ঢাকা বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

তিন বিচারপতির বিরুদ্ধে তদন্ত শেষ হয়নি এখনও

দায়িত্ব থেকে অব্যাহতির ২৬ মাস

তিন বিচারপতির বিরুদ্ধে তদন্ত শেষ হয়নি এখনও

প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০২১ | ২০:৩১ | আপডেট: ৩১ অক্টোবর ২০২৩ | ১৬:০০

বিচারিক দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পাওয়া হাইকোর্টের তিন বিচারপতির বিরুদ্ধে তদন্ত শেষ হয়নি ২৬ মাসেও। দুর্নীতি ও গুরুতর পেশাগত অসদাচরণের অভিযোগ ওঠায় ২০১৯ সালের ২২ আগস্ট তাদের বিচারকাজ থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়। রাষ্ট্রপতির সঙ্গে পরামর্শক্রমে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন এই সিদ্ধান্ত দেন। পরে ওই তিন বিচারপতির বিরুদ্ধে তদন্তকাজ শুরু হলেও তা এখন 'ফাইলবন্দি' হয়ে আছে। তদন্তের সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কেও সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের কাছে কোনো তথ্য নেই। ওই তিন বিচারপতি বিচারকাজে না থেকেও বেতন-ভাতা, আবাসন, যানবাহনসহ আনুষঙ্গিক সকল সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছেন।
বিচারকাজ থেকে প্রত্যাহার হওয়া হাইকোর্টের ওই তিন বিচারপতি হলেন- বিচারপতি সালমা মাসুদ চৌধুরী, বিচারপতি কাজী রেজা-উল হক ও বিচারপতি একেএম জহিরুল হক। সুপ্রিম কোর্ট সূত্রে জানা গেছে, এই তিন বিচারপতি ২০১৯ সালের আগস্টে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পাওয়ার পর কিছুদিন ছুটিতে ছিলেন। পরে আর তারা ছুটি নেননি। আবার বিচারিক দায়িত্বেও নেই। মাঝেমধ্যে তারা সুপ্রিম কোর্টে তাদের জন্য নির্ধারিত অফিস কক্ষে আসেন এবং কয়েক ঘণ্টা অবস্থান করে চলে যান। চাকরি বিধি অনুযায়ী, বিচারপতি সালমা মাসুদ চৌধুরী ২০২৪ সালের ১৩ ডিসেম্বর, বিচারপতি কাজী রেজা-উল হক ২০২৫ সালের ২৮ নভেম্বর এবং বিচারপতি একেএম জহিরুল হক ২০২৬ সালের ৩১ জানুয়ারি অবসরে যাওয়ার কথা।
বিচারপতিদের বেতনভাতা-সংক্রান্ত সুপ্রিম কোর্ট জাজেস রিমুনারেশন অ্যান্ড প্রিভিলেজ অনুসারে, হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতিরা বেতন বাবদ ৯৫ হাজার টাকা পেয়ে থাকেন। এছাড়া ব্যয় নিয়ামক ভাতা ৫ হাজার টাকা, ডমেস্টিক এইড ভাতা ৪ হাজার টাকা, রেসিডেন্স অ্যালাউন্স ৫০ হাজার ৬০০ টাকা, কার অ্যালাউন্স ২৫ হাজার টাকা, অফিসিয়াল গাড়ি সরবরাহের পূর্ব পর্যন্ত ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার না করলে সেক্ষেত্রে ২ হাজার টাকা পেয়ে থাকেন।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের মুখপাত্র ও হাইকোর্টের স্পেশাল অফিসার (অতিরিক্ত জেলা জজ) মো. সাইফুর রহমান সমকালকে বলেন, 'তিন বিচারপতির বিষয়ে কোনো তথ্য সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের কাছে নেই। এটি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বিষয়।'
পরে এ বিষয়ে জানতে চাইলে অ্যাটর্নি জেনারেল এএম আমিন উদ্দিন সমকালকে বলেন, 'এ বিষয়ে কিছু বলতে পারব না। কোনো তথ্য নেই। এটি সুপ্রিম কোর্টের ব্যাপার।'
অবশেষে বিষয়টি আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের নজরে নেওয়া হলে তিনি সমকালকে বলেন, 'এ ব্যাপারে কিছু জানি না। এটি বিচার বিভাগের বিষয়। রাষ্ট্রপতি ও প্রধান বিচারপতি দেখছেন।'
সূত্র জানায়, বিধিবহির্ভূতভাবে অধস্তন আদালতের মামলায় হস্তক্ষেপ করে ডিক্রি পাল্টে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে বিচারপতি সালমা মাসুদ চৌধুরী ও বিচারপতি একেএম জহিরুল হকের বিরুদ্ধে। তারা হাইকোর্টে একটি দ্বৈত বেঞ্চে দায়িত্ব পরিচালনা করতেন। বিচারপতি কাজী রেজা-উল হকের বিরুদ্ধে দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলায় অনিয়মের অভিযোগ আনা হয়েছে। এই অভিযোগগুলো তদন্তের জন্য প্রধান বিচারপতি আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি মোহাম্মদ ইমান আলীর নেতৃত্বে এক সদস্যের কমিটি গঠন করেন। কমিটি এখনও তাদের বিষয়ে প্রতিবেদন দাখিল করেনি।
পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক বিচারপতি সমকালকে বলেন, ফুলকোর্ট সভাসহ বিচার বিভাগের কোনো সভা বা অনুষ্ঠানে ওই তিন বিচারপতি অংশগ্রহণ করছেন না। তবে মাঝেমধ্যে সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে এলে তাদের সঙ্গে দেখা হয়। অনেকেই পরিস্থিতির কারণে বিব্রত। তাদের বিষয়টি ঝুলে থাকায় তারা এখনও বিচারপতি পদে রয়েছেন। তাই তাদের এড়িয়ে যাওয়ারও সুযোগ নেই। আগামী ৩০ ডিসেম্বর প্রধান বিচারপতি অবসরে যাবেন। এরপর হয়তো এই তিন বিচারপতির বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
সুপ্রিম কোর্টের শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজনের সঙ্গে আলাপে জানা যায়, উচ্চ আদালতের বিচারপতি অপসারণ-সংক্রান্ত সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী আপিল বিভাগের রায়ে বাতিল হওয়ায় কোন প্রক্রিয়ায় বিচারপতি অপসারণ করা হবে তা নিয়ে শীর্ষ পর্যায়ে মতভেদ রয়েছে। একইসঙ্গে তদন্ত প্রক্রিয়া নির্ধারণ নিয়েও। এ জন্য তাদের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত এখনও হয়নি। তবে আইনজ্ঞরা বলছেন, সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিল হওয়ার পর সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলই বর্তমানে বিচারপতি অপসারণে সংবিধানসম্মত পদ্ধতি। কারণ, আগে ওই পদ্ধতিতেই বিচারপতি অপসারণ হতো।
জানতে চাইলে বিশিষ্ট আইনজীবী ড. শাহ্‌দীন মালিক সমকালকে বলেন, 'সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী মামলা আপিল বিভাগের রায়ে বাতিল হওয়ার পর বিচারপতি অপসারণের জন্য এখন সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল পুনর্বহাল হয়েছে। অভিযুক্ত তিন বিচারপতির বিরুদ্ধে কোনো ধরনের আইনি ব্যবস্থা নিতে হলে সেটা সংবিধানসম্মত উপায়ে নিতে হবে। যদি সেটা নিতে হয় তাহলে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তের জন্য সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠন করতে হবে।'
সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের কার্যক্রম প্রসঙ্গে শাহ্‌দীন মালিক বলেন, এই প্রক্রিয়া অনুযায়ী প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে আপিল বিভাগের পরবর্তী দুইজন জ্যেষ্ঠতম বিচারপতিকে নিয়ে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠিত হবে। তারা অভিযুক্ত তিন বিচারপতির কাছে অভিযোগের বিষয়ে জবাব চাইবেন। পরে প্রয়োজনে তাদের সাক্ষাৎকারও গ্রহণ করবেন। এর আলোকে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল যদি অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে গুরুতর অসদাচরণের অভিযোগের বিষয়ে সিদ্ধান্তে উপনীত হন, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে মতামত পাঠাবেন। এরপর রাষ্ট্রপতি সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত কার্যকর করবেন।
প্রেস কাউন্সিলের সাবেক চেয়ারম্যান ও আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মমতাজ উদ্দিন আহমদ সমকালকে বলেন, সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী মামলার রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) আবেদন করেছে, কিন্তু সেই আবেদনের শুনানি হয়নি এখনও। অর্থাৎ ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের আদেশ এখনও বহাল রয়েছে। এ কারণে ওই রায় অনুসারে হাইকোর্টের তিন বিচারপতির বিরুদ্ধে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করতে হলে অবশ্যই সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠন করতে হবে।
বাহাত্তরের মূল সংবিধানে উচ্চ আদালতের বিচারক অপসারণের ক্ষমতা জাতীয় সংসদের হাতে ছিল। ১৯৭৫ সালের ২৪ জানুয়ারি সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে ওই ক্ষমতা দেওয়া হয় রাষ্ট্রপতির হাতে। পরে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে ওই ক্ষমতা দেওয়া হয় সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের হাতে। এরপর আপিল বিভাগের এক রায়ে পঞ্চম সংশোধনী বাতিল করা হলেও সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের ব্যবস্থা রেখে দেওয়া হয়। ২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীর মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক অপসারণের ক্ষমতা আবার ফিরিয়ে দেওয়া হয় সংসদের কাছে। সুপ্রিম কোর্টের ৯ আইনজীবীর করা এক রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৬ সালের ৫ মে সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের ভিত্তিতে ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেন হাইকোর্ট। এরপর ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে রাষ্ট্রপক্ষ। পরে ২০১৭ সালের ৩ জুলাই ওই আপিল খারিজ করে রায় দেন আপিল বিভাগ। এরই ধারাবাহিকতায় একই বছরের ২৪ ডিসেম্বর আপিল বিভাগের রায় রিভিউ চেয়ে আবেদন করা হয়, যা এখনও শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।

আরও পড়ুন

×