেই জামায়াত জোট ৭৭টি আসন পেয়েছে। উভয় পক্ষের এসব কথার পরিপ্রেক্ষিতে এমন প্রশ্নও ওঠে, নির্বাচনটি কি ভাগাভাগির সূত্র মেনে হয়েছে?
আসলে এমন সব আলোচনা ও গুঞ্জন চাপা দিতেই জামায়াতকে ‘প্রকৃত’ বিরোধী দলের ভাবমূর্তি অর্জন করতে হবে। কিন্তু নিছক রোডমার্চের মতো কর্মসূচি, যার নাম দেওয়া হয়েছে লংমার্চ, সেটা দিয়ে কতখানি সফলতা আসবে– সন্দেহ রয়েছে। ১৯৩৪ সালের অক্টোবর মাসে মাও সে তুংয়ের নেতৃত্বাধীন চীনা কমিউনিস্ট পার্টি ঐতিহাসিক লংমার্চের মাধ্যমে সংগঠন গড়ার পাশাপাশি নতুন যোদ্ধা তৈরি করেছিল, যা শেষ পর্যন্ত চীন বিপ্লবে পরিণত হয়। লংমার্চ আমাদের দেশে প্রথম সংগঠিত করেন মওলানা ভাসানী ১৯৭৬ সালের ১৬ মে; যাকে বলা হয় ফারাক্কা মার্চ। তা ছাড়া সাম্প্রতিক দশকগুলোতে বামপন্থিদের সমন্বিত প্ল্যাটফর্ম তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি বেশ কয়েকটি লংমার্চ করেছে, যেগুলোর প্রভাব নেহায়েত কম ছিল না। যেমন, এর ফলে বিশেষত গ্যাস রপ্তানি, বন্দর ইজারার বিরুদ্ধে ওই নির্দিষ্ট সময়গুলোতে ব্যাপক জনমত তৈরি হয়। সরকারও সেগুলো বিবেচনায় নিতে বাধ্য হয়। ওইসব কর্মসূচির সঙ্গে জামায়াত জোটের লংমার্চ একেবারেই তুলনীয় নয়। তবে এ নামটা তারা দিয়েছে তাদের কথিত আন্দোলনে কিছুটা হলেও তেজোদীপ্ত ভাব আরোপের জন্য।

লক্ষণীয়, বিরোধী দলের লংমার্চ কর্মসূচির প্রভাব জনজীবনে প্রায় শূন্য হলেও সরকার এমন একটা ভাব দেখাচ্ছে, যেন তা তাদের চিন্তায় ফেলেছে। খোদ প্রধানমন্ত্রী ১ সেপ্টেম্বর বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে বলেছেন, বিরোধী দল এসব কর্মসূচির মাধ্যমে ‘অরাজকতা’ সৃষ্টির চেষ্টা করছে। এর ফলে ওই লংমার্চ কিছুটা হলেও আলোচনায় এলো। এটি যে জামায়াতের বিরোধী ভাবমূর্তির পালে হাওয়া দেওয়ার চেষ্টা নয়, তা কে বলতে পারে!
মজার বিষয় হলো, ১১ দলীয় ঐক্য যখন লংমার্চে সরকারকে হুমকি-ধমকি দিয়ে বেড়াচ্ছে, তখন বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতাসহ জামায়াতের ৩৪ জন সংসদ সদস্য রয়েছেন বিদেশ সফরে, যাদের সিংহভাগই সেখানে গেছেন পরিবারসহ। ১৭ দিনের এই সফরের সদস্য তাই ৭১ জন– বিশাল লটবহর (প্রথম আলো, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬)।
সপরিবারে নেতাদের এ বিদেশ সফর যে লংমার্চে দেওয়া জোট নেতাদের গরম বক্তব্যে একটু হলেও পানি ঢেলে দিচ্ছে, তাতে সন্দেহ নেই। সম্ভবত এ কারণে কর্মসূচিতে দলীয় নেতাকর্মীর ‘ব্যাপক’ সমাগম ঘটালেও সেগুলো সংবাদমাধ্যমে তেমন আলোচনার জন্ম দিচ্ছে না।
সত্য, জামায়াত ‘নিয়মতান্ত্রিক’ ও ‘জোরালো’ আন্দোলনের কথা বললেও তা যে কোনো অসতর্ক মুহূর্তে তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। যেমন, দলটির কার্যক্রম যতই নিষিদ্ধ হোক, রাজপথে যে কারও জোরালো আন্দোলনের সুবিধা আওয়ামী লীগের ঘরে যাবে না– তা বলা যায় না। তবে এ দুশ্চিন্তা সরকারের যতটা; জামায়াত ও তার মিত্রদের তার চেয়ে কম নয়।
জুলাই সনদের আলোকে সংবিধান সংশোধনের জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদকে সভাপতি করে ১২ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির জন্য বিরোধী দল থেকে সদস্যদের নাম চাওয়া হলেও তারা তা দেয়নি। এটিকে দেখিয়ে সরকার ও বিরোধী পক্ষের দূরত্বের কথা বলা হতে পারে। বাস্তবে জুলাই সনদ বা সংবিধান সংস্কার নিয়ে কতভাগ মানুষ কতটা ভাবছেন? ক্ষুধা পেটে, বিদ্যুৎ-জ্বালানির সংকটে ডুবে; সর্বোপরি নিজের জানমালের নিরাপত্তা নিয়ে সবসময় শঙ্কায় থেকে কারও পক্ষে কি ওইসব ওপরতলার সংস্কার নিয়ে ভাবা সম্ভব?
১১ দলীয় জোটের দাবিগুলোর মধ্যে বিদ্যুৎ, তেল, গ্যাস ও সার সংকট নিরসন; নিত্যপণ্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধে চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি বন্ধ; আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধ করা ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত আছে বটে, তবে তাদের মূল দাবি গণভোটের রায় বাস্তবায়ন। গণভোট নিয়ে জামায়াত ও তার মিত্ররা ছাড়া আর কোনো দলই কিন্তু কথা বলছে না, যদিও এ বিষয়ক সংলাপে ৩১টি দল অংশ নিয়েছিল।
লংমার্চের লক্ষ্য যেটাই হোক; জামায়াতের সবল বিরোধী দল হওয়ার চেষ্টা অন্তত এ যাত্রায় সম্ভবত সফল হচ্ছে না। আর যাই হোক, দেশের উদারপন্থি মানুষেরা জামায়াতের কথায় ভুলবে না। এমনকি আওয়ামী লীগ সমর্থকদের একটি অংশ গত সংসদ নির্বাচনে বিএনপিকে সমর্থন করলেও এখন সে অবস্থা নেই। নিজেদের অভিন্ন ভোটব্যাংক নিয়ে বিএনপি-জামায়াত হয়তো ঝগড়া করতে পারে, তবে তাকে তারা এমন পর্যায়ে যেতে দিবে না, যার ফলে আওয়ামী লীগের সুবিধা হয়।
সাইফুর রহমান তপন: সহকারী সম্পাদক, সমকাল
- বিষয় :
- সাইফুর রহমান তপন