অর্থনীতি
আর্থিক অন্তর্ভুক্তির দ্বিতীয় ধাপে যা করতে হবে
হোসেন জিল্লুর রহমান
হোসেন জিল্লুর রহমান
প্রকাশ: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৪৬ | আপডেট: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১০:২০
| প্রিন্ট সংস্করণ
ফাইন্যান্সিয়াল ইনক্লুশন ২.০ বা অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তির দ্বিতীয় ধাপ নিয়ে পিপিআরসির পক্ষ থেকে আমরা সম্প্রতি একটি সংলাপের আয়োজন করেছি। সেখানে অর্থমন্ত্রীসহ অর্থনীতির বিভিন্ন খাতসংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল অনেকে কথা বলেছেন। ফাইন্যান্সিয়াল ইনক্লুশন ২.০-তে আর্থিক সেবার আওতা বাড়ানোর পর এখন মানুষের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। তবে অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তির দ্বিতীয় ধাপের কথা যখন বলছি, তখন প্রথম ধাপ নিয়েও কিছুটা বলা দরকার।
অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তির প্রথম ধাপের বড় ধরনের পলিসি এজেন্ডা ছিল দারিদ্র্য বিমোচন। বিশেষত যারা ‘আনব্যাংকড পপুলেশন’–যাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ছিল না, তাদের অন্তর্ভুক্ত করা ছিল প্রথম ধাপের একটি প্রধান লক্ষ্য। তখনকার অন্যতম চালক ছিল মাইক্রোফাইন্যান্স বা মাইক্রোক্রেডিট। গ্রামীণ ব্যাংক, পিকেএসএফের মতো মাইক্রোফাইন্যান্স ইনস্টিটিউশন (এমএফআই) প্রথম কার্যক্রম শুরু করে। ২০০৬ সালে তৈরি হয় মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি আইনগত সংকট সমাধানের জন্য।
আমরা দেখেছি ক্ষুদ্রঋণের সঙ্গে ডিজিটাল পদ্ধতিতে টাকা লেনদেনের জন্য মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস (এমএফএস) এবং এজেন্ট ব্যাংকিং যুক্ত হয়েছে, বাংলাদেশে আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে যেগুলোর অবদান উল্লেখযোগ্য। তবে মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের উপযোগী অর্থায়ন আর্থিক অন্তর্ভুক্তির পরবর্তী বড় চ্যালেঞ্জ। জামানতনির্ভর ঋণ, জটিল প্রক্রিয়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অর্থায়নের ঘাটতি এখনও বহু উদ্যোক্তাকে আনুষ্ঠানিক ঋণব্যবস্থার বাইরে রাখছে।
লক্ষণীয়, প্রথমে এমএফআই, তারপর এমএফএস এবং এজেন্ট ব্যাংকিং এসেছে। এখানে গ্রাহকরা হৃৎপিণ্ড। এই ইকোসিস্টেমে গ্রাহক শুরুতে বিনিয়োগ করে ফোনে। কারণ মোবাইল কিনতে কোনো এমএফএস অপারেটর তাকে টাকা দিচ্ছে না। সেই অর্থে গ্রাহক এমএফএস সিস্টেমে সহবিনিয়োগকারী। আর ক্ষুদ্রঋণ ও এজেন্ট ব্যাংকিং গ্রামের মানুষের দোরগোড়ায় ব্যাংকিং সেবা এনেছে। অন্যদিকে এমএফএস গ্রাম, শহর, মফস্বল এমনকি বিদেশে থাকা প্রবাসীদেরও যুক্ত করেছে। অবশ্য এ অন্তর্ভুক্তি ভালো হলেও তা সব ক্ষেত্রে ক্ষমতায়ন করতে পারেনি। যেমন এজেন্ট ব্যাংকিং; তারা সেবা দিচ্ছে, সঞ্চয় কাজে লাগছে, কিন্তু ক্ষমতায়ন কতটা হয়েছে?
প্রযুক্তি ও ডেটা বা তথ্যভান্ডারের বিষয়টাও গুরুত্বপূর্ণ। তবে অন্তর্ভুক্তি করার চ্যালেঞ্জটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আগে যারা ব্যাংকের বাইরে ছিল তারাই এখানে লক্ষ্যবস্তু। ব্যাংকের প্রচলিত প্রসিডিউর বা প্রক্রিয়া এ ক্ষেত্রে সংকট তৈরি করছে।

অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তির দ্বিতীয় ধাপে আমি চারটি নীতিগত বিষয় তুলে ধরতে চাই। প্রথমত, ধারাবাহিকতা রক্ষা করা–প্রথম ধাপ থেকে দ্বিতীয় ধাপে রূপান্তর। এখানে বাদ পড়াদের যুক্ত করতে হবে। সবাই নাও আসতে পারে, তবে চেষ্টা হবে সর্বোচ্চ। দ্বিতীয়ত, এখন দারিদ্র্য দূরীকরণ নয়; বরং সমম্বিত ডিজিটাল ভবিষ্যতের জন্য অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে ইনফরমাল (অপ্রাতিষ্ঠানিক) থেকে ফরমালের (প্রাতিষ্ঠানিক) দিকে নিতে হবে। তৃতীয়ত, প্রবৃদ্ধি বাড়ানো। দুই ধরনের গ্রুপ আগে বাইরে ছিল দারিদ্র্যের কারণে। সেখানে ব্যাংকিং আইনে তাদের আনা যাচ্ছিল না। তাদের কুটির, মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারিশিল্পের মাধ্যমে ঋণ দিয়ে নিয়ে আসা। এখানে প্রবৃদ্ধির বিষয়টা গুরুত্বপূর্ণ। চতুর্থত, সরকার ট্যাক্স টু জিডিপি রেশিও বা কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছে। সেটির জন্য প্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতির আকার বড় হতে হবে। ব্যাংকে লেনদেনের সূত্র ধরে কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো যাবে।
এখানে দুটো কর্ম প্রক্রিয়া আছে– ইন্টিগ্রেটেড ডিজিটাল ফাইন্যান্সিয়াল সিস্টেম (অবিচ্ছিন্ন আর্থিক সিস্টেম) ও সিএমএসএমই বা কুটির-ক্ষুদ্র-মাঝারি শিল্প খাতের আর্থিক ক্ষমতায়ন। তারা ব্যাংকের গ্রাহক হলেও দুটো কারণে সমস্যায় পড়ছে। কোলেটারাল প্রিন্সিপাল তথা জামানতের সমস্যা এবং আরেকটা হলো কর্মসম্পাদন বা পদ্ধতিগত জটিলতা।
এ প্রসঙ্গে সম্প্রতি সরকার ঘোষিত তিনটি প্রাসঙ্গিক নীতি আলোচনার দাবি রাখে। অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে এবং কর্মসংস্থান বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি বড় প্রণোদনা প্যাকেজ বা স্টিমুলাস প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। দ্বিতীয়টি হলো, এখনও তা টেবিলে আছে, প্রায়োরিটি সেক্টর টার্গেটিং বা অগ্রাধিকার খাত নির্ধারণ– অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং টেকসই উন্নয়নের জন্য নির্দিষ্ট কিছু খাতকে চিহ্নিত করে সেগুলোতে বিশেষ নজর ও নীতিগত সহায়তা দেওয়া। বিশেষ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে তাদের মোট ঋণের একটি নির্দিষ্ট অংশ এই অগ্রাধিকার খাতগুলোতে বিতরণ করার নির্দেশ দিয়ে থাকে। তবে এ ক্ষেত্রে তারাই বেশি লাভবান হয়, যাদের গলার জোর আছে। এখানে গার্মেন্টসের কণ্ঠ শক্তিশালী। কিন্তু কৃষি, বিশেষ করে যদি রাজশাহী অঞ্চলের আম ব্যবসায়ীদের কথা বলি, তাদের কণ্ঠ তেমন নেই। ফলে তারা এখানে বঞ্চিত হতে পারে।
সরকারের আরেকটি নীতিগত বিষয় হলো বাংলা কিউআর। দেশে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও ডিজিটাল লেনদেন বাড়ানোর ক্ষেত্রে বাংলা কিউআর একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এটি সহজে আন্তঃলেনদেনযোগ্য (ইন্টার অপারেবল) ডিজিটাল আর্থিকব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রাথমিক ধাপ হিসেবে কাজ করছে। তবে এটির অপব্যবহার রোধ এবং তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরি।
নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা অনেক। একটা হতে পারে বিগ ব্যাং উল্লম্ফন জাতীয় পদক্ষেপ, আরেকটা হচ্ছে টেকসই রোডম্যাপ অ্যাপ্রোচ। এমএফআই ও এমএফএস সবগুলো এক ধরনের শিখে শিখে বেড়ে উঠেছে। কভিডের সময়ের প্রণোদনা প্যাকেজে কৃষি ও এসএমই খাত সেভাবে গুরুত্ব পায়নি। ইডকল সোলার সিস্টেম বাড়িতে বাড়িতে বসাতে ভূমিকা রাখছে। কিন্তু সেখানে অতি উল্লম্ফন হয়েছে দাতা-গ্রহীতা (এন্ড টু এন্ড) সিস্টেমবিষয়ক পরিকল্পনা ছাড়া। হাইটেক পার্ক আরেকটা এ রকম বড় উদ্যোগ। ২০০৯ সালে নেওয়া হলেও এখনও তেমন কার্যকর নয়। সে জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলো কমপ্লায়েন্স বা নিয়মনীতি মেনে টেকসই পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন। আমাদের হাইটেক (উচ্চতর প্রযুক্তি) ও প্রচলিত প্রযুক্তি বা লো-টেকের মিশ্রণ দরকার। মানুষের সঙ্গে ডিজিটাল প্রযুক্তির উদ্ভাবনমূলক সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ। একটা সময় ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলায় জোর দেওয়া হয়। তা আর্থিক অন্তর্ভুক্তীকরণে তেমন ভূমিকা রাখেনি।
দেশে উদ্যোক্তা ও ব্যবসাবান্ধব মানুষের অভাব নেই। বিশেষ করে কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতের উদ্যোক্তারা উদ্ভাবনী চিন্তাভাবনা নিয়ে কাজ করতে প্রস্তুত। কিন্তু অর্থায়নের সীমিত সুযোগ, জটিল প্রক্রিয়া, নিয়মনীতি ও নীতিগত সীমাবদ্ধতা তাদের অগ্রযাত্রা বাধাগ্রস্ত করছে। এটিও নীতিনির্ধারকদের দেখতে হবে।
ড. হোসেন জিল্লুর রহমান: অর্থনীতিবিদ; এক্সিকিউটিভ চেয়ারম্যান, পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি)