গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর
হিমাগারে পড়ে আছে আলু বাড়ছে লোকসানের বোঝা
সাদুল্লাপুরের ধাপেরহাটের আরভি কোল্ডস্টোরে মজুত করা আলু বাছাই করছেন শ্রমিকরা। শুক্রবার তোলা। ছবি: সমকাল
শাহজাহান সোহেল, সাদুল্লাপুর (গাইবান্ধা)
প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৯:৫৮
আলু ঘরে তুলেছিলেন লাভের আশায়। সেই আলুই এখন গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে সাদুল্লাপুরের কৃষক ও ব্যবসায়ীদের। হিমাগারে রাখা আলু বিক্রি করে উৎপাদন, পরিবহন, শ্রমিক ও সংরক্ষণ খরচই উঠছে না। প্রতি কেজি আলুতে লোকসান গুনতে হচ্ছে ৬ থেকে ৮ টাকা। ফলে ধাপেরহাটের আরভি কোল্ডস্টোরে মজুত করা আলুর বড় অংশই পড়ে আছে। ব্যবসায়ীর কেউ কেউ পুঁজি হারিয়ে ঋণগ্রস্ত হয়েছেন, কারও আবার নতুন করে আলু ব্যবসায় নামার সামর্থ্যও ফুরিয়ে এসেছে।
হিমাগারটিতে চলতি ২০২৫-২৬ মৌসুমে ১ লাখ ২৫ হাজার বস্তা আলু মজুত করেছিলেন স্থানীয় চার শতাধিক ব্যবসায়ী ও কৃষক। প্রতি বস্তায় আলু ছিল ৬৫ কেজি। বর্তমানে এর মধ্যে ৯৫ হাজার বস্তা বা প্রায় ৬ হাজার ১৭৫ টন আলু মজুত রয়েছে। বাজারে দাম কম থাকায় ব্যবসায়ীরা আলু তুলছেন না বলে জানিয়েছেন হিমাগার কর্তৃপক্ষ।
আরভি কোল্ডস্টোরের ম্যানেজার হামিদুল ইসলাম বলেন, আলু কেনা থেকে শুরু করে শ্রমিকের মজুরি, চটের বস্তা, পরিবহন ও হিমাগার ভাড়া– সব মিলিয়ে প্রতি কেজিতে ব্যবসায়ীদের ৬ থেকে ৮ টাকা লোকসান হচ্ছে। এ কারণে অনেকে আলু তুলছেন না।
ব্যবসায়ী আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, সব খরচ মিলিয়ে এক কেজি আলু কোল্ডস্টোরে রাখা পর্যন্ত তাঁর ব্যয় হয়েছে ১৮ থেকে ১৯ টাকা। কিন্তু এখন বিক্রি করতে গেলে পাওয়া যাচ্ছে ১১ থেকে ১২ টাকা। তাঁর ভাষায়, ‘এভাবে লোকসান দিয়ে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়।’ আরেক ব্যবসায়ী গোবিন্দ চন্দ্র সরকার বলেন, গত মৌসুমে লোকসান গুনে পুঁজি শেষ হয়ে গেছে। এবার আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ধার করে আলু মজুত করেছিলাম। এবারও লোকসান হওয়ায় নিঃস্ব হয়ে পড়েছি।
সাদুল্লাপুরে চলতি মৌসুমে লালপাকড়ি, কার্ডিনাল, ডায়মন্ড, সাদাহল্যান্ড ও বার্মা জাতের আলুর চাষ বেশি হয়েছে। রোপণ মৌসুমে বীজের দামও ছিল বেশি।
শহরের সুজন বীজ ভান্ডারের মালিক সুজন কুমার সরকার বলেন, রোপণ মৌসুমে তিনি প্রতি কেজি বীজ আলু ১১০ থেকে ১২০ টাকা দরে বিক্রি করেছেন। অনেক কৃষক এর চেয়েও বেশি দামে বীজ কিনেছেন। এর সঙ্গে সার, কীটনাশক, সেচ ও শ্রমিকের খরচ যোগ হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রতি কেজি আলুর উৎপাদন খরচ ১০ থেকে ১২ টাকা ছাড়িয়েছে।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫-২৬ মৌসুমে সাদুল্লাপুরে ২ হাজার ২৫০ হেক্টর জমিতে আলু চাষ হয়েছে। উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৫৬ হাজার ২৫০ টন। এর আগের ২০২৪-২৫ মৌসুমে উৎপাদন হয়েছিল ৩০ হাজার ৫০০ টন। উপজেলায় বছরে আলুর চাহিদা প্রায় ২০ হাজার টন। সেই হিসাবে চলতি মৌসুমে স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পর প্রায় ৩৬ হাজার ২৫০ টন আলু উদ্বৃত্ত থাকার কথা। উৎপাদন বাড়ায় বাজারে সরবরাহের চাপ তৈরি হয়েছে বলে কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা মনে করছেন।
গত মঙ্গলবার সাদুল্লাপুর শহরের খোলা বাজার ঘুরে দেখা গেছে, জাত ও মানভেদে প্রতি কেজি আলু ১৬ থেকে ১৮ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। খুচরা বিক্রেতা আলমগীর হোসেন বলেন, তিনি মহাজনের কাছ থেকে আলু কিনেছেন। মহাজন আবার গ্রামের পাইকারের কাছ থেকে সংগ্রহ করেছেন। কয়েক দফা হাতবদলের পর সেই আলু খুচরা বাজারে আসছে।
সাধারণ ক্রেতা মিজানুর রহমান বলেন, বর্তমানে ১৫ থেকে ১৬ টাকা কেজিতেই আলু পাওয়া যাচ্ছে। অন্যান্য সবজির তুলনায় দাম কম থাকায় ক্রেতারা স্বস্তিতে রয়েছেন।
তীলকপাড়া গ্রামের কৃষক আমিনুল ইসলাম বলেন, টানা দুই মৌসুম ধরে আলুতে লোকসান হওয়ায় কৃষকদের মধ্যে চাষের আগ্রহ কমছে। এভাবে চলতে থাকলে আসন্ন মৌসুমে আলুর চাষ কমে যেতে পারে।
ইসলামপুর গ্রামের কৃষক জাহিদুল ইসলাম বলেন, সরকারি প্রণোদনা না দিলে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন হবে। তাঁর মতে, আলুর চাষ কমে গেলে পরবর্তী সময়ে বাজারে সরবরাহ কমে গিয়ে ভোক্তাদের বেশি দামে আলু কিনতে হতে পারে। তাই এখনই কৃষকদের সহায়তায় উদ্যোগ নেওয়া দরকার।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা অপূর্ব ভট্টাচার্য বলেন, স্থানীয় চাহিদার তুলনায় গত দুই মৌসুমে আলুর উৎপাদন অনেক বেশি হয়েছে। অনুকূল আবহাওয়ার কারণে ফলনও ভালো হয়েছে। জমির ধরন অনুযায়ী এ এলাকায় কিছুটা বিলম্বে আলু উৎপাদন হওয়ায় ন্যায্য দাম নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি আলু রপ্তানির উদ্যোগ নেওয়া হলে কৃষক উপকৃত হতে পারেন।
তিনি বলেন, বর্তমান বাজারদরে ক্রেতারা স্বস্তিতে থাকলেও আলু মজুত করে রাখা প্রান্তিক কৃষক ও ব্যবসায়ীরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও ব্যবসায়ীদের জন্য সরকারি প্রণোদনার বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।
- বিষয় :
- গাইবান্ধা