এক বছরে সন্দেহভাজন নৌযানে যুক্তরাষ্ট্রের ৬৮ হামলা, নিহত ২২৩
ক্যারিবীয় সাগরে সন্দেহভাজন মাদক পাচারকারী নৌকায় মার্কিন সামরিক বাহিনীর চালানো অভিযানের সময় বিস্ফোরণ ঘটছে। ছবি: রয়টার্স
আল–জাজিরা
প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১১:৪২ | আপডেট: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১২:০৬
গত এক বছরে ক্যারিবীয় সাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরে মাদক পাচারে সন্দেহভাজন নৌযানে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী ৬৮টি হামলা চালিয়েছে। এসব হামলায় অন্তত ২২৩ জন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ। জাতিসংঘের এক মানবাধিকার বিশেষজ্ঞের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব হামলা আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের শামিল হতে পারে।
সোমবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে মানবাধিকার ও সন্ত্রাসবাদ দমনবিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ র্যাপোর্টিয়ার বেন সল জানিয়েছেন, সেপ্টেম্বর ২০২৫ থেকে চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত আন্তর্জাতিক জলসীমায় সন্দেহভাজন মাদকবাহী নৌযানগুলোতে এসব হামলা চালানো হয়।
যুক্তরাষ্ট্র এসব হামলাকে ‘মাদক-সন্ত্রাসীদের’ (নারকো-টেররিস্ট) বিরুদ্ধে আত্মরক্ষামূলক পদক্ষেপ হিসেবে দাবি করেছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কংগ্রেসকে জানিয়েছেন, অভিযানগুলো নির্দিষ্ট কিছু ‘সন্ত্রাসী’ সংগঠনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সশস্ত্র সংঘাতের পরিস্থিতির অংশ। তবে জাতিসংঘের প্রতিবেদনে এই ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলাগুলো আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী, জীবনের অধিকার লঙ্ঘন করে এবং সম্ভবত মানবতাবিরোধী অপরাধের শামিল।
ক্যারিবীয় সাগরে একটি নৌযানে হামলা চালিয়ে চারজনকে হত্যার কথা মার্কিন সেনাবাহিনী ঘোষণার দুই দিন পর প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হলো। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন ওই হামলার নিন্দা জানিয়েছে এবং হত্যাকাণ্ডগুলোকে বিচারবহির্ভূত হিসেবে অভিহিত করেছে। পেন্টাগন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হামলার ভিডিও প্রকাশ করলেও নিহত ব্যক্তিরা কারা ছিলেন বা মাদক পাচারের সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততার প্রমাণ কী—সে বিষয়ে খুব কম তথ্য প্রকাশ করেছে।
বেন সলের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কথিত মাদক পাচারের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষার অজুহাতে যুক্তরাষ্ট্রের বলপ্রয়োগের কোনো অধিকার নেই। মাদক পাচার এমন কোনো ‘সশস্ত্র আক্রমণ’-এর আইনি মানদণ্ড পূরণ করে না, যার ভিত্তিতে আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগ করা যেতে পারে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক আইন কোনো রাষ্ট্র কর্তৃক প্রেরিত অ-রাষ্ট্রীয় পক্ষের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষার অনুমতি দেয়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত কিছু গোষ্ঠী—যেমন ‘ট্রেন দে আরাগুয়া’—ভেনেজুয়েলা রাষ্ট্রের হয়ে সশস্ত্র প্রক্সি বা প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করছিল, এমন কোনো ‘বাস্তব ভিত্তি’ পাওয়া যায়নি।
প্রতিবেদনে প্রাণঘাতী নয় এমন বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগের কথাও বলা হয়েছে। এর মধ্যে সমুদ্রপথে সন্দেহভাজন নৌযান আটকে দেওয়া বা বাধা দেওয়ার মতো পদক্ষেপ রয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও নিজেও এমন পদ্ধতিকে কার্যকর পদক্ষেপ হিসেবে স্বীকার করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ কারণে যুক্তরাষ্ট্রের এসব হামলা ‘নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তি’র লঙ্ঘন। ওই চুক্তি অনুযায়ী, আসন্ন কোনো হুমকির মুখে চূড়ান্ত পদক্ষেপ বা শেষ উপায় হিসেবেই প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগের অনুমতি রয়েছে। প্রতিবেদনের দাবি, এসব হামলার ক্ষেত্রে সেই শর্ত মানা হয়নি।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, হত্যাকাণ্ডগুলো ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ’ হিসেবে হত্যার আইনি সংজ্ঞার আওতায় পড়তে পারে। কারণ, এগুলো একটি সুসংগঠিত রাষ্ট্রীয় নীতির অধীনে ‘পরিকল্পিত ও পদ্ধতিগতভাবে’ চালানো হয়েছে এবং বিপুলসংখ্যক মানুষের নিহত হওয়ার কারণে এর ব্যাপকতাও স্পষ্ট।
এসব হত্যাকাণ্ড তদন্ত, দায়ী ব্যক্তিদের—হামলার নির্দেশদাতা রাজনৈতিক ও সামরিক নেতাসহ—বিচারের আওতায় আনা এবং ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে প্রতিবেদনে।
হামলাগুলোর আইনি বৈধতা পর্যালোচনার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রে মাদক পাচার কমাতে এসব অভিযানের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন সীমান্তে কোকেন জব্দের হার অপরিবর্তিত রয়েছে। ওই অঞ্চলের কোকেনের বড় একটি অংশ কন্টেইনারবাহী জাহাজে পাচার হয়, যেগুলোতে খুব কমই তল্লাশি চালানো হয়। অথচ যুক্তরাষ্ট্র মূলত ছোট নৌযানগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ফেন্টানাইল ও ওপিওডের মতো মাদকের সমস্যা মোকাবিলায় এসব হামলার কোনো ভূমিকা নেই। যুক্তরাষ্ট্রে অতিরিক্ত মাত্রায় মাদক সেবনের কারণে মৃত্যুর প্রধান কারণ এসব মাদক, যা সাধারণত ভেনেজুয়েলা থেকে সমুদ্রপথে পাচার করা হয় না।
এতে বলা হয়েছে, নিচু সারির সন্দেহভাজনদের হত্যা করলে মাদক পাচারকারী চক্র বা কার্টেলের নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া এবং মূল হোতাদের বিচারের আওতায় আনার প্রচেষ্টা বরং ব্যাহত হতে পারে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, হিসাব অনুযায়ী ২০২৬ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত এসব সামরিক অভিযানে ৪৭০ কোটি (৪.৭ বিলিয়ন) মার্কিন ডলার ব্যয় হয়েছে। জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞের মতে, এই অর্থ প্রমাণভিত্তিক আইন প্রয়োগ, জনস্বাস্থ্য ও উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যয় করা যেত।
- বিষয় :
- হামলা
- নিহত
- যুক্তরাষ্ট্র
- ডোনাল্ড ট্রাম্প
- জাতিসংঘ