পুরোনো অন্ধকারে মিয়ানমার
সেনা শাসনে বন্দি সু চি
মিয়ানমারের জনগণ গতকাল সোমবার ঘুম থেকে জেগেই দেখতে পান অস্বাভাবিক পরিবেশ- ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন, কাজ করছে না মোবাইল-টেলিফোনও। দেশটির বৃহত্তম শহর ইয়াঙ্গুনের রাস্তায় টহল দিচ্ছে সেনারা। টিভি চালু করে পাওয়া যায় ঝিরিঝিরি আওয়াজ; সেগুলোর সংযোগও বন্ধ। শেষ পর্যন্ত সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রিত টিভি চ্যানেলের একজন সংবাদপাঠক ঘোষণা করেন- সশস্ত্র বাহিনী দেশটির ক্ষমতা গ্রহণ করেছে। তিনি আরও জানান, সেনাপ্রধান মিন অং হদ্মাইংয়ের হাতে সর্বময় ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয়েছে।
পরে জানা যায়, মিয়ানমারের নেত্রী (স্টেট কাউন্সিলর) অং সান সু চিকে আটক করেছে সেনারা। একই সঙ্গে দেশটির প্রেসিডেন্ট উইন মিন্ট এবং ক্ষমতাসীন দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদেরও আটক করা হয়েছে। দেশটিতে এক বছরের জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ সারাবিশ্ব মিয়ানমারে সেনা অভ্যুত্থানের নিন্দা জানিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বলেছেন, সেনাবাহিনীকে অবিলম্বে ক্ষমতা ছেড়ে দিতে হবে। তিনি এ দাবিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। গতকাল এক বিবৃতিতে তিনি আরও বলেন, মিয়ানমারে গণতান্ত্রিক উত্তরণ ঘটায় যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়েছিল। এখন দেশটি উল্টোপথে যাত্রা শুরু করায় আবার নিষেধাজ্ঞা জারির বিষয়টি তার সরকার বিবেচনা করবে।
অভ্যুত্থানের পর সমগ্র মিয়ানমারে রাত্রিকালীন কারফিউ জারি করা হয়েছে। রাত ৮টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত চলবে কারফিউ। সেনাবাহিনী সু চির ২৪ মন্ত্রীকে বরখাস্ত করে ১১ জনকে নতুন নিয়োগ দিয়েছে। নতুন মন্ত্রীদের বেশিরভাগই সেনা কর্মকর্তা। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে জনগণের মধ্যে ভীতি, আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। তবে কোনো গোলযোগের খবর পাওয়া যায়নি। মিয়ানমার পরিস্থিতি নিয়ে আজ মঙ্গলবার জরুরি বৈঠকে বসছে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ।
গত নভেম্বরের নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে সু চির সরকার এবং প্রভাবশালী সামরিক বাহিনীর মধ্যে কয়েক দিন ধরে দ্বন্দ্ব ও উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এই সামরিক অভ্যুত্থান ঘটল। এর ফলে মিয়ানমারের ভঙ্গুর ও স্বল্পায়ুর গণতন্ত্র আবারও অন্ধকার সময়ে পা দিল। ছয় দশক ধরে সেনা শাসনে ছিল মিয়ানমার। মাত্র কয়েক বছর আগে কিছুটা বেসামরিক শাসনে ফিরে আসে দেশটি। এর মধ্যে গত পাঁচ বছর ছিল সু চির নির্বাচিত সরকার।
বিশ্নেষকরা মনে করছেন, এবারের অভ্যুত্থানের সময়টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সেনাপ্রধানের মেয়াদ শেষ হওয়ার পথে। তিনি চাচ্ছিলেন, তার মেয়াদ আরও বাড়ানো হোক। সেটা নিয়ে হয়তো সমঝোতা হচ্ছিল না। সেনাপ্রধান যে সম্পদের পাহাড় গড়েছেন, তার সুরক্ষার জন্য তার স্বপদে থাকা খুবই জরুরি। তা ছাড়া রোহিঙ্গা গণহত্যার জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (আইসিসি) তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হতে পারে। ভবিষ্যতে গণহত্যায় দণ্ডিতও হতে পারেন জেনারেল হদ্মাইং। ফলে নিজেকে রক্ষার জন্যই তিনি ক্ষমতা গ্রহণ করেছেন। এ অবস্থায় তার স্বৈরশাসন কত দিন চলবে, তা বোঝা মুশকিল।
মিয়ানমারের খ্যাতনামা ইতিহাসবিদ এবং লেখক থান্ট মিন্ট-ইউ টুইটারে লিখেছেন, 'এই তো ভিন্নতর একটি ভবিষ্যতের দ্বার খুলল। আমার মনে হয়, ভবিষ্যতে যা ঘটবে, তার ওপর কারোরই নিয়ন্ত্রণ থাকবে না। মনে রাখবেন, মিয়ানমার অস্ত্রে ভাসছে। এখানে জাতিগত ও ধর্মীয় বিভাজনও চরমে। আর দেশটির কোটি কোটি মানুষ ঠিকমতো খেতেও পারে না।'
গতকাল থেকেই দেশটিতে নতুন পার্লামেন্টের অধিবেশন শুরু হওয়ার কথা ছিল। আটক হওয়ার আগে সু চি সেনা অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে জনগণকে বিক্ষোভ চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। থাইল্যান্ড ও জাপানে সেনা অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ হয়েছে।
সু চির দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসির (এনএলডি) মুখপাত্র মিও নয়েন্ট জানান, রাজধানী নেপিদোতে অভিযান চালিয়ে তাদের শীর্ষ নেতাদের আটক করা হয়। সংসদ সদস্যদের বাড়িতে নিরাপত্তা বাহিনীর পাহারা বসানো হয়েছে।
সেনাবাহিনীর টেলিভিশন মিয়াওয়াদির ঘোষণায় বলা হয়, গত নির্বাচনে 'জালিয়াতি'র ঘটনায় সরকারের জ্যেষ্ঠ নেতাদের আটক করা হয়েছে। জরুরি অবস্থা জারি করে মিয়ানমারের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান সেনাবাহিনীর সিনিয়র জেনারেল মিং অং হ্লাইংয়ের হাতে। দেশটির ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট মিয়ান্ত সোয়ে রাষ্ট্রের প্রধান তিনটি অঙ্গ আইনসভা, নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগের ক্ষমতা সেনাপ্রধানের কাছে হস্তান্তর করেছেন।
মিয়ানমারের বিভিন্ন প্রদেশে সেনাসদস্যরা প্রাদেশিক সরকারের প্রধানদের বাসায় বাসায় গিয়ে তাদের আটক করছে বলে পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, নেপিদোর পাশাপাশি মিয়ানমারের প্রধান শহর ইয়াঙ্গুনেও সেনা মোতায়েন করা হয়েছে। সব ব্যাংক সাময়িক বন্ধ রাখা হয়েছে।
২০১৬ সালের শুরুর দিকে ক্ষমতায় বসে এনএলডি। সু চির সরকারের সময়ে মিয়ানমারের রাখাইনে নতুন করে নারকীয় দমন-পীড়নের শিকার হয় রোহিঙ্গারা। ২০১৭ সালের দ্বিতীয়ার্ধে প্রায় সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। রোহিঙ্গা গণহত্যায় নিষ্ফ্ক্রিয় ভূমিকার জন্য আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক সমালোচিত হন সু চি। এ সময় তিনি প্রায়ই সেনাবাহিনীর পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তবে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে অং সান সু চির যথেষ্ট জনপ্রিয়তা রয়েছে।
গত বছরের ৮ নভেম্বরের জাতীয় নির্বাচনে সু চির দল এনএলডি বড় জয় পায়। তার দল নির্বাচনে ৪৭৬টির মধ্যে ৩৯৬টি আসনে জয় পায়। অন্যদিকে, সেনাসমর্থিত ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (ইউএসডিপি) পায় মাত্র ৩৩টি আসন। এই ফল সেনাদের কাছে ছিল অপ্রত্যাশিত।
নির্বাচনের পরই ইউএসডিপি ভোটে প্রতারণার অভিযোগ তুলে ফলাফল মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানায় এবং নতুন করে নির্বাচন আয়োজনের দাবি তোলে। তবে আন্তর্জাতিক মহল এবং দেশটির নির্বাচন কমিশন অনিয়মের অভিযোগ নাকচ করে দেয়।
মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া অঞ্চলের উপপরিচালক ফিল রবার্টসন বলেন, সু চি স্পষ্টতই নির্বাচনে বিপুল বিজয় পেয়েছেন। নির্বাচনী জালিয়াতির অভিযোগগুলো অনেকটা ট্রাম্পসুলভ। এসব অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ ছিল না।
বিক্ষোভের ডাক সু চির :সু চি সামরিক অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে জনবিক্ষোভের ডাক দিয়েছেন। গ্রেপ্তারের কয়েক ঘণ্টার মাথায় তার নামে প্রচারিত এক বিবৃতিতে এই আহ্বান জানানো হয়। বিবৃতিতে সু চি বলেছেন, 'সেনাবাহিনী দেশটিতে আবার জান্তা শাসন কায়েম করার চেষ্টা করছে। এটি মেনে না নেওয়ার জন্য আমি জনগণের কাছ অনুরোধ জানাই।' মিয়ানমারের জনগণকে উদ্দেশ করে সু চি বলেন, 'সামরিক বাহিনীর অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে ঐকান্তিক প্রতিবাদ জানানোর আহ্বান জানাই।'
সু চির বিক্ষোভের ডাকে দেশটির অনেক মানুষ সাড়া দেবেন বলে মনে করেন মিয়ানমারবিষয়ক নিরপেক্ষ বিশ্নেষক ডেভিড ম্যাথিসন। তিনি বলেন, মিয়ানমারের জনগণ ফের পুরোপুরি জান্তা শাসনে ফিরতে চাইবে না। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ফিল রবার্টসন বলেন, সামরিক বাহিনীর এ পদক্ষেপ মিয়ানমারকে আবার একঘরে রাষ্ট্রে পরিণত করা এবং জনগণকে ক্রুদ্ধ করে তোলার ঝুঁকি সৃষ্টি করেছে। গত নির্বাচনে করোনা মহামারি মোকাবিলা করেই বিপুলসংখ্যক ভোটার সু চিকে ভোট দেন।
সেনাবাহিনী প্রধান হদ্মাইং অবাধ ও স্বচ্ছ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তরের অঙ্গীকার করেছেন। তবে কবে সেই নির্বাচন হবে, তা জানাননি তিনি।
বিশ্বনেতাদের নিন্দা :মিয়ানমারে যা ঘটছে, তা নিয়ে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস উদ্বিগ্ন বলে জানিয়েছেন তার মুখপাত্র স্টিভেন দুজারিক। এক বিবৃতিতে তিনি বলেছেন, মিয়ানমারের সব পক্ষকেই উস্কানিমূলক কোনো পদক্ষেপ নেওয়া থেকে বিরত থাকার এবং গণতান্ত্রিক রীতি মেনে নির্বাচনের ফলাফলের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘ মহাসচিব।
তিনি বলেছেন, ভোটের ফল নিয়ে কোনো বিরোধ থাকলে আইনিভাবেই তা মেটাতে হবে। গণতন্ত্র, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই উন্নয়ন, মানবাধিকার ও আইনের শাসনের জন্য মিয়ানমারের জনগণের যে আকাঙ্ক্ষা, জাতিসংঘ তার প্রতি সমর্থন দিয়ে যাবে বলেও উল্লেখ করা হয় বিবৃতিতে।
যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, মিয়ানমারের সাম্প্রতিক নির্বাচনের ফল পাল্টে দেওয়ার বা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ব্যাহত করার যে কোনো উদ্যোগের বিরোধিতা করবে বাইডেন প্রশাসন। সু চিসহ আটক নেতাদের মুক্তি দেওয়ার জন্য মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন। তিনি বলেছেন, 'গণতন্ত্র, স্বাধীনতা, শান্তি এবং উন্নয়নের প্রতি মিয়ানমারের জনগণের যে আকাঙ্ক্ষা, তার প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন থাকবে। সামরিক বাহিনীর উচিত এখনই তাদের ওই পদক্ষেপ থেকে সরে আসা।'
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন সেনা অভ্যুত্থানের নিন্দা জানিয়েছেন। এক টুইটে তিনি বলেন, মিয়ানমারে সেনা অভ্যুত্থান এবং অং সান সু চিসহ বেসামরিক নাগরিকদের অবরোধের নিন্দা জানাচ্ছি। জনগণের ভোটকে স্বীকৃতি দিয়ে বেসামরিক নেতাদের মুক্তি দেওয়া উচিত। ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রধান চার্লস মিশেল সেনা অভ্যুত্থানের নিন্দা জানিয়ে আটক নেতাদের মুক্তির দাবি করেছেন।
মিয়ানমারের অভ্যুত্থানের দিকে নজর রাখার কথা জানিয়ে দেশটিতে স্থিতিশীলতা বজায় থাকবে বলে আশা প্রকাশ করেছে চীন। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ওয়াং ওয়েনবিন বলেন, 'আমরা আশা করছি, মিয়ানমারের সব পক্ষ সংবিধান ও আইনি কাঠামোর অধীনে যথাযথভাবে তাদের পার্থক্যগুলো সামাল দিতে পারবে এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকবে।'
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, 'মিয়ানমারে যা ঘটছে, গভীর উদ্বেগের সঙ্গে আমরা তা লক্ষ্য করছি। আমরা বিশ্বাস করি, আইনের শাসন ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অবশ্যই বজায় রাখতে হবে। পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছি আমরা।'
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জোট আসিয়ান মিয়ানমারে সংলাপ, সমঝোতা ও স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানিয়েছে। মিয়ানমারও আসিয়ানের সদস্য। তবে মিয়ানমারের প্রতিবেশী দেশ থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়া বিষয়টিকে মিয়ানমারের 'অভ্যন্তরীণ বিষয়' হিসেবে বর্ণনা করেছে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া অ্যাডভোকেসি পরিচালক জন সিফটন মিয়ানমারের বিরুদ্ধে সরাসরি নিষেধাজ্ঞা আরোপের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য দেশের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
ইয়াঙ্গুনে সেনা সমর্থকদের উল্লাস :মিয়ানমারের ইয়াঙ্গুনে সেনা অভ্যুত্থানের সমর্থনে উল্লাস করেছে স্বঘোষিত কিছু জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীর সদস্যরা। তারা স্থানীয় একটি প্যাগোডার বাইরে শহীদদের সমাধিস্থলের কাছে গান গেয়ে উল্লাস প্রকাশ করে। উল্লাসকারীদের একজন বলেছে, অভ্যুত্থান উদযাপনের অংশ হিসেবে তারা শহরের অন্য স্থানগুলোতেও যাবে।
তিন দিন ধরে কথিত জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীর সদস্যরা সামরিক বাহিনীর সমর্থনে ইয়াঙ্গুনের বিভিন্ন স্থানে প্রচারণা চালিয়ে আসছে। তবে পাল্টা কোনো প্রতিবাদ কিংবা অভ্যুত্থানবিরোধী কোনো বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়নি। সূত্র :বিবিসি, সিএনএন, নিউইয়র্ক টাইমস, এএফপি ও রয়টার্স।
পরে জানা যায়, মিয়ানমারের নেত্রী (স্টেট কাউন্সিলর) অং সান সু চিকে আটক করেছে সেনারা। একই সঙ্গে দেশটির প্রেসিডেন্ট উইন মিন্ট এবং ক্ষমতাসীন দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদেরও আটক করা হয়েছে। দেশটিতে এক বছরের জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ সারাবিশ্ব মিয়ানমারে সেনা অভ্যুত্থানের নিন্দা জানিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বলেছেন, সেনাবাহিনীকে অবিলম্বে ক্ষমতা ছেড়ে দিতে হবে। তিনি এ দাবিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। গতকাল এক বিবৃতিতে তিনি আরও বলেন, মিয়ানমারে গণতান্ত্রিক উত্তরণ ঘটায় যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়েছিল। এখন দেশটি উল্টোপথে যাত্রা শুরু করায় আবার নিষেধাজ্ঞা জারির বিষয়টি তার সরকার বিবেচনা করবে।
অভ্যুত্থানের পর সমগ্র মিয়ানমারে রাত্রিকালীন কারফিউ জারি করা হয়েছে। রাত ৮টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত চলবে কারফিউ। সেনাবাহিনী সু চির ২৪ মন্ত্রীকে বরখাস্ত করে ১১ জনকে নতুন নিয়োগ দিয়েছে। নতুন মন্ত্রীদের বেশিরভাগই সেনা কর্মকর্তা। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে জনগণের মধ্যে ভীতি, আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। তবে কোনো গোলযোগের খবর পাওয়া যায়নি। মিয়ানমার পরিস্থিতি নিয়ে আজ মঙ্গলবার জরুরি বৈঠকে বসছে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ।
গত নভেম্বরের নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে সু চির সরকার এবং প্রভাবশালী সামরিক বাহিনীর মধ্যে কয়েক দিন ধরে দ্বন্দ্ব ও উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এই সামরিক অভ্যুত্থান ঘটল। এর ফলে মিয়ানমারের ভঙ্গুর ও স্বল্পায়ুর গণতন্ত্র আবারও অন্ধকার সময়ে পা দিল। ছয় দশক ধরে সেনা শাসনে ছিল মিয়ানমার। মাত্র কয়েক বছর আগে কিছুটা বেসামরিক শাসনে ফিরে আসে দেশটি। এর মধ্যে গত পাঁচ বছর ছিল সু চির নির্বাচিত সরকার।
বিশ্নেষকরা মনে করছেন, এবারের অভ্যুত্থানের সময়টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সেনাপ্রধানের মেয়াদ শেষ হওয়ার পথে। তিনি চাচ্ছিলেন, তার মেয়াদ আরও বাড়ানো হোক। সেটা নিয়ে হয়তো সমঝোতা হচ্ছিল না। সেনাপ্রধান যে সম্পদের পাহাড় গড়েছেন, তার সুরক্ষার জন্য তার স্বপদে থাকা খুবই জরুরি। তা ছাড়া রোহিঙ্গা গণহত্যার জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (আইসিসি) তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হতে পারে। ভবিষ্যতে গণহত্যায় দণ্ডিতও হতে পারেন জেনারেল হদ্মাইং। ফলে নিজেকে রক্ষার জন্যই তিনি ক্ষমতা গ্রহণ করেছেন। এ অবস্থায় তার স্বৈরশাসন কত দিন চলবে, তা বোঝা মুশকিল।
মিয়ানমারের খ্যাতনামা ইতিহাসবিদ এবং লেখক থান্ট মিন্ট-ইউ টুইটারে লিখেছেন, 'এই তো ভিন্নতর একটি ভবিষ্যতের দ্বার খুলল। আমার মনে হয়, ভবিষ্যতে যা ঘটবে, তার ওপর কারোরই নিয়ন্ত্রণ থাকবে না। মনে রাখবেন, মিয়ানমার অস্ত্রে ভাসছে। এখানে জাতিগত ও ধর্মীয় বিভাজনও চরমে। আর দেশটির কোটি কোটি মানুষ ঠিকমতো খেতেও পারে না।'
গতকাল থেকেই দেশটিতে নতুন পার্লামেন্টের অধিবেশন শুরু হওয়ার কথা ছিল। আটক হওয়ার আগে সু চি সেনা অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে জনগণকে বিক্ষোভ চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। থাইল্যান্ড ও জাপানে সেনা অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ হয়েছে।
সু চির দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসির (এনএলডি) মুখপাত্র মিও নয়েন্ট জানান, রাজধানী নেপিদোতে অভিযান চালিয়ে তাদের শীর্ষ নেতাদের আটক করা হয়। সংসদ সদস্যদের বাড়িতে নিরাপত্তা বাহিনীর পাহারা বসানো হয়েছে।
সেনাবাহিনীর টেলিভিশন মিয়াওয়াদির ঘোষণায় বলা হয়, গত নির্বাচনে 'জালিয়াতি'র ঘটনায় সরকারের জ্যেষ্ঠ নেতাদের আটক করা হয়েছে। জরুরি অবস্থা জারি করে মিয়ানমারের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান সেনাবাহিনীর সিনিয়র জেনারেল মিং অং হ্লাইংয়ের হাতে। দেশটির ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট মিয়ান্ত সোয়ে রাষ্ট্রের প্রধান তিনটি অঙ্গ আইনসভা, নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগের ক্ষমতা সেনাপ্রধানের কাছে হস্তান্তর করেছেন।
মিয়ানমারের বিভিন্ন প্রদেশে সেনাসদস্যরা প্রাদেশিক সরকারের প্রধানদের বাসায় বাসায় গিয়ে তাদের আটক করছে বলে পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, নেপিদোর পাশাপাশি মিয়ানমারের প্রধান শহর ইয়াঙ্গুনেও সেনা মোতায়েন করা হয়েছে। সব ব্যাংক সাময়িক বন্ধ রাখা হয়েছে।
২০১৬ সালের শুরুর দিকে ক্ষমতায় বসে এনএলডি। সু চির সরকারের সময়ে মিয়ানমারের রাখাইনে নতুন করে নারকীয় দমন-পীড়নের শিকার হয় রোহিঙ্গারা। ২০১৭ সালের দ্বিতীয়ার্ধে প্রায় সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। রোহিঙ্গা গণহত্যায় নিষ্ফ্ক্রিয় ভূমিকার জন্য আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক সমালোচিত হন সু চি। এ সময় তিনি প্রায়ই সেনাবাহিনীর পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তবে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে অং সান সু চির যথেষ্ট জনপ্রিয়তা রয়েছে।
গত বছরের ৮ নভেম্বরের জাতীয় নির্বাচনে সু চির দল এনএলডি বড় জয় পায়। তার দল নির্বাচনে ৪৭৬টির মধ্যে ৩৯৬টি আসনে জয় পায়। অন্যদিকে, সেনাসমর্থিত ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (ইউএসডিপি) পায় মাত্র ৩৩টি আসন। এই ফল সেনাদের কাছে ছিল অপ্রত্যাশিত।
নির্বাচনের পরই ইউএসডিপি ভোটে প্রতারণার অভিযোগ তুলে ফলাফল মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানায় এবং নতুন করে নির্বাচন আয়োজনের দাবি তোলে। তবে আন্তর্জাতিক মহল এবং দেশটির নির্বাচন কমিশন অনিয়মের অভিযোগ নাকচ করে দেয়।
মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া অঞ্চলের উপপরিচালক ফিল রবার্টসন বলেন, সু চি স্পষ্টতই নির্বাচনে বিপুল বিজয় পেয়েছেন। নির্বাচনী জালিয়াতির অভিযোগগুলো অনেকটা ট্রাম্পসুলভ। এসব অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ ছিল না।
বিক্ষোভের ডাক সু চির :সু চি সামরিক অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে জনবিক্ষোভের ডাক দিয়েছেন। গ্রেপ্তারের কয়েক ঘণ্টার মাথায় তার নামে প্রচারিত এক বিবৃতিতে এই আহ্বান জানানো হয়। বিবৃতিতে সু চি বলেছেন, 'সেনাবাহিনী দেশটিতে আবার জান্তা শাসন কায়েম করার চেষ্টা করছে। এটি মেনে না নেওয়ার জন্য আমি জনগণের কাছ অনুরোধ জানাই।' মিয়ানমারের জনগণকে উদ্দেশ করে সু চি বলেন, 'সামরিক বাহিনীর অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে ঐকান্তিক প্রতিবাদ জানানোর আহ্বান জানাই।'
সু চির বিক্ষোভের ডাকে দেশটির অনেক মানুষ সাড়া দেবেন বলে মনে করেন মিয়ানমারবিষয়ক নিরপেক্ষ বিশ্নেষক ডেভিড ম্যাথিসন। তিনি বলেন, মিয়ানমারের জনগণ ফের পুরোপুরি জান্তা শাসনে ফিরতে চাইবে না। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ফিল রবার্টসন বলেন, সামরিক বাহিনীর এ পদক্ষেপ মিয়ানমারকে আবার একঘরে রাষ্ট্রে পরিণত করা এবং জনগণকে ক্রুদ্ধ করে তোলার ঝুঁকি সৃষ্টি করেছে। গত নির্বাচনে করোনা মহামারি মোকাবিলা করেই বিপুলসংখ্যক ভোটার সু চিকে ভোট দেন।
সেনাবাহিনী প্রধান হদ্মাইং অবাধ ও স্বচ্ছ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তরের অঙ্গীকার করেছেন। তবে কবে সেই নির্বাচন হবে, তা জানাননি তিনি।
বিশ্বনেতাদের নিন্দা :মিয়ানমারে যা ঘটছে, তা নিয়ে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস উদ্বিগ্ন বলে জানিয়েছেন তার মুখপাত্র স্টিভেন দুজারিক। এক বিবৃতিতে তিনি বলেছেন, মিয়ানমারের সব পক্ষকেই উস্কানিমূলক কোনো পদক্ষেপ নেওয়া থেকে বিরত থাকার এবং গণতান্ত্রিক রীতি মেনে নির্বাচনের ফলাফলের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘ মহাসচিব।
তিনি বলেছেন, ভোটের ফল নিয়ে কোনো বিরোধ থাকলে আইনিভাবেই তা মেটাতে হবে। গণতন্ত্র, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই উন্নয়ন, মানবাধিকার ও আইনের শাসনের জন্য মিয়ানমারের জনগণের যে আকাঙ্ক্ষা, জাতিসংঘ তার প্রতি সমর্থন দিয়ে যাবে বলেও উল্লেখ করা হয় বিবৃতিতে।
যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, মিয়ানমারের সাম্প্রতিক নির্বাচনের ফল পাল্টে দেওয়ার বা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ব্যাহত করার যে কোনো উদ্যোগের বিরোধিতা করবে বাইডেন প্রশাসন। সু চিসহ আটক নেতাদের মুক্তি দেওয়ার জন্য মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন। তিনি বলেছেন, 'গণতন্ত্র, স্বাধীনতা, শান্তি এবং উন্নয়নের প্রতি মিয়ানমারের জনগণের যে আকাঙ্ক্ষা, তার প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন থাকবে। সামরিক বাহিনীর উচিত এখনই তাদের ওই পদক্ষেপ থেকে সরে আসা।'
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন সেনা অভ্যুত্থানের নিন্দা জানিয়েছেন। এক টুইটে তিনি বলেন, মিয়ানমারে সেনা অভ্যুত্থান এবং অং সান সু চিসহ বেসামরিক নাগরিকদের অবরোধের নিন্দা জানাচ্ছি। জনগণের ভোটকে স্বীকৃতি দিয়ে বেসামরিক নেতাদের মুক্তি দেওয়া উচিত। ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রধান চার্লস মিশেল সেনা অভ্যুত্থানের নিন্দা জানিয়ে আটক নেতাদের মুক্তির দাবি করেছেন।
মিয়ানমারের অভ্যুত্থানের দিকে নজর রাখার কথা জানিয়ে দেশটিতে স্থিতিশীলতা বজায় থাকবে বলে আশা প্রকাশ করেছে চীন। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ওয়াং ওয়েনবিন বলেন, 'আমরা আশা করছি, মিয়ানমারের সব পক্ষ সংবিধান ও আইনি কাঠামোর অধীনে যথাযথভাবে তাদের পার্থক্যগুলো সামাল দিতে পারবে এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকবে।'
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, 'মিয়ানমারে যা ঘটছে, গভীর উদ্বেগের সঙ্গে আমরা তা লক্ষ্য করছি। আমরা বিশ্বাস করি, আইনের শাসন ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অবশ্যই বজায় রাখতে হবে। পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছি আমরা।'
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জোট আসিয়ান মিয়ানমারে সংলাপ, সমঝোতা ও স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানিয়েছে। মিয়ানমারও আসিয়ানের সদস্য। তবে মিয়ানমারের প্রতিবেশী দেশ থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়া বিষয়টিকে মিয়ানমারের 'অভ্যন্তরীণ বিষয়' হিসেবে বর্ণনা করেছে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া অ্যাডভোকেসি পরিচালক জন সিফটন মিয়ানমারের বিরুদ্ধে সরাসরি নিষেধাজ্ঞা আরোপের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য দেশের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
ইয়াঙ্গুনে সেনা সমর্থকদের উল্লাস :মিয়ানমারের ইয়াঙ্গুনে সেনা অভ্যুত্থানের সমর্থনে উল্লাস করেছে স্বঘোষিত কিছু জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীর সদস্যরা। তারা স্থানীয় একটি প্যাগোডার বাইরে শহীদদের সমাধিস্থলের কাছে গান গেয়ে উল্লাস প্রকাশ করে। উল্লাসকারীদের একজন বলেছে, অভ্যুত্থান উদযাপনের অংশ হিসেবে তারা শহরের অন্য স্থানগুলোতেও যাবে।
তিন দিন ধরে কথিত জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীর সদস্যরা সামরিক বাহিনীর সমর্থনে ইয়াঙ্গুনের বিভিন্ন স্থানে প্রচারণা চালিয়ে আসছে। তবে পাল্টা কোনো প্রতিবাদ কিংবা অভ্যুত্থানবিরোধী কোনো বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়নি। সূত্র :বিবিসি, সিএনএন, নিউইয়র্ক টাইমস, এএফপি ও রয়টার্স।
