ঢাকা মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

হালান্ড ধরেছেন নরওয়ের হাল

হালান্ড ধরেছেন নরওয়ের হাল
×

নরওয়ের স্ট্রাইকার আর্লিং হালান্ড। ছবি- এএফপি

আহমেদ শারজিন শরীফ

প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২৬ | ১৫:২১ | আপডেট: ১১ জুলাই ২০২৬ | ১৫:২৫

মেটলাইফ স্টেডিয়ামের ভ্যাপসা গরমে জালের নিশানা খুঁজে পেতে বারবার ব্যর্থ ব্রাজিল। সমতায় ফিরতে মরিয়া ভিনিশিয়াসদের টিমটিমে আলো মিলিয়ে গেল এক ঝটকায়। গোলকিপার অ্যালিসন বিমূঢ় চেয়ে দেখলেন বলের জালে জড়ানো। দীর্ঘদেহী স্কোরার ততক্ষণে ছুটে গেছেন কর্নার ফ্ল্যাগের কাছে। ক্ষিপ্র অথচ শান্ত শিকারির মতো এই গোলটার অপেক্ষাতেই ছিলেন তিনি। গ্যালারি 'হালান্ড....হালান্ড' চিৎকারে আত্মহারা।

২৮ বছর পর ফুটবলের শীর্ষ আসরে খেলতে এসেছে নরওয়ে। এতগুলো বছর ধরে বাছাইপর্বের ব্যর্থতা হয়ে উঠেছিল চিরচেনা। এরপর দলটি পেল হালান্ডকে। যার খেলা নরওয়েজিয়ানদের নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে। এ পর্যন্ত জাতীয় দলের হয়ে মাত্র ৫৪ ম্যাচে ৬২ গোল করে হালান্ড হয়ে উঠেছেন নরওয়ের সর্বকালের সেরা গোলদাতা। সেরা গোলদাতা তো হয়েছেনই। ২৫ বছর বয়সী হালান্ড দূর করেছেন একটি প্রজন্মের বিশ্বকাপে খেলতে না পারার হতাশাও।

ছ’ফুট চার ইঞ্চি উচ্চতার দীর্ঘদেহী এই নরওয়েজিয়ানের বিপরীতে বল দখলের লড়াই গলদঘর্ম শ্রম। আবার শান্ত হালান্ড এক মহা দুশ্চিন্তার কারণ, কখন দৌড়ে এসে বুলেট গতিতে গোলমুখে বল ঠেলে দেন বোঝা মুশকিল! ক্ষণে ক্ষণে গতিবিধি বদলে ফেলা স্ট্রাইকারের ওপর প্রতিপক্ষের বিশেষ নজর থাকে। কিন্তু মানুষটা হালান্ড হলে বিপত্তিটা একটু বেশিই! এক মুহূর্তে রক্ষণভাগের আশেপাশে ঘুরে বেড়ান, তো পরক্ষণেই সতীর্থের থ্রু পাস বা ক্রসে পা ছোঁয়াতে হুট করে ঝড়োগতিতে ঢুকে পড়েন ডিবক্সে। কখনো আবার গোলরক্ষককে ফাঁকি দেয় তার দুর্দান্ত হেডশট। 

বল পায়ে নিয়ে খুব একটা ছুটতে দেখা যায় না হালান্ডকে। তিনি যত দ্রুত সম্ভব নিখুঁত ফিনিশিংয়ের দর্শনে বিশ্বাসী এক স্ট্রাইকার। হয়ত অনিন্দ্যসুন্দর ড্রিবলিং করেন না, কিন্তু ফিনিশিংয়ের সময় তিনি শিকারীর মতো নির্মম। রোনালদো নাজারিওর ডিবক্সে গতির ঝলক, ভ্যান নিস্টলরয়ের মোক্ষম জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকা, জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচের মতো সদর্প বিচরণ আর তরুণ ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর মতো প্রতিদিন নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার ক্ষুধা- এতগুলো গুণের মিশেলে এই নরওয়েজিয়ান হয়ে উঠেছেন এক বিরল ফুটবলার।

ছবি- এএফপি

নরওয়ে জাতীয় দলের অধিনায়ক মার্টিন ওডেগার্ড মাঝমাঠ থেকে খেলা সাজান। আর হালান্ডের কাজটা সতীর্থরা যাতে নিজের  সবটুকু মাঠে নিংড়ে দেন তা নিশ্চিত করা। এজন্য তাকে বাড়তি কিছু করতে হয় না। তার খেলার ধরনটাই এমন। আক্রমণভাগের সামনে থেকে ক্রমাগত প্রেসিং করতে থাকেন। ফলে একরকম বাধ্য হয়ে বাকিরা তার সঙ্গে তাল মেলাতে দ্রুতগতিতে বল চালাতে শুরু করেন।

এ কারণেই সতীর্থরা বিশ্বাস করেন, হালান্ড ঠিক (ইনজুরিমুক্ত ও মনোযোগী) থাকলে যেকোনো প্রতিপক্ষকে হারাতে সক্ষম তারা। মুখের কথায় নয়, তিনি দলকে নেতৃত্ব দেন কাজ দিয়ে। দলে সবার আগে অনুশীলনে আসা ও সবার শেষে যাওয়া খেলোয়াড়টির নাম আর্লিং ব্রাট হালান্ড। এমন একজন পরিশ্রমী সতীর্থের ছোঁয়া পুরো দলে ইতিবাচক পরিবর্তন আনে।

আর্লিংয়ের জন্ম ২০০০ সালের জুলাইয়ে। বাবা আলফ-ইঙ্গে হালান্ডও ছিলেন একজন পেশাদার ফুটবলার, মা গ্রাই মারিটা ছিলেন অ্যাথলেট। ছেলেকে তারা বড় করে তোলেন নরওয়ের ছোট্ট শহর ব্রাইনে। এমন মা-বাবার ছেলের খেলার মাঠে না আসাটা বেমানান। তাই হাঁটতে শিখেই আর্লিং যে বলে লাথি দিয়েছেন, এমন দাবি অত্যুক্তি নয়।

ছবি- এএফপি

নরওয়ের এই যাদুকরী স্ট্রাইকারের প্রতিভা বিকাশের শুরু তারই দেশের সাবেক কিংবদন্তি ওলে গুনার সুলশারের হাত ধরে। স্বদেশি ক্লাব মলদেতে থাকাকালীন সুলশারই প্রথম হালান্ডের ফিনিশিং নিয়ে কাজ করেন। এরপর তাকে কিনে নেয় রেডবুল সালজবার্গ। অস্ট্রিয়ান ক্লাবটির হয়ে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে হ্যাটট্রিক করে নজর কাড়েন জার্মান ক্লাব বরুশিয়া ডর্টমুন্ডের। ঐতিহাসিকভাবে ডর্টমুন্ড প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের পূণ্যভূমি, এখানেই প্রতিভার পূর্ণ বিকাশ ঘটানোর সুযোগ পান তারা। ক্লাবটির হয়ে ৮৯ ম্যাচ খেলে ৮৬ গোল করে নিজের জাত চেনান হালান্ড। নজরে আসেন কিংবদন্তি কোচ পেপ গার্দিওলার। যেন এতদিন ধরে এমনই একজন স্ট্রাইকারের অপেক্ষায় ছিলেন ম্যানসিটি বস। মাঝমাঠের সঙ্গে বোঝাপড়া, বল ধরে রেখে দলকে চাপমুক্ত করা আর বিধ্বংসী আক্রমণে দক্ষতাসম্পন্ন স্ট্রাইকারটির গায়ে ৯ নম্বর জার্সি দিতে এক মুহূর্তও দেরি করেননি পেপ।

মাঠে ভাইকিং লুটেরাদের মতো ভয়ঙ্কর এই তরুণ স্ট্রাইকার ব্যক্তিজীবনে বেশ হাসিখুশি, আমুদে আর নিয়মতান্ত্রিক জীবনযাপনে অভ্যস্ত। শান্ত স্বভাব ধরে রাখতে মেডিটেশন আর শরীর ঠিক রাখতে জিম তার দৈনন্দিন জীবনের অংশ। খুব বেশি কোলাহলে দেখা না গেলেও মাঝে মাঝে ভক্তদের মাঝে হাজির হন ছদ্মবেশে। আবার কখনো সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টে পোস্ট করেন মজার সব মিম। তাকে নিয়ে লোকের বানানো মজার ভিডিও, মিম শেয়ার করেন নিজের অ্যাকাউন্ট থেকেই।

মূলত এই নির্ভার ব্যক্তিজীবনই হালান্ডকে মাঠে করে তোলে অদম্য। ম্যাচের আগে চাপমুক্ত থাকতে জানেন তিনি। তাই প্রস্তুতিটা নেন একদম মন দিয়ে। খেলেন সামর্থ্যের সবটুকু উজাড় করে।

ছবি- এএফপি

নরওয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপের বাছাইপর্ব পেরিয়েছে সদর্পে। আট ম্যাচে প্রতিপক্ষের জালে ৩৭ বার বল জড়িয়েছে তারা। এর মধ্যে সরাসরি ১৬ গোলে অবদান রেখেছেন একা হালান্ড। একসময় যে দলটি ইউরোপীয় বাছাইপর্ব পেরোতে গিয়ে প্রতিবার হতাশায় ডুবত তারাই এখন মূলমঞ্চে বহুদূর যেতে প্রত্যয়ী। নরওয়ের শিশুরা এখন হালান্ড হওয়ার স্বপ্নে বেড়ে ওঠে। অসামান্য পরিশ্রমে প্রতিভার পূর্ণ বিকাশ ঘটিয়ে হালান্ড প্রমাণ করেছেন ইতিহাসের পুনর্লিখন সম্ভব।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পাতায় চোখ রেখে বেড়ে ওঠা প্রজন্মের একজন প্রতিনিধি হালান্ড। তার অনলাইন উপস্থিতি, প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়দের সঙ্গে যোগাযোগ আর বিজ্ঞাপনে মডেলিং- সবকিছুতেই 'জেনারেশন জুমার্স'-এর ছাপ স্পষ্ট। সমসাময়িক খেলোয়াড় এম্বাপ্পের পরিচিতি বল নিয়ে বিদ্যুৎগতির দৌড়ের জন্য, বেলিংহামকে লোকে চেনে মাঝমাঠের কাণ্ডারি হিসেবে, এদিকে আসি আসি করছেন ইয়ামাল। মেসি-রোনালদো পরবর্তী যুগে এই খেলোয়াড়দের সঙ্গে নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা আছে হালান্ডের।

২৮ বছর পরে বিশ্বকাপে আসা নরওয়ে পৌঁছে গেছে কোয়ার্টার ফাইনালে। এই যাত্রায় হালান্ড ধরেছেন দলের হাল। স্টেডিয়ামে তার উপস্থিতির আনন্দ নরওয়েজিয়ানদের জন্য সব পরিসংখ্যানের ঊর্ধ্বে। তার খেলা পুরো জাতিকে হতাশার সাগর থেকে তুলে বসিয়েছে আশার ভেলায়। নরওয়ের মানুষ এখন বিশ্বাস করেন, আজ না হোক কাল তাদের খেলোয়াড়রা ট্রফি আনতে, রেকর্ড গড়তে সক্ষম।

১২ জুলাই ইংল্যান্ডের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনাল খেলবেন হালান্ড-নুসা-ওডেগার্ডরা। টুর্নামেন্টে এখন পর্যন্ত ৪ ম্যাচ খেলে ৭টি গোল করেছেন নরওয়ের নাম্বার নাইন। তাই তার প্রতি দেশটির দর্শকদের বাড়তি প্রত্যাশা রাখাই স্বাভাবিক।

আরও পড়ুন

×