ঢাকা রোববার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বানে ভাসা চরাঞ্চলে জেগেছে আশা

বানে ভাসা চরাঞ্চলে জেগেছে আশা
×

লতিফুল ইসলাম, জামালপুর থেকে ফিরে

প্রকাশ: ১০ জুন ২০২২ | ১২:০০

বন্যায় বছরে পাঁচ-ছয়বার পানির নিচে তলিয়ে যায় বসতঘর। নদীভাঙনে প্রত্যহ খুঁজতে হয় নতুন ঠিকানা। আধুনিক যুগেও নেই শিক্ষা, চিকিৎসা ও যোগাযোগ ব্যবস্থা। এমন অনিশ্চিত জীবন কাটান কুড়িগ্রামের ব্রহ্মপুত্র ও জামালপুরের যমুনার চরাঞ্চলের মানুষেরা। তবে বসতভিটা উঁচু করে দেওয়ায় এবার বন্যায় আশা দেখছেন তাঁরা।
পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) সহায়তায় দুই জেলার চরাঞ্চলের মানুষের জীবনে এসেছে পরিবর্তন। অনেকের বাড়িঘর উঁচু করে দেওয়া হয়েছে। নলকূপ, স্যানিটেশন ব্যবস্থার সঙ্গে প্রশিক্ষণসহ উন্নত জাতের বীজ, হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগল ও মাছের পোনা দিয়ে উৎপাদনমুখী করে তোলা হচ্ছে। শিশুরা শিক্ষার আলো পাচ্ছে। যদিও এখনও এসব প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল বলে মনে করছেন সংশ্নিষ্টরা।
১৬ নদীর জেলা কুড়িগ্রামে ৪৫০টি চর। জেলা শহর থেকে ব্রহ্মপুত্র নদ রৌমারী ও রাজীবপুর উপজেলাকে আলাদা করেছে। রাজীবপুরের তিনটি ইউনিয়ন ব্রহ্মপুত্রের চরে। চিলমারীর তিনটি ইউনিয়ন ব্রহ্মপুত্র ও তিস্তার চরে। রাজীবপুর সদর থেকে উত্তর কোদালকাঠি (আদর্শপাড়া) নৌকায় যেতে লাগে দেড় ঘণ্টা। ব্রহ্মপুত্রের এ চরে নদীভাঙনে সব হারিয়ে বাস গেড়েছে ৪০০ পরিবার। প্রত্যেকেরই বাড়ি ৮-১০ বার নদীতে বিলীন হয়েছে।
চরের বাসিন্দা শহর আলী (৬০) জানান, ১৯৭২ সালে ভাঙনে সব হারিয়ে চলে যান দিনাজপুরে। ১৯৮৮ সালে পুরোনো বাড়ির জায়গায় চর জাগলে ফিরে আসেন। এরপর আরও ছয়বার ভাঙার ফলে আশ্রয় বদলে এখন থিঁতু কোদালকাঠিতে। চরে ভালো আবাদ হলেও বাড়িঘর ভেঙে যাওয়ায় কখনও টাকা জমাতে পারেননি তিনি।
একই অবস্থা চর পাখি উড়ার। পাঁচ-ছয় বছর বয়সী চরটির বাসিন্দাদের কেউই স্থায়ী নন। উদ্বাস্তু চরাঞ্চলের বাসিন্দারা নিজেরাই নাম দিয়েছেন রোহিঙ্গাপাড়া। বোরো ধান মাড়াই করতে করতে মুকুল মিয়া (৩৫) জানান, পাঁচ বিঘার মধ্যে তিনবারের বন্যায় প্রায় তিন বিঘার ধান নষ্ট হয়ে গেছে। সংসারের খরচ বাদে ৩৫ হাজার টাকা জমিয়েছেন তিনি। তবে এ টাকা উন্নত জীবনযাপনে নয়, নদী কখন তাঁকে কোথায় নিয়ে যায়, তারই প্রস্তুতির জন্য।
কোদালকাঠির বাসিন্দা রাবেয়া খাতুন বলেন, বছরে ৪-৫ বার বন্যা হয়। ১৫-২০ দিনও থাকে পানি। এনজিও ও সরকার বাড়িভিটা উঁচু করে দিয়েছে। খাবার পানির জন্য নলকূপ ও টয়লেট দিয়েছে। বন্যা হলে অন্তত নিজের বাড়িতে থাকতে পারবেন ভেবেই রাবেয়ার চোখেমুখে স্বস্তি। তবে শহিদা বেগম বলেন, অনেকেই তো সহায়তা পায়নি। চরে রাস্তা নেই। অসুস্থ হলে রাতে নদীতে নৌকা থাকে না। হাসপাতালে যাওয়ার আগেই রোগী আরও অসুস্থ হয়ে পড়ে।
রাজীবপুরের ইউএনও অমিত চক্রবর্তী বলেন, নদীভাঙন ঠেকাতে নদীর মূল গতিপথে উন্নত ড্রেজিং করা জরুরি। কিন্তু এ উপজেলার জনসংখ্যা কম হওয়ায় বরাদ্দ বেশি মেলে না।
রাজীবপুর উপজেলাঘেঁষে যমুনা নদীবিধৌত জামালপুর। এই জেলার ১২ উপজেলার ছয়টিই চরের মধ্যে। যমুনার চরের মধ্যে বিদ্যুৎ পৌঁছালেও অন্য কোনো নাগরিক সুবিধা নেই। বেলগাছা ইউনিয়নের শিলদহ গ্রামের দেড় হাজার মানুষের জন্য নেই কোনো কমিউনিটি ক্লিনিক। একটি প্রাইমারি স্কুল থাকলেও তা কেবল পরিদর্শক এলেই খোলেন শিক্ষকরা। এ চরের বাসিন্দারা জানান, চরের বাড়ি ও কর্মসংস্থানের চেয়ে জরুরি নদীশাসন। বাঁধ দিলে তাঁদের ভাগ্য বদলাবে।
বেলগাঁচা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল মালেক বলেন, পিকেএসএফের পক্ষ থেকে এবার চরের বাড়ি উঁচু করে দেওয়া হয়েছে। বন্যা হলেও বাড়িতে থাকতে পারব। তবে চরের মানুষের জন্য রাস্তা, বিদ্যালয় ও ক্লিনিক জরুরি।
সোসাইটি ফর সোস্যাল সার্ভিস এনজিওর পরিচালক কাজী নুরুল হক বলেন, পিকেএসএফের সহায়তায় ইসলামপুর ও মেলান্দহ উপজেলায় ৯১৫টি পরিবারকে বসতভিটা উঁচু করে দেওয়া হয়েছে। ছাগল কেনার জন্য প্রায় ১ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়েছে। উন্নত জাতের গম ও ধানের বীজ এবং প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। কয়েক বছরের মধ্যেই চরাঞ্চলের মানুষের জীবন বদলে যাবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. তানভীর হাসান বলেন, চরের মানুষের জন্য ৪০টি উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ চলছে। আশ্রয়কেন্দ্র, গুচ্ছগ্রাম নির্মাণ ছাড়াও গরু-ছাগল বিতরণ করা হয়েছে। তবে সমস্যার স্থায়ী সমাধানে দরকার নদীশাসন।
পিকেএসএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. নমিতা হালদার বলেন, জামালপুর ও কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলে সরকারি কোনো সেবা নেই। নেই কোনো অবকাঠামো। গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড ও অ্যাডাপ্টেশন ফান্ড থেকে পিকেএসএফ বিভিন্ন এনজিওর মাধ্যমে চরাঞ্চলের বসতভিটা উঁচু করে দিচ্ছে। নলকূপ, টয়লেটের ব্যবস্থা ছাড়াও চরাঞ্চলের মানুষকে পশুপালন ও কৃষিতে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করছে। এ ছাড়া সারাদেশে নিবন্ধিত এনজিওর সঙ্গে অংশীদারির ভিত্তিতে চরাঞ্চলের দারিদ্র্য বিমোচনে আমরা নিরলস কাজ করছি।
অর্থনীতি সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক আইনুল ইসলাম বলেন, চরাঞ্চলের মানুষের জন্য সামাজিক সুরক্ষার কর্মসূচির আওতায় বিভিন্ন ধরনের প্রকল্প হাতে নেওয়া উচিত। একই সঙ্গে এ সব প্রকল্প তাদের জীবনমানের উন্নতিতে ভূমিকা রাখছে কিনা তা নিয়মিত তদারক করতে হবে। তাদের উৎপাদিত পণ্য যাতে শহরে সহজে পৌঁছে তার ব্যবস্থা করতে হবে।
জামালপুর জেলা প্রশাসক মুর্শেদা জামান বলেন, জামালপুরের কয়েকটি উপজেলা যমুনার ভাঙনের শিকার হয়। এসব অঞ্চলে পিকেএসএফের সহায়তায় এনজিওগুলো এগিয়ে এসেছে। বাকিদেরও এগিয়ে আসা দরকার।

আরও পড়ুন

×