ঢাকা বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

তায়কোয়ান্দো বদলে দিয়েছে দু্ই শরণার্থীর জীবন

তায়কোয়ান্দো বদলে দিয়েছে দু্ই শরণার্থীর জীবন
×

মোহামেদ মাহমুদ জসিম ও হুনাইদি তালা হাসান

ক্রীড়া প্রতিবেদক, (নাগোয়া) জাপান থেকে

প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৬:১৬

দুজনের গল্পটা একই। যুদ্ধের দাবানল আর অবর্ণনীয় দুরবস্থায় সিরিয়া ছাড়তে বাধ্য হন তারা। যখনই মনে করেছিলেন দেশে থাকা অনিরাপদ, তখনই বাঁচার নতুন পথ খুঁজতে পাড়ি জমান জর্ডানে। ভিটেমাটি আর প্রিয় দেশ ছাড়ার ট্রমায় অনেক দিন ভুগছিলেন। দেশের মায়া ত্যাগ করে পরিবারকে ছেড়ে জর্ডানে যাওয়ার পরও স্বপ্ন থেকে বিচ্যুতি হননি মোহামেদ মাহমুদ জসিম ও হুনাইদি তালা হাসান। প্রিয় খেলা তায়কোয়ান্দোতে মনোযোগ দেন তারা। নানা ধাপ পেরিয়ে জসিম ও হুনাইদি এখন নিজেদের স্বপ্নের সিঁড়িতে। এশিয়ান গেমসের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো শরণার্থীর পতাকাতলে এ দুই অ্যাথলেট। তায়কোয়ান্দো বদলে দিয়েছে তাদের জীবন। জর্ডানের আজরাক শরণার্থী ক্যাম্পে থাকা জসিম ও হুনাইদি আইচি নাগোয়া এশিয়ান গেমসে গড়তে চান ইতিহাস।

এবারের এশিয়ান গেমসের উদ্বোধন অনুষ্ঠানটি জসিম ও হুনাইদির জন্য বিশেষ কিছু। মার্চপাস্টে ইয়েমেনের পর এবং জাপানের আগে শরণার্থীর পতাকা হাতে নিয়ে মাঠে প্রবেশ করেন তারা। সে সময় চোখ দিয়ে পানি ঝরতে থাকে তাদের। ঐতিহাসিক সেই মুহূর্তটি আজীবন স্মৃতির পাতায় থাকবে বলে সোমবার জানান হুনাইদি, ‘অবশ্যই এটি আমাদের জন্য একটি নতুন অভিজ্ঞতা। মাহমুদ ও আমার জন্য শরণার্থীদের প্রতিনিধিত্ব করতে পারাটা অত্যন্ত গর্বের বিষয়। আলহামদুলিল্লাহ, আমরা জীবনের এক নতুন দিশা পেয়েছি এবং আমাদের মনে একটি আশা জেগেছে যে, অসম্ভব বলে কিছু নেই। পথটি কিছুটা কঠিন হতে পারে, তবে মানুষ চাইলে সব বাধা পেরিয়ে এগিয়ে যেতে পারে।’ সুযোগ দেওয়ায় আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটিকে ধন্যবাদ জানান মাহমুদ।

হুনাইদি তায়কোয়ান্দো শুরু করেন ৯ বছর বয়স থেকে। পরে দেশ বদলালেও বদলায়নি তাঁর স্বপ্নের পথচলা। জর্ডানে গিয়ে কঠোর অনুশীলন চালিয়ে যান বর্তমানে ১৮ বছর বয়সী হুনাইদি। মেয়েদের মাইনাস ৪৯ কেজিতে খেলা হুনাইদির স্বপ্নটা আরও বড়। পদকের সেই স্বপ্ন পূরণ হোক না হোক, এশিয়ান গেমসে শরণার্থী হিসেবে অংশ নেওয়াটাই তাঁর কাছে অনেক বড়। এই তায়কোয়ান্দো খেলাটা তাঁর জীবন বদলে দিয়েছে, ‘আমি এই খেলাটিকে খুব ভালোবাসি। কারণ, এটি আমার জীবনকে ইতিবাচকভাবে অনেক বদলে দিয়েছে। এ প্রতিযোগিতা আমার কাছে অনেক কিছু, বিশেষ করে আমরা যে কঠিন সময়গুলোর মধ্য দিয়ে গিয়েছি, সেগুলোর কারণে। অনেক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছি, কিন্তু এগিয়ে গিয়েছি এবং আমাদের স্বপ্নের আশা ছাড়িনি। আমাদের জন্য এটি কেবল একটি প্রতিযোগিতা নয়; এটি একটি স্বপ্ন, যার জন্য সারাজীবন কঠোর পরিশ্রম করেছি। আজ আমরা এখানে সেই স্বপ্নটা সত্যি হতে দেখছি। তায়কোয়ান্দো খেলা শুরু করার পর থেকে এ মুহূর্তে পৌঁছানোর একটি স্বপ্ন আমাদের ছিল। আলহামদুলিল্লাহ, আজ আমরা এখানে পৌঁছাতে পেরেছি। যারা পাশে দাঁড়িয়েছেন, তাদের প্রত্যেককে আমি ধন্যবাদ জানাতে চাই।’

১৪ বছর বয়স থেকে তায়কোয়ান্দো খেলে আসছেন মাহমুদ। ছেলেদের ৮০ কেজি ওজন শ্রেণিতে খেলা মাহমুদ এশিয়াডে নিজের জীবনের গল্প নিয়ে এসেছেন, ‘আজকে এখানে আমার উপস্থিতি কোনো সাধারণ টুর্নামেন্টে অংশ নেওয়া নয়। আজ আমি আমার সঙ্গে একটি গল্প নিয়ে এসেছি। ইনশাআল্লাহ, এটি একটি সফলতার গল্প হবে। প্রতিটি প্রতিযোগিতায় আমি অনেক মানুষের গল্প সঙ্গে নিয়ে নামি– এমন অনেক মানুষ, যারা আমাকে সমর্থন করেছেন এবং চান যেন আমি অনেক ভালো অবস্থানে পৌঁছাতে পারি।’ 

সিরিয়া থেকে জর্ডানে যাওয়ার পর জীবনে কঠিন অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছিলেন মাহমুদ, ‘পরিস্থিতির চাপে বাধ্য হয়ে দেশ ছেড়েছি। আমি যখন জর্ডানে যাই, তখন ভীষণ অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছিলাম। সেখানে করার মতো কিছুই ছিল না। ভবিষ্যৎ ছিল একদম অস্পষ্ট এবং বড়সড় ধোঁয়াশায় ঘেরা। ভবিষ্যতে কী করব, তার কিছুই খুঁজে পাচ্ছিলাম না। এরপর তায়কোয়ান্দোকে বেছে নিলাম, যা আমার জীবনকে বদলে দিয়েছে। আমরা কঠোর অনুশীলন করেছি এবং অনেক কষ্ট করেছি। কোচ ও পরিবারের পক্ষ থেকে আমরা অনেক সমর্থন পেয়েছি।’

আরও পড়ুন

×