রোগীর সেবাই আল্লাহর সেবা
ইসলাম ও সমাজ
আল্লাহতায়ালা জিন এবং মানব জাতিকে সৃষ্টি করেছেন একমাত্র তার ইবাদতের জন্য। ইবাদত বলতে আমরা শুধু ইসলামের পঞ্চস্তম্ভকেই বুঝে থাকি। কিন্তু শব্দটির ব্যাপকতা অনেক। ইসলামের শিক্ষা হলো মানুষ অসুস্থ হলে পরিবার, কাছের আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী তার সুস্থতার জন্য সেবা করবে। এটা ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত। বর্তমান করোনা মহামারিতে অনেক অসুস্থ রোগী হাসপাতাল বা ক্লিনিকে সেবা পাচ্ছে না। এমনকি অনেকে পরিবার থেকেও চিকিৎসা সুবিধা পাচ্ছে না। কেয়ামতের দিন প্রত্যেকে আল্লাহর সেবা করা তথা অসুস্থ ব্যক্তিকে সেবা করার ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবে। তাই এ জিজ্ঞাসার উত্তর দেওয়ার জন্য সবাইকে প্রস্তুতি নিতে হবে। হাদিসে কুদসিতে বলা হয়েছে, কেয়ামতের দিন আল্লাহ বলবেন, 'হে আদম সন্তান! আমি অসুস্থ হয়েছিলাম, কিন্তু তুমি আমাকে দেখতে যাওনি। বান্দা বলবে, আপনি তো বিশ্বজাহানের প্রতিপালক- আমি কীভাবে আপনাকে দেখতে যেতে পারি? আল্লাহ বলবেন, আমার অমুক বান্দা অসুস্থ হয়েছিল। তুমি তাকে দেখতে গেলে সেখানে আমাকে পেতে...' (সহিহ মুসলিম :২১৬২)। আমাদের আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী অনেকেই অসুস্থ থাকেন, এ অবস্থায় তাদের দেখতে যাওয়া, খোঁজ-খবর নেওয়া, সেবা শুশ্রূষা করা আমাদের ইমানি দায়িত্ব। রাসুল (সা.) বলেছেন, 'এক মুসলমানের ওপর অপর মুসলমানের পাঁচটি হক রয়েছে। তা হলো- ১. সালামের জবাব দেওয়া, ২. হাঁচির উত্তর দেওয়া, ৩. দাওয়াত কবুল করা, ৪. অসুস্থ হলে দেখতে যাওয়া, ৫. জানাজায় অংশগ্রহণ করা' (সহিহ বোখারি :১২৪০)। হাদিসের আলোকে দেখা যায়, একজন মুসলমান আরেকজন মুসলমানের কাছে যে হক বা অধিকার রয়েছে তার মধ্যে একটি হলো কেউ রোগাক্রান্ত হলে তাকে দেখতে যাওয়া, সাধ্যমতো সেবা শুশ্রূষা করা। এটি হক্কুল ইবাদের অন্তর্ভুক্ত এবং এটা রোগীর প্রতি দয়া নয় বরং এটা রোগীর প্রাপ্য হক। আল্লাহ নিজ হকের জন্য বান্দাকে ক্ষমা করতে পারেন; কিন্তু বান্দার হকের জন্য বান্দা ক্ষমা না করলে আল্লাহ ক্ষমা করবেন না। হক আদায় ছাড়াও রোগীর সেবাযত্ন করার অনেক মর্যাদা রয়েছে। হজরত জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, 'যে অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখতে রওনা হলো, সে রহমতের সাগরে সাঁতার কাটতে থাকল, যতক্ষণ না সে তথায় গিয়ে বসে। যখন সে তথায় গিয়ে বসল, তখন সে রহমতের সাগরে ডুব দিল' (আহমদ)। হজরত আনাস থেকে বর্ণিত রাসুল (সা.) বলেছেন, 'যে উত্তমরূপে অজু করে সওয়াবের উদ্দেশ্যে তার কোনো মুসলমান রুগ্ণ ভাইকে দেখতে যাবে, তাকে যাহান্নাম থেকে ৬০ বছরের পথ দূরে রাখা হবে' (আবু দাউদ)। অন্য হাদিসে হজরত আলী (রা.) বর্ণনা করেন, আমি রাসুলকে (সা.) বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি সকাল বেলা কোনো অসুস্থ মুসলমানকে দেখতে যায়, সত্তর হাজার ফেরেশতা বিকেল পর্যন্ত তার জন্য দোয়া করতে থাকে। আর বিকেলে রোগী দেখতে গেলে সকাল পর্যন্ত সত্তর হাজার ফেরেশতা দোয়া করে (সুনানে তিরমিজি :৯৬৭)। এখানে প্রশ্ন জাগতে পারে, টাকার বিনিময়ে যারা রোগীর সেবা করেন তারাও কি পুরস্কৃত হবে? হ্যাঁ, নিয়তের বিশুদ্ধতা থাকলে ইবাদতের নিয়তে রোগীর যথাযথ সেবা করলে তারাও উত্তম প্রতিদান পাবে। রাসুল (সা.) বলেছেন, 'অসুস্থ ব্যক্তির শয্যাপাশে হাজির হও এবং তার দ্বারা দোয়া করাও। কারণ অসুস্থ ব্যক্তির দোয়া কবুল হয় এবং তার গোনাহ মাফ হয়ে যায়' (তবরানি)। পক্ষান্তরে কোনো রোগী অসন্তুষ্ট হয়ে বদদোয়া করলে তা আল্লাহর দরবারে কবুল হয়ে যায়। কারণ হাদিসে এসেছে, 'আল্লাহর দরবারে রোগীর দোয়া ফেরেশতাদের দোয়ার মতো কবুল হয়ে যায়।' (ইবনে মাজাহ)।
আমরা ইসলামকে গুটিকয়েক ইবাদতের মধ্যে সীমাবদ্ধ করেছি। জনসেবামূলক কাজে রাসুল (সা.) এর অবদান তুলে ধরা হচ্ছে না। প্রতিবেশী বা সমাজের কেউ অসুস্থ হলে আমরা তাদের খোঁজ-খবর নিই না। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে চিকিৎসক এবং বিভিন্ন পর্যায়ের সেবাকর্মীরাও রোগীর প্রতি অবহেলা করেন। তারা চিকিৎসার যথাযথ পদক্ষেপ নেয় না। এসবই ইসলামের দৃষ্টিতে অগ্রহণযোগ্য। তাই পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজন এবং বন্ধু-বান্ধবদের কেউ অসুস্থ হলে তার খোঁজ-খবর নেওয়া সবার দায়িত্ব। শুধু নামাজের জন্য দাওয়াতি কাজ করলেই চলবে না এর পাশাপাশি সমাজের সর্বস্তরে বিশেষ করে ডাক্তার, নার্সসহ স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিত সংশ্নিষ্টদের মধ্যে রোগীর সেবার গুরুত্ব, ফজিলত এবং রোগীদের অধিকারের ব্যাপারে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। অসুস্থদের সেবায় বিশেষ মনোযোগী হওয়া দরকার স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিতদের বিশেষ করে ডাক্তার, নার্সসহ আরও যারা এ ক্ষেত্রকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছে। মহান আল্লাহ আমাদের ভালোবেসে সৃষ্টি করেছেন। অসুস্থ মানুষের দিকে সাহায্যের হাত বাড়ালে আল্লাহ খুশি হন। আসুন আমরা অসুস্থ মানুষকে সেবা করি। অসহায়দের যথাযথ চিকিৎসার ব্যবস্থা করি। আমিন।
ইসলামী গবেষক
daiyanjess@gmail.com
