হিমালয়ে বাঁধের ভাঙন, তিস্তায় ধেয়ে আসা বিপদ
দুর্যোগ
সিকিমের সবচেয়ে বড় জলবিদ্যুৎ বাঁধ চুংথাং বাঁধ তলিয়ে গিয়ে যে ধ্বংসযজ্ঞের উদাহরণ তৈরি করেছে, সেটা অপ্রত্যাশিত কিছু নয়। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য বিপদের ইঙ্গিত রয়েছে এতে। হিমালয়ের হ্রদ উপচানো বিপুল জলরাশি তিস্তা নদী ধরে বিপুল শক্তিতে বাঁধ ভেঙে-চুরে, জনপদ ডুবিয়ে, সড়ক বিনাশ করে নিচের দিকে নেমে আসছে। এবং নিচের দিকেই রয়েছে বাংলাদেশের তিস্তা নদীবর্তী কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর ও গাইবান্ধা। ইতোমধ্যে পানি উন্নয়ন বোর্ড বিজ্ঞপ্তি দিয়ে এই পাঁচটি জেলার তিস্তা তীরবর্তী এলাকা প্লাবিত হওয়ার হুঁশিয়ারি জানিয়েছে।
একটা নির্দিষ্ট অঞ্চলের ভৌগোলিক প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন করলে পরিণতি কী হতে পারে, সেটা আবারও প্রমাণ করেছে এ ঘটনা। এ ধরনের অপরিণামদর্শী উন্নয়ন প্রকল্পের ধ্বংসযজ্ঞ শুধু একটা নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমারেখায় আটকে থাকে না। ভাটির দেশ হিসেবে বাংলাদেশের তিস্তা অংশে ইতোমধ্যে পানির উচ্চতা বৃদ্ধি শুরু হয়েছে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে একটা প্রলয়ঙ্করী বন্যার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। প্রয়োজনের সময় পানির ন্যায্য হিস্যা না পাওয়া বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে ভারতের অপ্রয়োজনীয় অতিরিক্ত পানির ধকল সয়ে যাচ্ছে বন্যার আকারে।
হিমালয় অঞ্চলকে বলা হয় এশিয়ার সুপেয় পানির ‘সেভিংস অ্যাকাউন্ট’; যার ওপর নির্ভর করে আছে এ অঞ্চলের সব প্রধানতম নদী এবং সেগুলোর দু’পাশে বসবাসরত ১০০ কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা, সেচ ব্যবস্থা, কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা। হাজার বছর ধরে হিমালয়ের পানিবাহিত পলি দিয়ে গড়ে উঠেছিল সিন্ধু সভ্যতার ভিত। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ব-দ্বীপ বাংলাদেশের তলিয়ে যাওয়ার যে আশঙ্কা, সেটা থেকে আমাদের আপাত রক্ষা করে যাচ্ছে ব্রহ্মপুত্র ও গঙ্গা থেকে বয়ে আসা পলিমাটি, যা এ ব-দ্বীপের আয়তন ও উচ্চতা ক্রমে বাড়িয়ে চলেছে। পানি আর পলির বিশাল ভান্ডার এ ব-দ্বীপ শুষ্ক মৌসুমে মরূকরণের শিকার হচ্ছে এবং বর্ষায় ডুবছে উজানের বৃহৎ শক্তিধর দেশগুলোর প্রকৃতিবিনাশী প্রকল্পে।
তিন-চার দশক ধরে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত ও বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবে হিমালয়ের হিমবাহ গলছে অস্বাভাবিকভাবে। তবে সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে ভারত, চীন ও পাকিস্তানের উচ্চাভিলাষী জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ঘিরে। এমনকি ভারতের সহযোগিতায় ভুটানও তার ওয়াংচু নদীতে ৯০ মিটার উচ্চতার বাঁধ তৈরি করছে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য, যেটা তালা প্রজেক্ট নামে পরিচিত। হিমালয় অঞ্চল এখন শত শত বাঁধ নির্মাণের কর্মযজ্ঞে মুখর। বাঁধ নির্মাণের প্রবণতা এতটাই বেড়েছে যে, একে বলা হচ্ছে পৃথিবীর সর্বাধিক বাঁধবিশিষ্ট অঞ্চল।
হিমালয় অঞ্চলে এসব বাঁধ নির্মাণের সময় প্রকৌশলীরা নদীর পানিপ্রবাহের অতীতকে বিবেচনায় নেন এবং অতীত পানিপ্রবাহের আলোকে একটা নির্দিষ্ট প্রবাহ হিসাবে ধরে পরিকল্পনা করা হয় এসব বৃহৎ বাঁধের। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে হিমালয় অঞ্চলের যে অস্বাভাবিক খরা ও অতিপ্রবণ বৃষ্টি, সেটাকে বিবেচনায় নেওয়া হয় না।
ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউনটেইন ডেভেলপমেন্ট বলছে, আগামী সাত থেকে আট দশকের মধ্যে হিমালয় অঞ্চলের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাবে ৩ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ফলে এ অঞ্চলে বৃষ্টিপাত বেড়ে যাবে। এই বাড়তি বৃষ্টিপাতের ধকল এসব বাঁধ নিতে পারবে না। ফলে ভবিষ্যতের জন্য এক ভয়াবহ দুর্যোগের আশঙ্কা করছে তারা। চুংথাং বাঁধের তলিয়ে যাওয়া সে পূর্বাভাসের প্রায়োগিক উদাহরণ।
ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি এপিজে আবদুল কালাম একবার বলেছিলেন, ভারতের এক অঞ্চলে পানির প্রাচুর্য, অন্য অঞ্চলে খরা। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় একটা পথ হতে পারে পানিসম্পদে সমৃদ্ধ অঞ্চল থেকে পানিশূন্য অঞ্চলের মধ্যে একটা সংযোগ তৈরি করা। ভারত সে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে চলেছে। এর মধ্যে ভারতের শিল্পোৎপাদন বেড়েছে। সঙ্গে বেড়েছে তার বিদ্যুতের চাহিদা। সে চাহিদা মেটাতে এখন সিকিম, আসাম, অরুণাচল, হিমাচলের মতো পর্বতসমৃদ্ধ প্রদেশে বাঁধ তৈরির হিড়িক পড়েছে।
ব্রহ্মপুত্র, ইন্দুস আর গঙ্গা– এ তিন নদীর অববাহিকায় বাঁধ তৈরি করে ১ লাখ ১৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে চায় ভারত। আন্তঃনদীর জন্য আন্তর্জাতিক আইনের তোয়াক্কা করছে না উজানের কোনো দেশ। ফ্রান্স যখন লেক লেনাসে বাঁধ দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে চাইল, তখন ভাটির দেশ স্পেনের কড়া অবস্থানের কারণে সেটা থেকে তারা সরে আসে। একইভাবে পোল্যান্ড ও ফিনল্যান্ডের আপত্তিতে জার্মানি ও নরওয়ে তাদের বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়েছিল। আমরা কখনও সে ধরনের অবস্থান নিইনি। দুর্বল অবস্থানের কারণে আমরা পানির ন্যায্য হিস্যা আদায় করতে পারিনি।
পুলিৎজার সেন্টারের রিপোর্ট জানাচ্ছে, সিকিমের মুখ্যমন্ত্রী ইতোমধ্যে আরও ডজনখানেক বাঁধ নির্মাণে সম্মতি দিয়েছেন। হিমালয়ের মতো এমন অনন্য বৈশিষ্ট্যের বাস্তুতন্ত্র এসব বাঁধ নির্মাণে কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হবে– সেটার কোনো ধরনের পরিবেশগত প্রভাবের সমীক্ষা ছাড়াই এগিয়ে যাচ্ছে এসব বাঁধ নির্মাণের কাজ। বৃহৎ করপোরেশনের স্বার্থে তৈরি হওয়া এসব বাঁধের বিরুদ্ধে জেগে উঠছে সিকিমের ক্ষতিগ্রস্তরা। তাদের আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল– ছেঁড়া শার্টের পরিবর্তে তাদের পরিধানে উঠবে দামি স্যুট। অথচ বাঁধ নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার পর দেখা গেল, ৯০ শতাংশ শ্রমিক এলো সিকিমের বাইরে থেকে। ঠিক একই ঘটনা দেখি আমরা আমাদের কক্সবাজারের মহেশখালীর মাতারবাড়ীতে, যেখানে জাপান সরকারের সহায়তায় গড়ে তোলা হয়েছে ১২শ মেগাওয়াটের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। স্থানীয়দের বলা হয়েছিল, তাদের কাজ মিলবে, জীবনে সমৃদ্ধি আসবে। এ বিদ্যুৎকেন্দ্র ইতোমধ্যে উৎপাদনে চলে আসছে। কিন্তু যাদের জমির ওপর এ বিদ্যুৎকেন্দ্র গড়ে উঠেছে, তাদের জীবন আজ দুর্বিষহ, অনিশ্চয়তায় ভরা। নদী, বন, পর্বতের ভূ-প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যকে পাল্টে দিলে সেটার আঘাত সরাসরি এসে পড়ে দরিদ্র ভূমিপুত্রদের ওপর। এসব বাঁধ নির্মাণের ফলে বাংলাদেশ যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, একইভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে অরুণাচল, হিমাচল, আসাম ও সিকিমের খেটে খাওয়া মানুষ। এসব ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টা না থাকলে হিমালয় অঞ্চলে যে ধ্বংসযজ্ঞের মহড়া চলছে, সেটা থামানো যাবে না। মোস্তফা ইউসুফ: সাংবাদিক ও পরিবেশ বিষয়ক প্রতিবেদক
