ঢাকা মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সোলায়মানের এক বাগানে শত জাতের আম

সোলায়মানের এক বাগানে শত জাতের আম
×

মেজর (অব.) সোলায়মানের বাগানে জৈব সার ব্যবহারের মাধ্যমে রাসায়নিকমুক্ত আম উৎপাদন করা হয় সমকাল

 দিলদার হোসেন স্বপন, ফেনী 

প্রকাশ: ২৮ জুন ২০২৬ | ০৭:১৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

ফেনীর সোনাগাজীতে গড়ে উঠেছে ব্যতিক্রমধর্মী আমের বাগান, যেখানে একসঙ্গে চাষ হচ্ছে দেশি-বিদেশি ১০২ জাতের আম। ফেনী নদীর তীরবর্তী মুহুরী সেচ প্রকল্প এলাকায় ৬৫ একর আয়তনের ‘সোয়াস এগ্রো কমপ্লেক্স’ বাগানে রয়েছে ৬ হাজার আমগাছ। চলতি মৌসুমে বাগানে প্রায় ১০০ টন আম বিক্রি হবে; যার দাম কোটি টাকার বেশি।  
এই বাগানের বিশেষত্ব হলো, শুধু মৌসুমে নয়, বছরের প্রায় প্রতি ঋতুতেই কোনো না কোনো জাতের আম পাওয়া যায় এ বাগানে। দেশের চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, নওগাঁ, দিনাজপুর, রংপুরসহ বিভিন্ন অঞ্চলের জনপ্রিয় জাতের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র, স্পেন, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, ভারত, নেপাল, ভুটান ও চীনের বিভিন্ন জাতের আমের চাষ করা হচ্ছে এখানে।
খামারের প্রতিষ্ঠাতা মেজর (অব.) মো. সোলায়মান। ১৯৮৬ সালে সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেওয়ার পর কৃষিকে জীবনের নতুন ব্রত হিসেবে বেছে নেন তিনি। দেশের বিভিন্ন এলাকায় কৃষি, মৎস্য, গবাদিপশু পালন, মধু উৎপাদন ও নার্সারি ব্যবস্থাপনা বিষয়ে অভিজ্ঞতা অর্জনের পর ১৯৯২ সালে মাত্র তিন লাখ টাকা পুঁজি ও ছয় একর জমি নিয়ে যাত্রা শুরু করেন। বর্তমানে সেই উদ্যোগ ৬৫ একরের সমন্বিত কৃষি খামারে পরিণত হয়েছে।
মেজর (অব.) সোলায়মান জানান, চলতি মৌসুমে খামার থেকে প্রায় ৯০ থেকে ১০০ টন আম উৎপাদনের আশা করছেন। সাধারণ জাতের আম প্রতি কেজি ৮০ থেকে ১০০ টাকায় এবং ব্যানানা জাতসহ কিছু বিশেষ আম প্রতি কেজি ১৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গড়ে প্রতি কেজি আমের দাম ১০০ টাকা ধরলে ১০০ টনের দাম এক কোটি টাকা। এই আম বাজারে নিয়ে বিক্রির প্রয়োজন হয় না; ক্রেতারাই খামার থেকেই সংগ্রহ করেন। এছাড়া ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে আম পাঠানো হয়।
তিনি আরও বলেন, ‘বাগানে রাসায়নিক সার ব্যবহার করা হয় না। সারাবছর জৈব সার প্রয়োগ করা হয় এবং শুধু মুকুল আসার প্রায় দুই মাস আগে প্রয়োজন অনুযায়ী একবার কীটনাশক ব্যবহার করা হয়। খামারে বর্তমানে ২৫ জন স্থায়ী এবং ১০ জন দৈনিকভিত্তিক শ্রমিক কাজ করছেন।’
সংশ্লিষ্টরা জানান, কৃষি উদ্যোক্তা মেজর (অব.) সোলায়মানের এই উদ্যোগ শুধু একটি সফল খামারের গল্প নয়, বরং দেশের তরুণদের জন্য কৃষিভিত্তিক উদ্যোক্তা হওয়ার এক অনুপ্রেরণামূলক দৃষ্টান্ত। তাঁর বিশ্বাস, সরকারি সহযোগিতা ও যথাযথ পরিকল্পনা থাকলে বাংলাদেশের নিরাপদ ও মানসম্পন্ন আম বিশ্ববাজারে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হবে।
মিরসরাই থেকে আসা ক্রেতা মাঈন উদ্দিন বলেন, “এখানকার আম নিরাপদ ও মানসম্মত। তাই পরিবারের জন্য সরাসরি খামারে এসে আম কিনে নিয়ে যাচ্ছি।” খামারের ব্যবস্থাপক ও সাবেক সেনাসদস্য হেলাল হোসেন বলেন, ‘সম্পূর্ণ জৈবিক ব্যবস্থাপনায় উৎপাদিত আমের চাহিদা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক ক্রেতা খামারে এসে আম সংগ্রহ করছেন।’ খামারের কর্মচারী মো. নাহিদ বলেন, ‘প্রতিদিন গড়ে ৮০ থেকে ১০০ কেজি আম বিক্রি হচ্ছে। অধিকাংশ ক্রেতাই সরাসরি বাগান থেকে আম কিনে নিয়ে যাচ্ছেন।’ 
উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. হানিফ বলেন, ‘কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কারিগরি সহযোগিতায় খামারটিতে জৈবিক ও ব্যাগিং পদ্ধতিতে আম উৎপাদন করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে এখানকার আম বিদেশে রপ্তানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ মো. আতিক উল্যাহ বলেন, ‘চলতি মৌসুমে এ খামার থেকে প্রায় ১০০ টন আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানিযোগ্য মান নিশ্চিত করতে আধুনিক প্রযুক্তি ও ব্যাগিং পদ্ধতির ব্যবহার আরও সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।’

আরও পড়ুন

×