ঢাকা মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

শিক্ষাঙ্গন

বিবাহিত ছাত্রীর আসন বাতিল মানবাধিকার পরিপন্থি

বিবাহিত ছাত্রীর আসন বাতিল মানবাধিকার পরিপন্থি
×

খুশী কবির

প্রকাশ: ২২ ডিসেম্বর ২০২১ | ১২:০০

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের পাঁচটি হলে আসন বণ্টন সম্পর্কিত নীতিমালার একটি ধারায় বলা হয়েছে, 'কোনো ছাত্রী বিবাহিত হলে অবিলম্বে কর্তৃপক্ষকে জানাবেন। অন্যথায় নিয়ম ভঙ্গের কারণে তার সিট বাতিল হবে। শুধু বিশেষ ক্ষেত্রে বিবাহিত ছাত্রীকে চলতি সেশনে হলে থেকে অধ্যয়নের সুযোগ দেওয়া হবে। অন্তঃসত্ত্বা ছাত্রী হলে থাকতে পারবেন না।' এ নিয়ম নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন পাঁচ ছাত্রী হলের শিক্ষার্থীরা। তারা নিয়ম বাতিলের দাবিতে এরই মধ্যে সংবাদ সম্মেলন করেছেন। উপাচার্যের সঙ্গে দেখা করে নিয়মটি বাতিলের লিখিত আবেদন জানিয়েছেন। ব্রিটিশদের করা অনেক অযৌক্তিক নিয়ম থেকে আমরা স্বাধীনতার ৫০ বছর পরও বের হয়ে আসতে পারিনি। শিক্ষা আমাদের অন্যতম মৌলিক অধিকার। ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ নির্বিশেষে সব মানুষ সমান- এ স্বীকৃতি সংবিধান দিয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচটি নারী হলে বিবাহিত ও অন্তঃসত্ত্বা ছাত্রীদের থাকার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞাটি সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এটি সম্পূর্ণ মানবাধিকারের পরিপন্থি। এর মাধ্যমে নারীদের উচ্চশিক্ষার প্রতি অবজ্ঞা করা হয়েছে। ছাত্রীদের মৌলিক অধিকার খর্ব করা হয়েছে।
ছাত্ররা বিবাহিত হলে যদি আবাসিক হলে থাকতে বাধা না থাকে, তাহলে ছাত্রীদের ক্ষেত্রে এ নিয়ম নিঃসন্দেহে বৈষম্যমূলক। ছাত্ররা যখন হলে ওঠেন, তখন তো জিজ্ঞাসা করা হয় না যে আপনি বিবাহিত কিনা? কিংবা আপনার স্ত্রী অন্তঃসত্ত্বা কিনা। আপনাকে তাদের দেখতে যেতে হয় কিনা। তাহলে কেন ছাত্রীরা বিবাহিত হলে তার ওপর এ নিয়ম চাপিয়ে দেওয়া হবে? বলতে পারেন নারী সন্তান ধারণ করেন। তাই যে কোনো সময় শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে পারে- এ আশঙ্কায় এমন নিয়ম করা হয়েছে। অসুস্থ তো পুরুষ বা ছাত্ররাও হতে পারে। শিশু থেকে যে কোনো মানুষ যে কোনো সময় অসুস্থ হতে পারেন। হৃদরোগ থেকে শুরু করে স্ট্রোকসহ নানা রোগে যে কোনো বয়সের শিক্ষার্থী আক্রান্ত হতে পারে। তাহলে শুধু গর্ভধারণকালীন বিষয়টি সামনে এনে বিবাহিত বা অন্তঃসত্ত্বা ছাত্রীদের হলে থাকতে না দেওয়ার নিয়ম কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। এ মানসিকতা থেকে বের হয়ে আসতে না পারলে কখনোই বৈষম্যমূলক সমাজ বা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হবে না।
যেসব ছাত্রী দীর্ঘদিন পরে হলেও বৈষম্যমূলক এ নিয়মটি আমাদের সামনে নিয়ে এসেছেন, তাদের অন্তরের অন্তস্তল থেকে ধন্যবাদ জানাই। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা রয়েছে। আন্দোলন ছাড়া যে কোনো দাবি আদায় করা যায় না, তা এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের চেয়ে ভালো আর কে জানেন! বাঙালিদের আন্দোলনের মুখে আইয়ুব খান পরাজিত হয়েছেন। ছয় দফা, ১১ দফা এমনকি আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে দুর্বার আন্দোলনের মাধ্যমেই স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ জন্ম নেয়। আন্দোলনের মাধ্যমে বিবাহিত মেয়েদের হলে থাকার অধিকার আদায় করে নিতে হবে। সেই আন্দোলনে আমরা পাশে থেকে শুধু সমর্থনই করে যাব না; প্রয়োজনে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে তাদের সঙ্গে আন্দোলনে নামব।
দেশের ৬৪ জেলা থেকে ছাত্রছাত্রীরা এসে স্বপ্নের বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। এখানে বললেই ভর্তি হওয়া যায় না। তীব্র প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয়ে একটি আসনের বিপরীতে কখনও কখনও অর্ধশতাধিক মেধাবীকে টপকিয়ে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে হয়। ঢাকার বাইরে থেকে আসা মেধাবীদের অনেকের রাজধানীতে বাড়ি বা আত্মীয়স্বজন থাকে না। ফলে ভর্তি হয়ে প্রথম বর্ষে হলে উঠতে না পেরে অনেককে বিড়ম্বনা পোহাতে হয়। আবার হলে ওঠার পর একটি বিছানায় একজন না ঘুমিয়ে দু'জন ঘুমাতে হয়। গণরুমের সঙ্গে আমরা প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা সবাই পরিচিত। হলে থাকার প্রধানত দুটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, ঢাকার বাইরে থেকে আসার কারণে একটি নিরাপদ আবাসস্থল। এ ছাড়া যানজট এড়ানোর জন্য। যেন আসা-যাওয়ার ভোগান্তি পোহাতে না হয়। একই সঙ্গে ভালো পরিবেশে পড়ালেখা করার সুযোগ পেতে চান তারা।


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত হল নেই। ছাত্রদের জন্য ১৩টি হল রয়েছে। এত বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের মাত্র পাঁচটি ছাত্রী হল রয়েছে। ফলে এক রুমে গাদাগাদি করে থাকতে গিয়ে পড়ালেখার পরিবেশ থেকে বঞ্চিত হতে হয় তাদের। অনেকে আবার ফ্লোরিং করে থাকেন। ছাত্ররা হলে স্থান না পেলে মেসে থাকতে পারেন। এ ক্ষেত্রে মেয়েদের বিষয়টা অত সহজ না। কারণ, তাদের পদে পদে নানা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়। এ কারণে অবশ্যই আরও হল তৈরি করা দরকার। যেন দূর-দূরান্ত থেকে উচ্চশিক্ষার তাগিদে ছুটে আসা সব শিক্ষার্থী হলে সঠিক পরিবেশে থেকে পড়ালেখা করতে পারেন। উচ্চশিক্ষা হতে হবে গবেষণাধর্মী। গাদাগাদি করে থেকে সেই গবেষণা কতটুকু সফল হবে- সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।
প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষের বিয়ে করা অন্যায় নয়। তাহলে শুধু বিবাহিত হলে হলে থাকতে না দেওয়ার এ নিয়মকে বর্বর নিয়ম বলে আখ্যায়িত করলেও ভুল হবে না। পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় এখনও নারীদের বিয়ের পর গৃহবধূর বেশি অনেকে ভাবতে চান না। তারা মনে করে, নারীদের প্রধান দায়িত্ব হলো সংসার করা। নারীরা রান্নাবান্না করবে আর বাচ্চা জন্ম দেবে ও লালন-পালন করবে। এ শ্রেণির মানুষের কাছে নারীর উচ্চশিক্ষা গৌণ। বিয়ে হয়ে গেলেই যে মেয়েরা আর পড়ালেখা করতে পারবে না বা জাতিকে কিছু দিতে পারবে না- এমন কথা আমি অন্তত বিশ্বাস করি না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কন্যা সায়মা হোসেন পুতুল পিএইচডি করেছেন বিয়ের পর। আন্তর্জাতিকভাবে দক্ষতার পরিচয়ে বক্তব্য দিয়ে এরই মধ্যে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পেরেছেন তিনি। অটিজম নিয়ে কাজ করে তিনি আজ সবার কাছে রোল মডেল। জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী রাজনীতিতে সক্রিয় হয়েছেন বিয়ের পর। এর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ থেকে পাস করে আইন পেশায় নিয়োজিত ছিলেন তিনি। সুতরাং বিয়ে কারও প্রতিভাকে আটকে রাখতে পারে না; বরং যুগ যুগ ধরে চলে আসা নিয়ম নারীকে তার অধিকার থেকে বঞ্চিত করে আসছে। এখন সময় এসেছে এ নিয়ম বদলানোর।
পাঁচটি ছাত্রী হলের শিক্ষার্থীরা তাদের দাবি নিয়ে উপাচার্য ড. মো. আখতারুজ্জামানের সঙ্গে দেখা করেছেন। উপাচার্য বলেছেন, 'কিছু লোকের হঠকারী চিন্তায় কিছু করা যাবে না। হল কর্তৃপক্ষ ও ডিনস কমিটির সভায় আলোচনা করে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। কোনো পরিবর্তন না আসা পর্যন্ত এ নিয়মই বলবৎ থাকবে।' হঠকারী সিদ্ধান্ত কেউ নিতে বলেনি। কিন্তু এটা তো জলের মতো পরিস্কার যে, দিনের পর দিন চলে আসা এ নিয়মে চরম বৈষম্যের শিকার হয়েছেন বিবাহিত ছাত্রীরা। এখন সময় এসেছে পুরোনো এ ভুল শুধরে নতুন উদাহরণ সৃষ্টি করার। ব্রিটিশদের করা সান্ধ্য আইন কিন্তু যুগ যুগ ধরে চলছে। হলে বৈষম্যের বিষয়টি আরও আগেই তোলা উচিত ছিল। এটিকে সামনে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে পাঁচটি হলের নারী প্রতিনিধিদের পাশাপাশি সংবাদমাধ্যমের বিশাল ভূমিকা রয়েছে। দেশের সব প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও অনলাইন মিডিয়া ছাত্রীদের যৌক্তিক দাবিকে সমর্থন করে গুরুত্ব দিয়ে সংবাদ পরিবেশন করছে। টকশোতে আলোচনা হচ্ছে, পত্রিকায় সম্পাদকীয় ছাপা হচ্ছে। গত ২১ ডিসেম্বর সমকাল 'বিবাহিত ছাত্রীর আসন বাতিল/ অমানবিক, অবৈজ্ঞানিক, অসম' শিরোনামে সম্পাদকীয় ছেপেছে। সংবাদমাধ্যমের এসব ইতিবাচক ভূমিকা দেখলে সাহস পাই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টির পক্ষে ব্যাপক জনসমর্থন গড়ে উঠছে। এ জনসমর্থন গণজোয়ারে রূপ নিয়ে অধিকার ফিরে পাবে আমার বোনরা- এ বিশ্বাস আছে।
খুশী কবির :সমন্বয়ক, নিজেরা করি

আরও পড়ুন

×