পদ্মার চরে নারীর জীবন
ছবি:: ব্র্যাকের সৌজন্যে
লাবণী মণ্ডল
প্রকাশ: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৪:৪৫ | আপডেট: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৫:১৪
পদ্মার চরে কোথায় কোন গাছ রোপণ করা হবে, আবহাওয়া ও বন্যার ধরন অনুযায়ী মিশ্রচাষ, বা কোন বীজ কীভাবে সংরক্ষণ করা হবে– এসব সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব থাকে নারীর হাতে। অথচ কৃষকের তালিকা, জমির দলিল আর ক্ষতিপূরণের কাগজে তিনি অনুপস্থিত। লিখেছেন লাবণী মণ্ডল
----------------------------------
রান্নাঘরের গা ঘেঁষে একটা কুঠুরি। ভেতরে আলো কম, মাটির গন্ধ বেশি। তাকে সারি সারি বীজ। কোনোটা কাচের বয়ামে, কোনোটা কাপড়ের পুঁটলিতে, কোনোটা মাটির হাঁড়িতে। প্রতিটির গায়ে কাগজ সাঁটা; তাতে হাতে লেখা বীজের নাম।
মানিকগঞ্জের হরিরামপুরে পদ্মার চরের এ বাড়িতে বীজ কে সংরক্ষণ করেন–জানতে চাইলে বাড়ির আমেনা বেগম (৩৫) হাসলেন। বললেন, ‘এগুলা তো বাড়ির মেয়ে-বউদেরই কাজ। আশপাশে যত গাছ দেখতাছেন, যত সবজি দেখতাছেন, সব প্ল্যান আমাদের।’
এক পাক ঘুরতেই বাস্তবতা মিলে যায়। বেড়ায় করলা আর বরবটির লতা। ক্ষেতে টমেটো, বেগুন, ডাঁটা, মরিচ। নিজ থেকে গজানো নোনতা আর বতুয়া শাক আগাছা ভেবে তুলে ফেলা হয়নি; রাখা হয়েছে পাতে তোলার জন্য। বিলের পাড় ধরে তাল আর সুপারির সারি; যাতে শিকড় মাটি আঁকড়ে রাখে, পাড় সহজে না ভাঙে। একটা ফল গাছও বাজারের চারায় নয়।
কোন ফসলের পাশে কোন ফসল বসবে, কোন মৌসুমে কী বোনা হবে, পরের বছরের জন্য কোন বীজ তুলে রাখতে হবে–এসব ঠিক করেন এ বাড়ির নারীরা। কৃষিবিজ্ঞানে একে বলে মিশ্র ফসলের পরিকল্পনা। চরে এর যুক্তি সোজা। বন্যায় এক ফসল গেলে আরেকটা টিকে যায়। সারাবছর হাঁড়িতে কিছু না কিছু ওঠে। ঝুঁকি ভাগ করার এই কৌশল তারা শিখেছেন নদীর কাছ থেকে, কোনো প্রশিক্ষণ থেকে নয়। অথচ জমির দলিলে, কৃষকের তালিকায়, ভাঙনের ক্ষতিপূরণের কাগজে এই নারীদের নাম নেই।
শ্রম আছে, নাম নেই
আমেনার দিন শুরু হয় আলো ফোটার আগে। খড়ের পালা ভাঙা, উঠানে ধান মেলে দেওয়া, বৃষ্টির পর চারার গোড়া থেকে পানি সরানো, খড় বিছিয়ে মাটি ঢাকা, গরুর খাবার জোগানো, তিন বেলার রান্না। বর্ষা এলে কাজ বাড়ে দ্বিগুণ। উঠান ডোবে, পথ ডোবে। বীজ-চাল তুলতে হয় উঁচুতে। পানি নামলে কাদা ঠেলে আবার চারা বসানো।
ক্লান্ত লাগে না? আমেনা আর তাঁর শাশুড়ির উত্তর একই–‘এইটাই তো আমগো কাজ।’
এ বাড়ির ধান বাজারে যায় না। ‘যা হয় রান্না কইরা খাই, মেহমান খায়। আমাগো আউশ আর হিজলদিঘা চাউলের ভাত খাওন হয়।’ সমস্যার গোড়া এখানেই। যে ফসল বাজারে ওঠে না, অর্থনীতির হিসাবে তা ধরা পড়ে না। যে শ্রমের মজুরি নেই, তার দলিলও নেই। উৎপাদনের মূল ভার বইলেও সরকারি কাগজে এই নারীরা কৃষক নন।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য তুলে ধরে ভূমি অধিকার সংগঠন এএলআরডি জানিয়েছে, দেশের কর্মজীবী নারীর ৭৪ শতাংশ কৃষিতে যুক্ত। অথচ জমির কার্যকর মালিকানায় তাদের ভাগ মাত্র চার থেকে পাঁচ শতাংশ। ফসল উৎপাদনের ২১ ধরনের কাজের ১৭টিতে নারী জড়িত। এর মধ্যে রয়েছে–বীজ বাছাই, ফসল তোলা, মাড়াই, শুকানো, সংরক্ষণ। বিবিএস ও ইউএন উইমেনের ২০২১ সালের সময়-ব্যবহার জরিপ বলছে, বিনা মজুরির গৃহস্থালি ও সেবার কাজে পুরুষের চেয়ে নারী প্রায় সাতগুণ সময় দেন।
অথচ কৃষি অফিসের প্রশিক্ষণ, ভর্তুকির সার, প্রণোদনার বীজ, সহজ ঋণ, দুর্যোগের পরের সহায়তা, সবই যায় কৃষকের তালিকা ধরে। তালিকায় যার নাম নেই, তাঁকে হাত পাততে হয় স্বামী বা ছেলের কাছে।
জ্ঞান নারীর, সই পুরুষের
চরের প্রবীণ নারীরা বলেন, আগে এমন ছিল না। বীজ আসত ঘর থেকে, সার বলতে গোবর আর ছাই। কোন জমিতে কী হবে, সেই আলাপে নারীর কথার ওজন ছিল। কারণ বীজের হাঁড়ি তাঁর হাতে। তারপর এলো কেনা বীজ, রাসায়নিক সার, কীটনাশক। উপকরণ আসে দোকান থেকে। দোকানের খাতায় নাম ওঠে পুরুষের, ঋণের কাগজে সইও তাঁর। জ্ঞান রয়ে গেল নারীর কাছে, সিদ্ধান্ত চলে গেল অন্য হাতে।
আমেনা এক কথায় বললেন, ‘আমরা সংসার আগলাইতে এগুলা করি। দায় আছে, অধিকার নাই।’
চরে ঘরের বীজের দাম আরও বেশি। বন্যার পর অনেক পরিবারের হাতে বীজ কেনার টাকা থাকে না। পানি নামার পর বোনার সময়ও থাকে অল্প। তখন হাঁড়ির ওই বীজই ভরসা। এই মাটিতে অনেক বছর টিকে থাকা জাত দিয়েই ক্ষেত আবার সবুজ হয়। খাদ্যনিরাপত্তার আলোচনায় এই অবদানের কথা প্রায় ওঠেই না।
নদী জমি নেয়, পরিচয়ও নেয়
চরে জমি স্থির নয়। স্থানীয়দের হিসাবে গত দুই দশকে হরিরামপুরের অন্তত ১৩টি মৌজা পদ্মায় গেছে। গত এক বছরে নদী খেয়েছে প্রায় এক হাজার বিঘা ফসলি জমি আর শতাধিক বসতবাড়ি।
এবার তীর ধসতে শুরু করে চৈত্রের শেষেই। গ্রামের মানুষের অভিযোগ, ক্ষেতের কাছে ড্রেজারে বালু তোলায় ভাঙন বাড়ছে।
সিইজিআইএসের হিসাবে, ১৯৭৩ সাল থেকে যমুনা ও পদ্মার ভাঙনে হারিয়ে গেছে প্রায় এক লাখ ৫৮ হাজার হেক্টর জমি। দেশের চার থেকে পাঁচ শতাংশ মানুষ চরে থাকেন, তাদের প্রায় সবাই বাঁচেন কৃষির ওপর।
একদিকে ভাঙে, অন্যদিকে চর জাগে। জেগে ওঠা জমি নিয়ে শুরু হয় শিকস্তি-পয়স্তির পুরোনো বিবাদ, খাসজমি দখল, প্রভাবশালীর হাত। এই টানাটানিতে সবার শেষে আসে নারীর দাবি।
ভাঙনের পর পুরুষেরা কাজের খোঁজে শহরে যান। ইটভাটা, রিকশা, নির্মাণকাজ। নারীরা থেকে যান বাকি ভিটায়। নিজের রাখা বীজ দিয়ে আবার চাষ শুরু করেন। ক্ষেতের রোজকার সিদ্ধান্তও তখন তাদের। কিন্তু ব্যাংক, ইউনিয়ন পরিষদ বা কৃষি অফিসে গেলে প্রথম প্রশ্ন–জমি কার নামে? উত্তরে তাঁর নাম আসে না।
বারবার ভাঙলে একসময় পুরো পরিবারই শহরে ওঠে। বস্তির ঘরে কৃষির জ্ঞান কোনো কাজে লাগে না। চরের নারী হয়ে যান গৃহকর্মী কিংবা কারখানার শ্রমিক। নদী তখন শুধু জমি নেয় না, তাঁর কৃষক পরিচয়টুকুও মুছে দেয়।
কার্ড যাবে কার হাতে
এ বছর পহেলা বৈশাখে সরকার ‘কৃষক কার্ড’ কর্মসূচি চালু করেছে। প্রাক-পাইলট পর্যায়ে ১০ জেলার ২০ হাজার ৬৭১ জন ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষক কার্ড পাচ্ছেন। বছরে আড়াই হাজার টাকা নগদ, সঙ্গে ন্যায্যমূল্যে উপকরণ, সহজ শর্তে ঋণসহ নানা সুবিধা। মানিকগঞ্জ এই দশ জেলায় নেই, হরিরামপুরের চর তাই এখনও অপেক্ষায়। ডিসেম্বরের মধ্যে দেশের কৃষকদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরির নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
প্রশ্ন হলো, সেই তালিকায় আমেনা থাকবেন কিনা। আবেদনে জাতীয় পরিচয়পত্র আর মোবাইল নম্বরের সঙ্গে চাওয়া হচ্ছে জমির দলিল, খতিয়ান কিংবা চাষের প্রমাণ। আমেনার নামে এর কোনোটাই নেই। বছরের পর বছর যে জমিতে তিনি ঘাম ফেলছেন, তার কাগজ অন্যের নামে। তালিকা কাগজ ধরে হলে কার্ড যাবে খতিয়ানধারীর কাছে। মাঠের মানুষটি থেকে যাবেন বাইরে।
কৃষকের শ্রেণিও ঠিক হচ্ছে জমির মাপে। পাঁচ শতকের কম হলে ভূমিহীন, ৫ থেকে ৪৯ শতক প্রান্তিক, ৫০ থেকে ২৪৯ শতক ক্ষুদ্র। এই মাপকাঠি পরিবারের জমি মাপে। সেই জমিতে কে কোদাল চালান, কে বীজ বোনেন, তা মাপে না।
বর্গাতেও একই গল্প। মুখের চুক্তি হয় জমির মালিক আর বাড়ির পুরুষের মধ্যে। মাড়াই-শুকানোর ভার নারীর, বর্গাদারের নাম স্বামীর।
প্রশ্নটা বদলালেই হয়
চরে কাজ করা উন্নয়নকর্মীরা কয়েকটি পথের কথা বলছেন। কৃষক তালিকায় মালিকানা নয়, প্রকৃত চাষকে মানদণ্ড ধরা আর একই পরিবারের নারী ও পুরুষকে আলাদা কৃষক হিসেবে গোনা। খাসজমি বন্দোবস্ত নীতিমালায় স্বামী-স্ত্রীর যৌথ নামে বন্দোবস্তের যে বিধান আছে, চরে তা কড়াভাবে মানা। ভাঙনের ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের তালিকায় নারীপ্রধান পরিবারকে আলাদা করে চিহ্নিত করা। চরের জন্য আলাদা তথ্য সংগ্রহ, যাতে জাতীয় গড়ের আড়ালে চর হারিয়ে না যায়।
এর কোনোটার জন্যই বড় বাজেট লাগে না। তালিকা করার সময় মাঠকর্মী আর জনপ্রতিনিধিরা যদি শুধু জিজ্ঞেস করেন, ক্ষেতের পরিকল্পনা কে করেন, বীজ কে রাখেন–তাহলেই আসল কৃষক সামনে আসবেন। দরকার ‘কৃষক’ শব্দটাকে মাঠের সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়া।
হরিরামপুরের সেই কুঠুরিতে বয়ামের গায়ে নাম লেখা থাকে, যাতে পরের মৌসুমে বীজ চিনতে ভুল না হয়। যে হাত নামগুলো লিখেছে, তাঁর নিজের নাম দলিলে নেই, তালিকায় নেই, ক্ষতিপূরণের খাতাতেও নেই। চরের কৃষি দাঁড়িয়ে আছে এই নারীদের ঘাম আর জ্ঞানের ওপর। রাষ্ট্রের খাতায় সেই নাম তোলার দায় এখন নীতিনির্ধারকদের।