যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ ও আলোচনা দুটিই চালাবে ইরান
সমকাল ডেস্ক
প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১০:৫৮
ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো আলোচনা শুরুর আগে ইরানকে ‘শত্রুকে পেছনে ঠেলে দিতে হবে এবং নিজেদের পূর্ণ সামরিক শক্তি ব্যবহার করে বিধ্বংসী আঘাত হানতে হবে’। পাশাপাশি তিনি বলেছেন, যুদ্ধ ও আলোচনা দুটিই চালিয়ে যেতে হবে। বর্তমান পরিস্থিতি সেদিকেই ইঙ্গিত করছে। তেহরানের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা মোহসেন রেজায়ি আলজাজিরাকে বলেছেন, কাতারের মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের হোয়াইট হাউসের কাছে আলোচনা পুনরায় শুরুর জন্য ইরানের শর্তগুলো জানানো হয়েছে। রেজায়ির দেওয়া তথ্যানুসারে, ইরানের জানানো দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে সব ফ্রন্টে যুদ্ধের অবসান, ইরানের জব্দ করা সম্পদ ছেড়ে দেওয়া এবং দেশটির বন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ তুলে নেওয়া।
এদিকে, আলোচনা শুরুর এসব শর্ত পৌঁছে দেওয়ার সময়টিতেই ভিন্ন আরেক বাস্তবতা ধরা দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র যদি মার্কিন ঘাঁটি ব্যবহার করে ইরানের ওপর বড় ধরনের হামলা আবার শুরু করে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে এর সঙ্গে জড়িত হিসেবে বিবেচনা করা হবে বলে সতর্ক করেছে ইরানের সামরিক সদরদপ্তর। খাতাম আল-আনবিয়া সামরিক সদরদপ্তর এক বিবৃতিতে বলেছে, “আমরা সতর্ক করে দিচ্ছি, যদি এই অঞ্চলের দেশগুলো ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের প্রতি তাদের দ্বৈত নীতি অব্যাহত রেখে শক্তিশালী ও সার্বভৌম ইরানের বিরুদ্ধে ‘বড় শয়তানের’ আগ্রাসনের সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করে, তাহলে তাদের সবাইকে এই অপকর্মের সহযোগী হিসেবে বিবেচনা করা হবে। এর পর তারা ইরানের শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনীর কাছ থেকে কোনো সংযম বা সৌজন্য আশা করতে পারবে না।”
হামলা হলে মার্কিন স্বার্থে পাল্টা আঘাতের হুমকি
ইরানের কেন্দ্রীয় সামরিক কমান্ড সতর্ক করে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র কোনো হামলা চালালে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন ঘাঁটি ও স্বার্থের বিরুদ্ধে ‘কোনো সীমাবদ্ধতা বা বিবেচনা ছাড়াই’ পাল্টা হামলা চালাবে তারা। দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে এ খবর। ইরানের খাতাম আল-আনবিয়া সামরিক সদরদপ্তর রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘যে কোনো ভুলের পরিণতি হবে বেদনাদায়ক হামলা।’ বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, সাজানো ও মিথ্যা তথ্যের ভিত্তিতে শুরু হওয়া এবং প্রতারণা ও কৌশলের মাধ্যমে চালিয়ে যাওয়া একটি যুদ্ধে নিজেদের ব্যর্থতা আড়াল ও কৃত্রিম সাফল্য অর্জনের চেষ্টা করছে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল। আবারও ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা। ইউরোপের একটি দেশে অনুষ্ঠিত যৌথ বৈঠকে কয়েকটি আঞ্চলিক দেশের সবুজ সংকেত পাওয়ার পর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।’
এদিকে, যে হরমুজ প্রণালির কারণে এত গন্ডগোল, এ-সংক্রান্ত অবস্থান আবারও স্পষ্ট করেছে ইরান। ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ আবারও হরমুজ প্রণালি নিয়ে তেহরানের অবস্থান জানিয়ে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র তাদের স্বাক্ষরিত প্রতিশ্রুতিগুলো পূরণ না করা পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ বন্ধ থাকবে।
যুক্তরাষ্ট্রের সেনা নিহতের সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক
খ্যাতনামা মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট গত শুক্রবার জানিয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধে মার্কিন সেনা নিহতের যে সংখ্যা পেন্টাগন প্রকাশ করেছে, তাতে গরমিল আছে। প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে বেশি। পাঁচজন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে ওয়াশিংটন পোস্ট জানায়, অন্তত ২২ মার্কিন সামরিক সদস্য নিহত হয়েছেন। পেন্টাগনের ডেটাবেজে থাকা সংখ্যার তুলনায় চারজন বেশি মারা গেছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যমটি আরও জানায়, গোপন রাখা সব মৃত্যুই সরাসরি কয়েক মাস ধরে চলা এই সংঘাতের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। এর মধ্যে এমন কয়েকজন মার্কিন সামরিক সদস্যও ছিলেন, যারা চলমান সংঘাতের সময় পশ্চিম এশিয়ায় অবস্থান করছিলেন।
তবে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এই প্রতিবেদন অস্বীকার করেছেন। সামাজিক মাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে এই প্রতিবেদনকে ‘সম্পূর্ণ মিথ্যা’ বলে অভিহিত করেছেন তিনি। ওয়াশিংটন পোস্ট প্রতিবেদনে বলছে, হতাহতের সংখ্যা নিয়ে হিসাবের এই পার্থক্য সম্পর্কে করা প্রশ্নের জবাব দিতে পেন্টাগন অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
ফরাসি ভাষা শিক্ষাকেন্দ্র বন্ধ ইরানে
ইরানের কর্তৃপক্ষ গতকাল রোববার দেশটিতে ফরাসি দূতাবাসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি ফরাসি ভাষা শিক্ষাকেন্দ্র বন্ধ করে দিয়েছে। কেন্দ্রটি ‘অবৈধ কর্মকাণ্ডে’ জড়িত ছিল বলে অভিযোগ করেছে তারা। সংবাদমাধ্যম মিজান নিউজ জানিয়েছে, তেহরানের প্রসিকিউটর কার্যালয়ের নির্দেশে ফরাসি দূতাবাসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ওই ‘অবৈধ কেন্দ্র’ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ফরাসি ভাষা শিক্ষাকেন্দ্রটি বহু বছর ধরে ভাষা শেখানোর আড়ালে কার্যক্রম চালিয়ে আসছিল বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
তাদের দাবি, কেন্দ্রটি ‘ভাষা প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিজেদের অবস্থানের অপব্যবহার’ করেছে। পাশাপাশি দেশটির প্রভাবশালী ব্যক্তিদের শনাক্ত করা, তাদের মধ্যে নেটওয়ার্ক তৈরি করা এবং তাদের দেশ ছাড়ার প্রক্রিয়ায় সহায়তা করার চেষ্টা করেছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। ফরাসি দূতাবাসের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করা হয়নি।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে তেহরান ও প্যারিসের সম্পর্কের টানাপোড়েন বেড়েছে। গত মাসে ফ্রান্স দুই ইরানি কূটনীতিককে বহিষ্কারের ঘোষণা দেয়। এর আগে ইরানে দুই ফরাসি কূটনীতিককে স্বল্প সময়ের জন্য আটক এবং দেশটি থেকে নিষিদ্ধ করার প্রতিক্রিয়ায় ফ্রান্স ওই পদক্ষেপ নেয়।
- বিষয় :
- ইরান
- যুক্তরাষ্ট্র