কীসের ছাত্রলীগ, আবরার হত্যার বিচার হবেই

প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০১৯      

সমকাল প্রতিবেদক

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের বিচারে নিজের দৃঢ় অবস্থানের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, অপরাধীর রাজনৈতিক পরিচয় যা-ই হোক না কেন- অবশ্যই সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হবে। গতকাল বুধবার প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে জনাকীর্ণ এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, কীসের ছাত্রলীগ, ছাত্রদল? অপরাধী কোন দলের, সেটা বিবেচনায় আনা হবে না। এই হত্যাকাণ্ডের বিচার হবেই। অপরাধী অপরাধীই।

আবরার হত্যাকাণ্ডকে অমানবিক অভিহিত করে তিনি আরও বলেছেন, 'একটা বাচ্চা ছেলে। ২১ বছর বয়স। তাকে কী অমানবিকভাবে হত্যা করেছে। পিটিয়ে পিটিয়ে মেরেছে। সে সাধারণ পরিবারের মেধাবী ছেলে। আমি তার মা-বাবার কষ্ট বুঝি। আমিও বছরের পর বছর হত্যার বিচার চেয়ে পাইনি। আমাকে ৩৮ বছর বিচারের জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে। এটাও দেশবাসীর ভুলে গেলে চলবে না।'

ক্যাসিনো-কাণ্ডে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, যেখানে অনিয়ম হবে, সেখানেই অভিযান চালানো হবে।

অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এ উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে। তিনি এ ধরনের দুর্নীতিবিরোধী অভিযানকে আগামী দিনের স্বচ্ছ রাজনীতির জন্য একটি বার্তা হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেছেন, যারা সব সময়ই সরকারি দলের সমর্থক, তাদের বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িতদের পরিহার করতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেছেন, তিনি কখনই অন্যায়কে প্রশ্রয় দেননি, দেবেনও না। যারা অন্যায় করবে, তাদের বিরুদ্ধে অবশ্যই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অপরাধী কোন দলের, সেটা বিবেচনায় আনা হবে না।

সংবাদ সম্মেলনে আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেছেন, 'বাংলাদেশ আমার দেশ। এ দেশের ভালো-মন্দ দেখার দায়িত্ব আমার। আমি সরকারপ্রধান। আর আমি অন্যের মতো ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে দেশ পরিচালনা করি না। সুতরাং দেশের কোথায় কখন কী হচ্ছে, সেটা দেখার দায়িত্ব আমার। নিজের প্রতি আমার আত্মবিশ্বাস আছে। আমি যা কিছু করি, সেটা দেশ ও জনগণের কল্যাণেই করি। কারোর কোনো সমালোচনায় কিছু যায়-আসে না। শেখ হাসিনা বাংলাদেশের স্বার্থ বিক্রি করেনি। করবেও না। শেখ হাসিনাই দেশের স্বার্থ সবচেয়ে বেশি রক্ষা করেছে।'

সম্প্রতি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে অংশ নিতে যুক্তরাষ্ট্র এবং পরে ভারত সফরের অভিজ্ঞতা জানাতে সংবাদ সম্মেলনে আসা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মঞ্চে ছিলেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন এবং পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম। এ সময় বিভিন্ন গণমাধ্যমের সম্পাদক, সিনিয়র সাংবাদিক, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা, বেশ কয়েকজন মন্ত্রী ও এমপি উপস্থিত ছিলেন। বিভিন্ন টেলিভিশনে সংবাদ সম্মেলনটি সরাসরি সম্প্রচার করা হয়েছে। সংবাদ সম্মেলনের আগে সাংবাদিকদের মধ্যাহ্নভোজে আপ্যায়ন করেন প্রধানমন্ত্রী।

আন্দোলনের আগেই কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে :আবরার হত্যাকাণ্ড প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামার আগেই কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। অপরাধীদের গ্রেফতারের জন্য আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অনেকেই গ্রেফতার হয়েছে। অভিযুক্তদের বহিস্কার করার জন্য ছাত্রলীগকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ছাত্রলীগ থেকে তাদের বহিস্কার করা হয়েছে। তাহলে আন্দোলন করতে হবে কেন? আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের আরও সহনশীল হতে হবে। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, তারা সবচেয়ে মেধাবী শিক্ষার্থী। বুয়েটের ভিসির সঙ্গে শিক্ষার্থীদের কথোপকথনের সময় কে ভিসি, কে শিক্ষার্থী- সেটা বোঝা যায়নি বলেও তিনি মন্তব্য করেন। সেইসঙ্গে সিসি ক্যামেরার ফুটেজ আনার সময় পুলিশকে কেন বাধা দেওয়া হয়েছে, সেটাও জানতে চেয়েছেন তিনি।

সনি হত্যাকাণ্ডের বিচার হয়েছিল? :শেখ হাসিনা বুয়েটে ছাত্রলীগের একাধিক নেতাকর্মীর নিহত হওয়ার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, ওইসব হত্যাকাণ্ডের মধ্যে ক'টির বিচার হয়েছে? ক'জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে? বিএনপি শাসনামলে বুয়েট ক্যাম্পাসে নিহত সাবেকুন নাহার সনি হত্যাকাণ্ডের বিচার হয়েছিল? ওই সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের প্রতিটি শিক্ষাঙ্গনে প্রতিদিনই গোলাগুলির ঘটনা ঘটত। অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানি হতো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সূর্য সেন হলে সাত খুনে জড়িত থাকায় ছাত্রলীগ থেকে বহিস্কার করে গ্রেফতার করা হয়েছিল শফিউল আলম প্রধানকে। অথচ অবৈধ স্বৈরশাসক জিয়াউর রহমান তাকে মুক্তি দিয়েছে। সেই শফিউল আলম প্রধান পরে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন জোটের নেতা হয়েছিল। বর্তমানে দেশের প্রতিটি শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী।

বুয়েটে ছাত্র রাজনীতি বন্ধে আপত্তি নেই :ছাত্র রাজনীতি বন্ধের দাবি প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেছেন, বুয়েট চাইলে তাদের ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে পারে। সেখানে সরকার কোনো হস্তক্ষেপ করবে না। তবে আবরার হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে রাজনীতির কোনো সম্পর্ক নেই। আর সব জায়গায় ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে হবে কেন? এটা তো স্বৈরাচারদের কথা। তারাই তো অবৈধভাবে ক্ষমতায় এসে রাজনীতি নিষিদ্ধ করেছে। ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করেছে। স্বৈরশাসক আইয়ুব খানের পর আরেক স্বৈরশাসক জিয়াউর রহমান অবৈধভাবে ক্ষমতার মসনদে বসে রাজনীতিতে আসার পর রাজনীতি নষ্ট করেছে। এরা উড়ে এসে জুড়ে বসে রাজনীতির নামে মানুষের চরিত্র নষ্ট করেছে। ওটা তাদের নষ্ট রাজনীতি। এখন ওই অবস্থা থেকে দেশকে মুক্ত করা হচ্ছে। ছাত্র রাজনীতি থেকে আজকের পর্যায়ে আসার কথা জানিয়ে শেখ হাসিনা আরও বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে দেশের প্রতিটি সংগ্রামে অগ্রণী ভূমিকায় ছিল ছাত্ররা।

গ্যাস বিক্রির অনুমতিদাতারাই গ্যাস নিয়ে প্রশ্ন তুলছে :প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট গ্যাস বিক্রির জন্য তাকে অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু তিনি দেশের চাহিদা মিটিয়ে ৫০ বছরের গ্যাস মজুদ রেখে ওই অনুরোধ রক্ষার কথা বলেছিলেন বলেই আওয়ামী লীগ ২০০১ সালে ক্ষমতায় আসতে পারেনি। আর গ্যাস বিক্রির মুচলেকা দিয়ে ওই সময় বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় এসেছিল। এখন যারা গ্যাস বিক্রি নিয়ে প্রশ্ন তোলে, তারা ২০০১ সালে গ্যাস বিক্রির অনুমতি দিয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ভারত সফরে গিয়ে গঙ্গা পানি চুক্তির কথা ভুলে গিয়েছিলেন। তারাই এখন ফেনী নদীর পানি নিয়ে কথা বলছেন।

ভারতের ত্রিপুরায় এলপিজি ও ফেনী নদীর পানি ত্রিপুরাকে দেওয়ার বিষয়ে সাম্প্রতিক চুক্তি নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেছেন, এলপিজি প্রাকৃতিক গ্যাস নয়, বাংলাদেশে উৎপাদন হয় না। বাংলাদেশ যে অপরিশোধিত তেল কিনে আনে, এর বাইপ্রোডাক্ট হিসেবে একটা অংশ এলপিজি হয়। সেটাই রফতানি করা হবে ভারতে। আর চুক্তি অনুযায়ী খাওয়ার জন্য ভারত মাত্র ১ দশমিক ৮২ কিউসেক পানি নেবে। কেউ যদি পানি পান করতে চায়, তা না দেওয়া হলে কেমন দেখায়? আমাদের তো আরও সীমান্তবর্তী নদী আছে, সেটাও চিন্তায় আনতে হবে।

শেখ হাসিনা বলেন, পৃথিবীর কোনো দেশই বন্দর নির্মাণ করে একা ব্যবহার করে না। বাংলাদেশে কয়েকটি বন্দর রয়েছে। আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরও আছে। ভারতসহ প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো এসব ব্যবহার করতে পারবে। এতে বাংলাদেশ লাভবান হবে। দেশ অর্থনৈতিকভাবে আরও সমৃদ্ধশালী হবে। আর এটা যদি দেশ বিক্রি হয়ে যায়, তাহলে কিছুই করার নেই।

অবৈধ সরকারপ্রধানরা ভারতে গিয়ে অন্যের পায়ে তেল মেখেছেন :আওয়ামী লীগ সভাপতি আরও বলেছেন, অতীতে অনেক অপবাদ শুনতে হয়েছে। অনেক মিথ্যাচার হয়েছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে জড়িয়ে মিথ্যা অপবাদ দেওয়ার অপচেষ্টা হয়েছে। অথচ বঙ্গবন্ধুই এ দেশ স্বাধীন করেছেন। তিনিই বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশে পরিণত করেছিলেন। আর অবৈধভাবে ক্ষমতায় আসা সরকারগুলোর প্রধানরা ভারতে গিয়ে অন্যের পায়ে তেল মেখেছেন। তারা দেশের কোনো উন্নয়ন করেননি। শেখ হাসিনা বলেছেন, ২৫ বছরের চুক্তি নাকি দেশ বিক্রির চুক্তি। যারা এসব বলেছিলেন, তারা কেন ক্ষমতায় গিয়ে সীমানা চুক্তি করেননি?

শিক্ষাঙ্গনে তল্লাশির নির্দেশ :প্রধানমন্ত্রী দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ছাত্রাবাসে উচ্ছৃঙ্খলতা ও অনিয়ম খুঁজে বের করতে তল্লাশি চালানোর নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, রাজনৈতিক কোনো পরিচয় দেখা হবে না। কোথায় কী আছে, না আছে খুঁজে বের করতে হবে। কারা মাস্তানি করে, অপকর্ম ঘটায়- সেটা খুঁজে বের করতে হবে। সামান্য টাকা সিট ভাড়ায় থেকে একেকজন ছাত্রাবাসের রুমে বসে মাস্তানি করবে, আর তাদের খরচ বহন করতে হবে জনগণের ট্যাক্সের পয়সা দিয়ে- সেটা কখনও হবে না।

আত্মজীবনী লিখবেন না প্রধানমন্ত্রী :পূর্ণাঙ্গ আত্মজীবনী লেখা সম্পর্কিত এক প্রশ্নের জবাবে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা বলেছেন, তিনি লেখক নন। বান্ধবী বেবী মওদুদের উৎসাহেই তার লেখালেখি হয়েছে। তবে আত্মজীবনী লেখার ইচ্ছা নেই। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, তার বাবা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। তিনি বাংলার মানুষের উন্নত জীবন প্রত্যাশা করেছিলেন। প্রধানমন্ত্রী দেশের মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করতেই নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। তবে এ জন্য কেউ তাকে মনে রাখুক, তার কোনো স্মৃতি থাকুক- এটুকুও তিনি প্রত্যাশা করেন না। এ কারণেই তিনি আত্মজীবনী লিখবেন না।