তেরো বছরের চীনা জলপরী জিদি
এশিয়ান গেমসে নিজের প্রথম স্বর্ণপদক চীনের ইউ জিদির। ছবি- এএফপি
স্পোর্টস ডেস্ক
প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৪:০৯
চীন বরাবরই স্পোর্টসের ফ্যাক্টরি। কিন্তু ১৩ বছর বয়সে বাটারফ্লাইয়ের মতো সাঁতারের কঠিন ইভেন্টে এমন নিখুঁত টেকনিক আর অবিশ্বাস্য মানসিক জোর সচরাচর দেখা যায় না। চীনের বিস্ময় বালিকা ইউ জিদি সেই টেকনিক আর মনের জোরেই স্বর্ণ জিতে নিল এশিয়ান গেমসে। শুধু পদকই নয়; মাত্র ২ মিনিট ০৫.০৮ সেকেন্ড সময় নিয়ে এশিয়ান গেমসে নতুন রেকর্ড গড়ে চীনের এই জলপরী, যা তিন বছর আগে হাংঝৌয়ে তাঁর স্বদেশি ঝাং ইউফেইয়ের গড়া রেকর্ডের চেয়ে প্রায় আধা সেকেন্ড দ্রুত। গেমসে ইউ জিদির তিনটি একক ইভেন্টে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে, যার প্রথমটিতেই এলো এই সাফল্য।
জিদির এই সোনা জয় কোনো ফ্লুক নয়; এটি আসলে বিশ্বসাঁতারে এক নতুন সাম্রাজ্যের সূচনা। ২০২৮ অলিম্পিকের মঞ্চ এখনও কিছুটা দূরে। কিন্তু গতকাল টোকিওর অ্যাকুয়াস্টিক সেন্টারে পুলে যে স্ফুলিঙ্গ দেখা গেল, তা যদি ধরে রাখা যায়, তবে ডন ফ্রেজার বা ক্রিস্টিনা এগারসেগির উত্তরসূরি খুঁজে পেতে বিশ্বসাঁতারের আর বেশি দেরি লাগবে না। একেই বোধ হয় বলে তারুণ্যের রূপকথা! সাঁতারের দুনিয়ায় জিদির রূপকথা শুরু স্রেফ একটা সাধারণ ওয়াটার পার্কের চিলড্রেন পুল থেকে। ২০১৮ সালের এক গনগনে গ্রীষ্মের দুপুরে ছয় বছরের মেয়েকে নিয়ে তাঁর মধ্যবিত্ত বাবা গিয়েছিলেন গরমের হাত থেকে একটু রেহাই পেতে। কে জানত, সেই জলকেলি দেখতে দেখতেই দূর থেকে এক জহুরির চোখ চিনে নেবে আগামী দিনের বিশ্বজয়ী হীরাটিকে!
স্থানীয় সাঁতার কোচ লি চাও সেদিন অবাক হয়ে দেখেছিলেন, পুলে আর পাঁচটা বাচ্চার মতো জল ছিটিয়ে দুষ্টুমি নয়; মেয়েটি জলের বুক চিরে যেন ডলফিনের মতো খেলছে। কোচ এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘আরও জোরে সাঁতার কাটতে চাও?’ ব্যস, ওই একটা লাইনেই বদলে গেল হেবেই প্রদেশের বাওদিং শহরের এক সাধারণ মিডল স্কুলপড়ুয়ার জীবন। মাত্র ৯ বছর বয়সে, যখন আমাদের ঘরের ছেলেমেয়েরা মায়ের আঁচল ধরে বায়না করে, তখন এই ছোট্ট মেয়েটা ব্যাগ গুছিয়ে মা-বাবাকে ছেড়ে চলে গেল অন্য শহরের এক হাড়ভাঙা আবাসিক ক্যাম্পে। দিনে সাত-আট ঘণ্টার অমানুষিক খাটুনি, স্কুলের পড়ালেখার চাপ আর একাকিত্বে গত বছর তো সাঁতারটাই ছেড়ে দিতে চেয়েছিল কিশোরী জিদি। কিন্তু লড়াকু রক্ত কি এত সহজে হার মানে? মা-বাবা আর কোচের ভালোবাসায় আবার পুলে ফেরা, আর আজ মাথায় সেই প্রিয় কুকুরের কার্টুন আঁকা চেনা সুইমিং ক্যাপটা পরেই ওলটপালট করে দেওয়া এশিয়ান গেমসের রেকর্ডবুক।
সাঁতার শেষে যখন সে পুল থেকে উঠল, মুখে সেই চেনা চিলতে হাসি। অথচ এই মেয়েটাই কয়েক মিনিট আগে পুলে রাজত্ব করে এলো! সংবাদ সম্মেলনে যখন তাকে জিজ্ঞেস করা হয় এই সাফল্যের রহস্য কী? শান্ত গলায় জিদির সরলতা, ‘টাইমিং তেমন অসাধারণ কিছু হয়নি। আমি আশা করি, আরও দ্রুত সাঁতরাতে পারব। এখানে আমি সময় ০.৯ সেকেন্ড কমিয়েছি। বিশ্বাস করি, সামনে আরও ভালো পারফর্ম করব। আমার কৌশলে এখনও কিছু ঘাটতি আছে। মাথা দ্রুত নিচে নামানো, হাত আরও সামনে নেওয়া এবং পায়ের ব্যবহার বাড়ানো দরকার।’ গত বছর ১২ বছর বয়সে ৪x২০০ মিটার ফ্রিস্টাইল রিলেতে ব্রোঞ্জ জিতে সাঁতার বিশ্বচ্যাম্পিয়নশিপের ইতিহাসে কনিষ্ঠতম পদকজয়ী হয়েছিলেন জিদি। বিশ্বসাঁতারে তার আগমনীটা তিনি দিয়ে রাখল টোকিওতে; জানিয়ে রাখল লক্ষ্য তার লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিকের দিকে।
- বিষয় :
- এশিয়ান গেমস
- চীন