সক্রিয় করার উদ্যোগেও নিষ্ক্রিয় ১৪ দল
অমরেশ রায়
প্রকাশ: ২০ এপ্রিল ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ২০ এপ্রিল ২০২২ | ২০:১৭
গতি ফিরছে না আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলে। অনেকটা খাপছাড়াভাবেই এগোচ্ছে জোটের কার্যক্রম। প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার সঙ্গে শরিক দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের বৈঠকের পর চিঠি দিয়ে তৃণমূল পর্যন্ত জোটকে শক্তিশালী করার নির্দেশনা দেওয়া হলেও অগ্রগতি নেই। ফলে জোটের শরিক দলগুলোর রয়েছে হতাশা, আওয়ামী লীগের সঙ্গে থেকে যাচ্ছে দূরত্ব।
এদিকে দীর্ঘদিন ধরে জোটে নিষ্ফ্ক্রিয় থাকার পর ১৪ দল ছেড়েছে শরীফ নুরুল আম্বিয়ার নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাসদ। দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরামের বৈঠকে জোট ছাড়ার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেছে দলটি। যদিও এ বিষয়ে আওয়ামী লীগ কিংবা ১৪ দলকে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানোর প্রয়োজনও মনে করছে না তারা। বর্তমানে সমমনা ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তির দলগুলোকে নিয়ে আলাদা মোর্চা বা জোট গঠনের চেষ্টা শুরু করেছে বাংলাদেশ জাসদ।
জোটগত কার্যক্রম ঝিমিয়ে পড়ার পটভূমিতে গত ১৫ মার্চ জোটের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার বৈঠকের পর কার্যক্রমে গতি ফেরার আশা করেছিল শরিক দলগুলো। প্রায় তিন বছর পর অনুষ্ঠিত ১৪ দলের শীর্ষ পর্যায়ের ওই বৈঠকে গত তিনটি নির্বাচনের ধারাবাহিকতায় আগামী জাতীয় নির্বাচনেও জোটগতভাবে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পাশাপাশি তৃণমূলে জোটের কার্যক্রমকে সংগঠিত ও এগিয়ে নেওয়ার তাগিদ দেন শেখ হাসিনা।
সূত্র মতে, গণভবনের ওই বৈঠকের পরপরই নিজেদের মধ্যে আরেক দফা বৈঠক করেন ১৪ দল নেতারা। পরে ১৪ দলের সমন্বয়ক-মুখপাত্র ও আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আমির হোসেন আমু জেলা নেতাদের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়ে সারাদেশে জোটের কার্যক্রমকে সক্রিয় ও শক্তিশালী করার নির্দেশনা দেন। দুই মাস পার হলেও ১৪ দলকে সক্রিয় করার এই উদ্যোগ কার্যত দৃশ্যমান হয়নি।
কেন্দ্রীয় পর্যায়েও এখনও দিবসকেন্দ্রিক ভার্চুয়াল আলোচনায় সীমাবদ্ধ রয়েছে জোটের কার্যক্রম।
সাম্প্রতিক সময়ে কিছু ইস্যু সরকারকে বেশ বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে। বিশেষ করে ভোজ্যতেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন বৃদ্ধিসহ জনজীবনের সংকট বেড়েছে। নতুন করে গ্যাস-পানি-বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির কথাবার্তাসহ সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলোর অপতৎপরতা বৃদ্ধি এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও র্যাব কর্মকর্তাদের ওপর আমেরিকার নিষেধাজ্ঞা ইত্যাদি বিষয়গুলোও সামাল দিতে সরকারকে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
১৪ দলের শরিক নেতারা বলছেন, এই অবস্থায় জনগণের সংকট নিরসনের পদক্ষেপ ও জনগণের সঙ্গে প্রত্যক্ষ সংযোগ বৃদ্ধিসহ প্রতিক্রিয়াশীল সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী গোষ্ঠীর মোকাবিলায় আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে অসাম্প্রদায়িক ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের জোট ১৪ দলকে সক্রিয় করে রাজপথে নিজেদের অবস্থান জানান দেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু সে রকম কোনো উদ্যোগ এখন পর্যন্ত চোখে পড়েনি। উল্টো টানা তিন মেয়াদে ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগকে দেশ পরিচালনায় আমলা ও প্রশাসননির্ভর হয়ে পড়তে দেখা যাচ্ছে। এতে রাজনৈতিক দলগুলো গুরুত্বহীন হয়ে পড়ায় দেশে এক ধরনের রাজনৈতিক শূন্যতা সৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে।
শরিক দলগুলোর নেতারা আশঙ্কা করছেন, ভোটের হিসাব মেলাতে গিয়ে আওয়ামী লীগ ও তার সরকার হেফাজতসহ সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীকেও 'কাছে টানার' আত্মঘাতী কৌশল নিয়ে এগোচ্ছে, যা ভবিষ্যতে দেশকে বিপদের মুখে ঠেলে দিতে পারে। বিশেষ করে এই প্রক্রিয়ায় মুক্তিযুদ্ধের ১৪ দলের কার্যক্রমকে যেভাবে গুরুত্বহীন করে ফেলা হচ্ছে, তা আগামী নির্বাচনে তাদের জন্য নেতিবাচক ফলাফল বয়ে আনতে পারে।
১৪ দলের অন্যতম শরিক বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন সমকালকে বলেন, তারা তো বরাবরই বলে আসছেন, ২৩ দফার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা ১৪ দল এখনও প্রাসঙ্গিক। কেননা অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ বিনির্মাণে ১৪ দলের সংগ্রাম এখনও পুরোপুরি সফলতা পায়নি। এখন আওয়ামী লীগ যদি মনে করে, ১৪ দলের প্রয়োজন আছে তাহলে তারা একে এগিয়ে নেবে। না হলে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে তার খেসারত আওয়ামী লীগের পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তিকেও দিতে হবে।
জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি হাসানুল হক ইনু বলেন, বিএনপি-জামায়াত জোটসহ সাম্প্রদায়িক অপশক্তির বিরুদ্ধে ১৪ দল গড়ে উঠেছিল। এখনও ওই সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী অপশক্তিকে পুরোপুরি পরাজিত করা যায়নি, রাজনীতির মাঠ থেকে নিশ্চিহ্নও করা যায়নি। কাজেই ১৪ দলের প্রয়োজনীয়তা এখনও ফুরিয়ে যায়নি। এরপরও আওয়ামী লীগ যদি মনে করে ১৪ দল রাখার প্রয়োজন নেই, তাহলে সেই সিদ্ধান্ত আওয়ামী লীগকেই নিতে হবে।
সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ বড়ুয়া বলেন, আসলে ১৪ দলকে শক্তিশালী ও গতিশীল করতে হলে আওয়ামী লীগকেই উদ্যোগ নিতে হবে। এর বদলে তারা যদি ভোট বাড়ানোর আশায় হেফাজতকে কাছে টানার চেষ্টা অব্যাহত রাখে, সেটা আওয়ামী লীগের জন্যও ক্ষতিকর হবে।
১৪ দলের সমন্বয়ক-মুখপাত্র ও আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আমির হোসেন আমু অবশ্য আগামীতে জোটের কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করা হবে বলে জানিয়েছেন। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর দিকনির্দেশনা অনুযায়ী এ নিয়ে কাজ করছেন তারা। ১৪ দল ঐক্যবদ্ধ আছে, ঐক্যবদ্ধই থাকবে।
জোট ছেড়েছে বাংলাদেশ জাসদ :জোটে থাকা না থাকা নিয়ে দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে টানাপোড়েন শেষে ১৪ দল ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ জাসদ। গত ২৮ মার্চ দলের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির অনলাইন বৈঠকে আনুষ্ঠানিকভাবে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলটি।
দলীয় সূত্র জানায়, ১৪ দল 'মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা থেকে সরে গিয়েছে' কিংবা '১৪ দল এখন অপ্রয়োজনীয় ও অতীত' এমনসব বক্তব্য দিয়ে এর আগে থেকেই জোট ছাড়ার জন্য চাপ দিয়ে আসছিলেন বাংলাদেশ জাসদের নেতারা। বিশেষ করে ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় নির্বাচনের পর থেকেই নানা অবহেলা ও অবমূল্যায়নে ক্ষুব্ধ ছিলেন তারা। ২০১৯ সালে দলের জাতীয় পরিষদের সভায় সারাদেশের নেতারা এ নিয়ে ব্যাপক সোচ্চার হন। পরে ওই সভায় জোট ছাড়ার সিদ্ধান্ত না হলেও ১৪ দল ও আওয়ামী লীগসহ সরকারের কঠোর সমালোচনা করে প্রস্তাব পাস হয়।
এরপর গত দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে ১৪ দলের কার্যক্রমে কার্যত নিষ্ফ্ক্রিয় ছিল বাংলাদেশ জাসদ। জোটের বৈঠক ও সভা-সমাবেশসহ সবধরনের কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া থেকে বিরত ছিল দলটি। সর্বশেষ ১৫ মার্চ গণভবনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকেও যায়নি দলটি।
সূত্র মতে, ১৪ দল ছাড়ার আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর নতুন জোট বা মোর্চা গঠনের প্রচেষ্টা জোরদার করেছে বাংলাদেশ জাসদ। সমমনা কয়েকটি দলের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছে তারা। এসব দলের মধ্যে রয়েছে পংকজ ভট্টাচার্যের নেতৃত্বাধীন ঐক্য ন্যাপ, আ স ম আবদুর রবের নেতৃত্বাধীন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডি এবং মাহমুদুর রহমান মান্নার নেতৃত্বাধীন নাগরিক ঐক্য। বাম গণতান্ত্রিক জোটভুক্ত বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ), বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি ও গণসংহতি আন্দোলনের নেতাদের সঙ্গেও অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ চলছে বাংলাদেশ জাসদ নেতাদের। তবে নতুন জোট গঠনের এই চেষ্টা খুব বেশি অগ্রসর হয়নি বলে জানিয়েছেন নেতারা।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ জাসদের সভাপতি শরীফ নুরুল আম্বিয়া সমকালকে বলেন, '১৪ দল এখন চাটুকারদের দলে পরিণত হয়েছে। আর আমরাও এখন ১৪ দলে নেই। দলের সর্বশেষ ওয়ার্কিং কমিটির মিটিংয়েই এই সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে আমাদের এই সিদ্ধান্ত আওয়ামী লীগ কিংবা ১৪ দলের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দিয়ে জানানোর কিছু আছে বলে আমরা মনে করি না। কাজের মধ্য দিয়েই এমনিতেই এটা পরিস্কার হয়ে যাবে।'
তিনি জানান, বর্তমানে বিভিন্ন দলকে নিয়ে গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট বা মোর্চা করার চেষ্টা চালাচ্ছেন তারা। তবে সেটাতে বলার মতো কোনো অবস্থা এখনও দেখা যায়নি।
এক প্রশ্নের জবাবে শরীফ নুরুল আম্বিয়া বলেন, প্রতিক্রিয়াশীল ও সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলো ছাড়া অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক সব দলের প্রতিই তাদের নতুন জোটে শরিক হওয়ার আহ্বান থাকবে। ১৪ দলের বর্তমান শরিকদের মধ্যেও কোনো দল যদি চাটুকারিতা ছেড়ে মোর্চায় আসতে চায়- তাদেরও স্বাগত জানাবেন তারা।
- বিষয় :
- ১৪ দল
- নিস্ক্রিয় ১৪ দল