আলো নেই চোখে তবু স্বপ্ন দেখে
টেকলাইফ প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১২:৩২
আপনি তো দেখতে পান না, কাজ করবেন কীভাবে? চাকরির জন্য আবেদন করতে গিয়ে এমন প্রশ্ন অনেক শুনেছেন নাজমা আক্তার। কখনও সাক্ষাৎকারে ডাকা হয়েছে, কখনও নিজের যোগ্যতা প্রমাণের সুযোগ মেলেনি। অথচ বিকল্প সুযোগ বদলে দিয়েছে তাঁর গল্প। কল সেন্টারে কাজ করছেন তিনি। সহায়ক প্রযুক্তিতে নিজের দক্ষতায় প্রমাণ করছেন, সক্ষমতা চোখের দৃষ্টিতে পরিমাপযোগ্য নয়।
জন্ম থেকেই দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী নাজমা। তবে কোনো বাধাই তাঁর লেখাপড়ার পথে বাধা হতে পারেনি। ভর্তি হন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখান থেকে অনার্স ও মাস্টার্স শেষ করেন। পড়াশোনা শেষে শুরু হয় নতুন লড়াই– চাকরি পাওয়ার লড়াই। ঘুরেছেন অনেক চাকরির মেলায়; করেছেন অনেক আবেদন। কোথাও পরীক্ষা দিয়েছেন, কোথাও সাক্ষাৎকার। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই তাঁর দৃষ্টিহীনতা
হয়েছে প্রধান অন্তরায়। নাজমার আক্ষেপ ছিল, তাঁকে কাজটি করে দেখানোর সুযোগ দেওয়া হতো না। অবশেষে প্লেক্সাস ক্লাউডের ইন্টারনেট ব্র্যান্ড স্বাধীন ইন্টারনেটে কল সেন্টার কর্মী হিসেবে তাঁর চাকরি হয়।
কল সেন্টারের কাজ মূলত যোগাযোগ ও সেবাকেন্দ্রিক। কল করা গ্রাহকের কথা শোনা, সমস্যা বোঝা ও যথাযথ সহায়তা দেওয়া– এসব কাজে চোখের দৃষ্টির প্রয়োজন হয় না; সহায়ক প্রযুক্তি যথেষ্ট। দৃষ্টিহীন মানুষের জন্য প্রযুক্তি এখন শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের বিকল্প সহায়ক। কণ্ঠনির্ভর নির্দেশনা, পর্দার তথ্য পড়ে শোনানো ও কিছু সহায়ক প্রযুক্তি ডিজিটাল কর্মপরিবেশে এমন মানুষের কাজের সুযোগ তৈরি করেছে। নাজমা তারই অংশ। তাঁর এই পথচলায় সহযোদ্ধা স্বামী রাকিব। তারা বিশ্ববিদ্যালয়ে সহপাঠী ছিলেন।
রাকিবও দৃষ্টিহীন। দুজনই এখন নিজেদের স্বপ্ন পূরণে সচেষ্ট। রাকিব আইনি পেশায় যেতে প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
নাজমার কাছে এই চাকরি শুধু একটি কর্মসংস্থান নয়; এটি আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়ার গল্প। নিজের পায়ে দাঁড়ানোর গল্প। আর একই সঙ্গে সমাজের প্রচলিত ধারণাকে বদলে দেওয়ার গল্প।
পৃথিবীকে চোখ দিয়ে দেখেন না নাজমা। নিজের কাজে প্রমাণ করেছেন, সক্ষমতা কারও চোখের আলোর ওপর নির্ভর করে না। প্রয়োজন শুধু সুযোগ, বিশ্বাস ও তা কাজে লাগানোর সাহস। প্লেক্সাস ক্লাউডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোবারক হোসেন এ প্রসঙ্গে বলেন, তাঁর কাজে আমরা সন্তুষ্ট। গত তিন বছরে তাদের নামে অভিযোগ আসেনি। তারা সবাই শিক্ষিত। তাদের সবাইকে প্রশিক্ষণ দিয়ে যোগ্য ও দক্ষ করে গড়ে তুলেছি। যেন তারা নিজেরা স্বাবলম্বী হতে পারেন। পরিবারের বোঝা যেন না হন, সে কারণে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছি। অনেক প্রতিষ্ঠান যদি দেশের প্রতিবন্ধীদের পাশে দাঁড়ায়, যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ দেয়, তাহলে তারা সবার মতো জীবিকা নির্বাহ করতে পারবে।
জানা গেছে, এই প্রতিষ্ঠানে কাস্টমার কেয়ার বিভাগে ১২ জন প্রতিবন্ধী কাজ করেন, যাদের মধ্যে চারজন অন্ধ বা দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী।
অন্যরা কেউ শারীরিক প্রতিবন্ধী, কেউ পক্ষাঘাতগ্রস্ত। এরা সবাই বাসা থেকে কাজ করেন। যিনি সমস্যার কথা জানিয়ে কল সেন্টারে ফোন করেন, তিনি আসলে সমাধান চান। কল সেন্টার কর্মী কোথায় বসে পরিষেবা দিচ্ছেন, এটি কেউ জানতে চায় না।
- বিষয় :
- চাকরি