ঢাকা সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

প্রযুক্তি

গল্প লেখার মতো সৃজনশীল কর্মেও এআই কেন?

গল্প লেখার মতো সৃজনশীল কর্মেও এআই কেন?
×

পাভেল পার্থ

পাভেল পার্থ

প্রকাশ: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৩২ | আপডেট: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১১:৩১

| প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশ সরকারের তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগের (আইসিটি) অধীনে এক বিশেষ গবেষণা ও অনুসন্ধান শাখা হিসেবে তৈরি হয়েছে ‘ব্রেইনল্যাব’। বাংলা ভাষায় প্রযুক্তিবান্ধব উন্নয়ন, বিভিন্ন গবেষণা টুল ও প্ল্যাটফর্ম তৈরি, বাংলা ন্যাচারাল ল্যাংগুয়েজ প্রসেসিং, স্পিচ সিস্টেম উন্নয়নের পাশাপাশি অন্তর্ভুক্তিমূলক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নিয়ে কাজের লক্ষ্যেই মূলত এর প্রতিষ্ঠা। 

সম্প্রতি ব্রেইনল্যাবের ওয়েবসাইটে একটি ‘গল্প লেখা প্রতিযোগিতা’র বিজ্ঞাপন দেখে ভিরমি খাই। এআই ব্যবহার করে গল্প লেখা প্রতিযোগিতা। প্রতিযোগিতার গল্পটি বাংলায়, ১৫০০ শব্দের ভেতর হতে হবে এবং এআই ব্যবহারের তথ্য প্রদত্ত ফরমে দিতে হবে। গল্পটি ‘মৌলিক’ হতে হবে। এআই ব্যবহার করে তৈরি গল্প কীভাবে ‘মৌলিক’ হতে পারে? তা স্পষ্ট করেনি ব্রেইনল্যাব। 

এআই দিয়ে তৈরি গল্পটি কার সৃজনশীল সৃষ্টিকর্ম? কোনো ব্যক্তি বা সমষ্টিগত মানুষ, নাকি মানুষ নিয়ন্ত্রিত এআই অ্যালগরিদম? এআই দিয়ে বাংলা ভাষায় প্রথম ‘উপন্যাসটি’ বানিয়েছিলেন ড. মাহফুজ শামীম। ১০ ফর্মার সেই বইটি তৈরি হয়েছিল মাত্র পাঁচ দিন ৮ ঘণ্টার ভেতর। ‘যুবক যেখানে যেমন’ নামে বইটি ২০২৫ সালে প্রকাশ করেছিল নৈঋতা ক্যাফে। বইটিতে বলা হয়েছে ড. শামীম বইটি গ্রন্থনা করেছেন। অথচ এআই দিয়ে যিনি গল্পটি তৈরি করবেন, তাকে ব্রেইনল্যাব ‘লেখক’ এবং এআইকে গল্পের ‘সহ-লেখক’ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে চায়। 
এআই দিয়ে লেখা গল্প কি কোনো ‘প্রতিযোগিতা’য় অংশ নিতে পারে? ‘প্রতিযোগিতা’ বিষয়টি তো রক্ত-মাংসের দুনিয়ার চিন্তা। তাই পুরস্কার পাওয়া-না পাওয়া ‘সহ-লেখক’ এআইর কাছে কোনো বার্তা তৈরি করে না।

ময়দান, মাঠ, রাজপথ, গলি, জমিন, জলা, কারখানা, কক্ষ, দায়, উদ্যান, নদী, দরবার, পাহাড়, জমায়েত, প্রদর্শনী, অভ্যুত্থান, বাহাস, তর্ক, মিছিল, আলো-ছায়া, ক্ষুধা, বঞ্চনা, দরদ, দুর্যোগ, দাগ, দাহ, দ্রোহ কিংবা খামার তৈরি করে আমাদের গল্পের জমিন। যাপিত জীবনের বহুমুখী গ্রন্থি পরিসরের ভেতর দিয়ে আমরা লেখক হয়ে উঠি। এআইর কাছে সৃজনশীলতা বন্ধক রেখে বা বন্দি করে ‘সহ-লেখক’ হওয়ার প্রবণতা কলোনিয়াল লিগাসির নয়া চেহারাকে প্রতিষ্ঠিত করে। এই ‘প্রতিযোগিতা’ নতুন প্রজন্ম, জেন-জি, টেক-প্রজন্ম বা সর্বনাগরিকের কাছে ভুল বার্তা দেবে। সৃজনশীলতার শ্রমঘন বহু বিচিত্র ধারা ও অনুশীলনের বৈচিত্র্য থেকে ক্রমশ বিচ্ছিন্ন হওয়ার উস্কানি আছে এমন অস্পষ্ট প্রতিযোগিতার বিজ্ঞাপনে।  
কিন্তু ডিজিটাল ঔপনিবেশিক দুনিয়ায় নিতান্তই ক্ষমতাহীন এক রাষ্ট্রের কোনো প্রতিষ্ঠান কেন এমন জনসংস্কৃতি-বিচ্ছিন্ন তৎপরতা জারি করে? সৃষ্টিকর্মের ঐতিহাসিক পরম্পরার এই জমিনে সৃজনশীলতা নিয়ে এমন ডিজিটাল-বাহাদুরির কী দরকার? 

বিজ্ঞাপনে ব্রেইনল্যাব লিখেছে, ‘...গল্প লেখা মানুষের সৃজনশীল চর্চার অংশ। কখনও তা মৌলিক সৃজনশীলতা চর্চার মানদণ্ড। এআইয়ের বিকাশ এমন স্তরে পৌঁছেছে যে, মৌলিক আইডিয়া তৈরিতে বা গল্পের ভাষা দ্রুত পরিবর্তনে এআই সহযোগী ভূমিকা রাখতে পারে। এমনকি বাংলা ভাষার খ্যাতিমান সাহিত্যিকদের ভাষা-শৈলীও অনুসরণ করতে পারে। তবে জনপরিসরে গল্প লেখার মতো মৌলিক কার্যক্রমে এআইয়ের ব্যবহার ঠিক কিনা, এ নিয়ে সংশয় ও সন্ধিগ্ধ দৃষ্টি রয়েছে। প্রোগ্রামিং কোডের মতোই গল্প লেখার কাজে এআইয়ের ভূমিকা রাখার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এই ভূমিকা নিয়ে অনেক বিতর্ক যেমন শুরু হয়েছে, তেমনি এর গ্রহণযোগ্যতা ধীরে হলেও বাড়ছে...।’ 

ব্রেইনল্যাবের এ বিজ্ঞাপনে এআই ঘিরে সৃজনশীলতা, মেধাস্বত্ব, পরিবেশ ও কর্তৃত্ববাদের বৈশ্বিক তর্কগুলো অনুপস্থিত। সৃজনশীলতা ও এআই বিষয়ে ব্রেইনল্যাবের দার্শনিক ও রাজনৈতিক অবস্থানও বিজ্ঞাপনে স্পষ্ট নয়। 

বহু প্রমাণ আছে– প্রান্তিকতা ও নিম্নবর্গ বিষয়ে এআই খণ্ডিত, ভুল এবং পক্ষপাতমূলক ধারণা দেয়, যা ঐতিহাসিক বর্ণবাদ এবং বৈষম্যমূলক শ্রেণি-ক্ষমতার ভিত মজবুত করে। তাহলে এই খণ্ডিত ও নিয়ন্ত্রিত তথ্য দিয়ে একজন গল্পকার কীভাবে নিজের মৌলিক গল্পটি লিখবেন?

২০২৫ সালে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) অ্যাকশন সামিটে প্রদত্ত ভাষণে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস জানান, ‘...এআই আমাদের পৃথিবীকে বিস্ময়কর গতিতে পুনর্গঠন করছে। কিন্তু সতর্ক থাকা জরুরি– এই দুর্দান্ত সম্ভাবনা একই সঙ্গে ঝুঁকিও তৈরি করে।’ ২০২৪ সালে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের সাধারণ সভায় এআই এবং সতর্কতার ক্ষেত্রে বলা হয়, ‘এই পদ্ধতিকে অবশ্যই মানবাধিকার এবং মৌলিক স্বাধীনতাকে শ্রদ্ধা, সুরক্ষা এবং বিকশিত করতে হবে।’ নিজের মতো গল্প বাছাই ও বলার ধরন মানবাধিকার ও স্বাধীনতার অংশ। এআই দিয়ে গল্প লেখার মতো সৃজনশীল তৎপরতার ক্ষেত্রে আমাদের নীতিগত অবস্থান জরুরি।  
বিপুল পানির অপচয়, কার্বণ নিঃসরণ, বন ও প্রাকৃতিক ভূমির ওপর চাপ, খনিজ উত্তোলন ও জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার হয় এআই প্রযুক্তি ও ডেটা সেন্টারে। এআই দিয়ে গল্প লেখার কারণে কী পরিমাণ পানি ও শক্তির অপচয় হবে, তা কি ব্রেইনল্যাব ভেবেছে? তীব্র বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের দেশে একটা গল্প লেখার জন্য এই নতুন পরিবেশগত চাপ তৈরি কি খুব জরুরি? আর আমাদের গল্পটাই তো প্রাণ, প্রকৃতি, পরিবেশ ও জনজীবনের সুরক্ষা নিয়ে। 

বাংলাদেশ এমন এক সময়ে এআই দিয়ে গল্প লেখা প্রতিযোগিতার আয়োজন করছে, যখন ‘অ্যানথ্রোপিক’ ও ‘ওপেনএআই’ কোম্পানির প্রধান গবেষক জ্যাকব কক্সের পদত্যাগ বিশ্বব্যাপী এআই ব্যবস্থার ঝুঁকির আলাপকে আরও জটিল করে তুলেছে। ব্রেইনল্যাব বলেছে, ‘হিউম্যান-এআই ইন্টারঅ্যাকশন’ বুঝতে তারা এই গল্প প্রতিযোগিতার আয়োজন করছে। অথচ কক্সের আশঙ্কা, এআই প্রযুক্তি-বাণিজ্য ক্রমশ ধ্বংসাত্মক ‘সুপার-হিউম্যান’ বানাতে মরিয়া, যা ভবিষ্যতে মানুষের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে। 
মানুষ একটি স্বপ্নময় গল্পের জন্যই লড়ে ও বাঁচে। গল্প লেখার মতো সৃজনশীলতাকে এআই উপনিবেশের বাইরে রাখা জরুরি। কোনো দাসখত নয়; গল্প তার গল্প নিয়েই বাঁচুক।

পাভেল পার্থ: লেখক ও গবেষক

আরও পড়ুন

×