অভাবের কুঁড়েঘর থেকে বিচারকের আসনে, ইতিহাস গড়লেন ‘তুরি’ নৃগোষ্ঠীর কাজল
চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৭:৪৫
পেটে ক্ষুধা, বাবার মাথায় এনজিওর কিস্তির বোঝা আর বাবার দিনমজুরি এমন চরম বাস্তবতা প্রতিদিন চোখ রাঙাত নৃগোষ্ঠীর কাজল পাড়ের সামনে। তাইতো তিনি নিজেও এই লেখাপড়াকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়ে অর্থ ইনকামের জন্য টিউশনি করাসহ বিভিন্ন কাজে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেন। অভাব অনটনের মধ্যেই নিজেকে করে তোলেন যোগ্য শিক্ষার্থী হিসেবে। অভাবের সেই অন্ধকারকে দূরে ঠেলে প্রত্যন্ত একটি গ্রামে ইতিহাস গড়েছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার কাজল পাঁড়ে। ১৮তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (বিজেএস) পরীক্ষায় সহকারী জজ হিসেবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন তিনি।
কাজলের এই জয়ে প্রায় দুই যুগেরও আগে গড়ে ওঠা পার্বতীপুর ইউনিয়নের মাধাইপুর গ্রামের দীর্ঘদিনের অন্ধকার কাটল। কারণ, গ্রামটিতে এতদিন কোনো সরকারি চাকরিজীবী ছিলেন না; সেই খরা কাটিয়ে প্রথম সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে বিচারকের আসনেই বসতে যাচ্ছেন অদম্য এই তরুণ। এ জন্য গ্রামবাসীও খুব খুশি, কাজলকে ফুলের মালা দিয়ে বরণ করে নিচ্ছেন তারা।
জানা গেছে, মাধাইপুর গ্রামের ‘তুরি’ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভূমিহীন কৃষক নরেশ পাঁড়ে ও পঞ্চমী জেড়ি দম্পতির একমাত্র ছেলে কাজল। অভাবের তাড়নায় তার তিন বোনের পড়াশোনা প্রাথমিকে পৌঁছানোর আগেই থেমে গিয়েছিল, অল্প বয়সেই দিতে হয়েছিল বিয়ে। অনেক দিন এমনও কেটেছে-ঘরে খাবার না থাকায় না খেয়েই স্কুলে গিয়েছেন কাজল। ভূমিহীন কৃষক পরিবারের একমাত্র সন্তান কাজলের পথচলা সহজ ছিল না।
কাজলের শিক্ষাজীবন শুরু করেছিল স্থানীয় মাধাইপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকেই। এরপর মিশন স্কুল, এনায়েতপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও রহনপুর ইউসুফ আলী কলেজে থেকে প্রাথমিক থেকে শুরু করে উচ্চ মাধ্যমিকে লেখাপড়া শেষ করেন। এরপরই উচ্চশিক্ষার যুদ্ধে নামেন তিনি। প্রথমবার হোঁচট খেলেও দ্বিতীয়বারে বাজিমাত করে একযোগে জগ্ননাথ বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পান। ভর্তি হন রাবির আইন বিভাগে।
ছেলের পড়ার খরচ যোগাতে বাবা নরেশ পাঁড়েকে নামতে হয়েছে কঠিন লড়াইয়ে। এনজিওর কিস্তি তোলা থেকে শুরু করে বাড়িতে গরু বিক্রিসবই করেছেন। মানুষের দয়া না চেয়ে স্থানীয় চেয়ারম্যান-মেম্বারদের কাছে গিয়ে কাজের বিনিময়ে টাকা (কাবিটা) কর্মসূচির কঠোর শ্রমিকের কাজ বেছে নেন, সেই মজুরির টাকায় ছেলের শিক্ষার আলো জ্বালিয়ে রাখেন। অন্যদিকে, কাজলও ক্যাম্পাসে টিউশনি করে নিজের খরচ চালিয়েছেন, কিন্তু তা যথেষ্ট ছিল না। অবশেষে ১৮তম বিজেএস অর্জন করে সব কষ্টের হিসাব চুকিয়েছেন কাজল।
জেলার গোমস্তাপুরের মাধাইপুর গ্রামের ‘তুরি’ নৃগোষ্ঠীর সন্তান কাজল পাঁড়ে আজ এক অনন্য দৃষ্টান্ত। গত ২২ বছরে সরকারি চাকরি না পাওয়া প্রত্যন্ত এই গ্রামের অতি দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে এসে তিনি ১৮তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (বিজেএস) পরীক্ষায় ২০০ জনের মধ্যে ১৪০তম স্থান অর্জন করে সহকারী জজ হিসেবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন। তার এই অর্জনে পুরো গ্রামে বইছে আনন্দের জোয়ার।
গ্রামবাসীরাও তাই খুশি। যোগ্য সন্তানকে তারা উৎসবের আমেজে ঘরে তুলে নিয়েছেন। তাদের ভাষ্য, মেধাবী কাজলের অদম্য ইচ্ছে আর সাহসীকতার কারণেই তিনি যোগ্যস্থানে পৌঁছাতে পেরেছেন।
২০১৭ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই কাজলের মনে বিচার বিভাগে যোগ দেওয়ার স্বপ্ন দানা বাঁধে। এরপরের আট বছরে অভাব, হতাশা ও অনিশ্চয়তা গ্রাস করলেও তিনি নিজের লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হননি। বুধবার সন্ধ্যায় বন্ধুর মাধ্যমে এবং পরে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের ওয়েবসাইটে ফলাফল দেখে তিনি চূড়ান্ত সাফল্যের খবর পান। রাজশাহী থেকে গ্রামে ফিরলে তাকে ফুলের মালা দিয়ে বরণ করে নেন গ্রামবাসী।
কাজল পাড়ে বলেন, বিচার বিভাগে যাওয়ার স্বপ্ন পূরণের এই মুহূর্তে তার মনে পড়ছে দীর্ঘ সংগ্রামের দিনগুলো। পড়াশোনার পথে পরিবারের ত্যাগ, নিজের পরিশ্রম আর নানা হতাশার মধ্যেও এগিয়ে যাওয়ার স্মৃতিই এখন তার কাছে সবচেয়ে বেশি মনে পড়ছে।
ছেলের সাফল্যে আবেগাপ্লুত বাবা নরেশ পাণ্ডে ও মা পঞ্চমী জেড়ি। দীর্ঘদিনের কষ্ট যেন সন্তানের এই অর্জনে কিছুটা হলেও সার্থক হয়েছে তাদের কাছে।
জানতে চাইলে ছেলে জজ হওয়ায় চোখের জল ধরে রাখতে পারছেন না মা পঞ্চমী জেড়ি। তিনি বলেন, ছেলে চরম কষ্ট করে বড় হবার স্বপ্ন দেখেছিল, তা পূরণ হয়েছে। আর বাবা নরেশের প্রত্যাশা, ছেলে বড় হয়ে শুধু নিজের পরিবারের জন্য নয়, দরিদ্র ও অসহায় মানুষের জন্যও কাজ করবেন।
গ্রামের প্রবীণ জারাধন পাণ্ডে বলেন, তাদের সম্প্রদায়ের কেউ এর আগে এমন জায়গায় পৌঁছাতে পারেননি। কাজলের সাফল্যের খবর শুনে আনন্দে কেঁদে ফেলেন তিনিও।
মাধাইপুর গ্রামের প্রধান নিরঞ্জন তিরকি বলেন, কাজলের অর্জন শুধু তার পরিবারের নয়, পুরো এলাকার জন্য গর্বের। প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি যে জায়গায় পৌঁছেছেন, তা এলাকার শিশু-কিশোরদের পড়াশোনায় আগ্রহী করবে এবং তাদের বড় স্বপ্ন দেখতে সাহস জোগাবে।
স্থানীয় পার্বতীপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোজাম্মেল হোসেনও কাজলের সাফল্যে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। তার ভাষ্য, পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য না থাকলেও মেধা, অধ্যবসায় ও কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে কাজল সহকারী জজ হওয়ার পর্যায়ে পৌঁছেছেন। তার এই অর্জন এলাকার অন্য তরুণদের জন্যও অনুপ্রেরণার।
জাতীয় আদিবাসী পরিষদের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক বিভূতিভূষণ মাহাতোর দাবি, তুরি সম্প্রদায়ের মধ্যে মেধার ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া প্রথম ব্যক্তি কাজল। তার ভাষ্য, উত্তরবঙ্গের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্য থেকেও বিচার বিভাগে সুপারিশ পাওয়ার ক্ষেত্রে কাজলের অর্জন বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
তার সাফল্যে স্কুলের শিক্ষকও খুশি। দিয়েছেন দোয়াও। মাঁধাইপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. সাজ্জাদ আলী বলেন, দারিদ্র্যকে হারিয়ে কাজল পাঁড়ে আজ পুরো মাধাইপুর গ্রামের গর্ব। তার সাফল্য প্রমাণ করে—অদম্য ইচ্ছাশক্তির কাছে কোনো বাধাই বড় নয়।
- বিষয় :
- চাঁপাইনবাবগঞ্জ