যেখানে মাছ আর মিষ্টি কিনতে ভিড় করে মানুষ
পোড়াদহের মেলায় ওঠে বিভিন্ন ধরনের মাছ- সমকাল
বগুড়া ব্যুরো
প্রকাশ: ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ | ১৫:৩২ | আপডেট: ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ | ১৫:৫৫
সারাদেশে বুধবার পহেলা ফাল্গুন উদযাপিত হলেও সনাতনী পঞ্জিকা মতে তা ছিল মাঘের শেষ দিন। প্রতি বছর মাঘ মাসের শেষ বুধবারই বগুড়ায় বসে ঐতিহ্যবাহী পোড়াদহের মেলা। এই মেলার প্রধান আকর্ষণ হচ্ছে বিশালাকার সব মাছ আর সুস্বাদু মিষ্টি। অনেক মানুষই মেলা থেকে মাছ ও মিষ্টি কেনেন। এমনকি অনেকে শুধু বিশালাকার মাছ ও মিষ্টি দেখার জন্য হলেও মেলায় আসেন। বুধবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। শহর থেকে প্রায় ১৪ কিলোমিটার দূরে এই প্রাচীন মেলায় শুধু বগুড়াই নয়, আশপাশের কয়েক জেলার মানুষ ভিড় জমান। মেলায় মাছ ও মিষ্টি ছাড়াও বিভিন্ন আসবাবেরও জমজমাট কেনাবেচা হয়ে থাকে।

কথিত আছে, প্রায় দেড়শ' বছর আগে পোড়াদহ এলাকায় এক হিন্দু সন্ন্যাসী আশ্রয় নেন। তিনি একটি মরা বটগাছের নিচে বসে সাধনা শুরু করেন। দীর্ঘ সাধনার পর ওই বটগাছটি আবারও প্রাণ ফিরে পায়। সেই সন্ন্যাসীর স্মরণেই পোড়াদহের মেলার আয়োজন করা হয়ে থাকে। একই কারণে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা একে সন্ন্যাস মেলা নামে ডেকে থাকেন। বোরো আবাদের কারণে এবার স্থান পরিবর্তন করা হয়েছে। বরেণ্য কথাসাহিত্যিক আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের বিখ্যাত উপন্যাস 'খোয়াবনামা'য় উল্লিখিত কাতলাহার বিলের পাশের নিচু জমিতে এবার বসেছে মেলা। স্থান পরিবর্তন করা হলেও এই মেলায় মানুষের সমাগম কম হয়নি।
মেলায় এবার সবচেয়ে বড় মাছটি ছিল বাঘাইড়। যার ওজন ছিল ৭০ কেজি। মেলার পাশের গোলাবাড়ি এলাকার বিফল মণ্ডল কয়েকদিন আগে বগুড়ার সারিয়াকান্দির যমুনা নদী থেকে মাছটি ধরেন। কয়েকদিন জিইয়ে রেখে বুধবার মেলায় আনেন মাছটি। প্রতি কেজি দেড় হাজার টাকা হিসেবে তিনি মাছটির দাম চান এক লাখ ৫ হাজার টাকা। তবে দুপুর পর্যন্ত কেউ না কেনায় তিনি মাছটি কেটে বিক্রি করেন। তবে তার পাশের দোকানে শরফাত আলীর নিয়ে আসা ৪০ কেজি ওজনের বাঘাইড় মাছটি ৪৬ হাজার টাকায় কিনেছেন নওগাঁর ব্যবসায়ী মোশারফ হোসেন। বাঘাইড়ের পাশাপাশি রুই, কাতলা, মৃগেল, ব্রিগেড, চিতল, সিলভার কার্প এবং বোয়ালসহ অর্ধশত প্রজাতির মাছ কেনাবেচা হয়েছে মেলায়। সাইজ অনুযায়ী প্রতি কেজি রুই ২০০ থেকে ২৫০ টাকা, কাতলা ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা, ব্রিগেড ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা ও বোয়াল মাছ বিক্রি হয়েছে ৮০০ থেকে এক হাজার টাকায়।

মেলায় এবারও মাছ আকৃতির ছয় কেজি ওজনের 'রুই মিষ্টি' তৈরি করেন গাবতলীর সৈয়দ আহম্মেদ কলেজ স্টেশন এলাকার ব্যবসায়ী আব্দুর রাজ্জাক। প্রতি কেজি ৩০০ টাকা দরে মিষ্টিটির দাম ধরা হয় এক হাজার ৮০০ টাকা। আব্দুর রাজ্জাক জানান, মেলা উপলক্ষে তিনি বিভিন্ন রকম মাছের আকৃতির মিষ্টি তৈরি করেছেন।
পোড়াদহের মেলাটি এক দিনের হলেও আশপাশের গ্রামগুলোতে তিন দিন ধরে চলে জামাই উৎসব। মেলা উপলক্ষে এসব গ্রামের বাসিন্দারা তাদের মেয়ে ও জামাইকে দাওয়াত দিয়ে নিয়ে আসেন। তারা মেলা থেকে বড় বড় মাছ ও মিষ্টি কিনে থাকেন। মেলার ঐতিহ্য অনুসারে, একই স্থানে আগামীকাল বৃহস্পতিবার বসছে বউমেলা। নতুন বউদের জন্য মেলায় চুড়ি, ফিতা, গয়নাসহ রূপচর্চার নানা সামগ্রীতে ঠাসা থাকবে দোকানগুলো। পোড়াদহের মেলা উপলক্ষে বাবার বাড়িতে বেড়াতে আসা মেয়ে ও স্থানীয় নববধূরাই বউমেলার প্রধান ক্রেতা।
মেলার পাশের গোলাবাড়ি এলাকার আছিয়া সুলতানা জানান, মেলা উপলক্ষে জামাইদের দাওয়াত দেওয়া বাধ্যতামূলক। তিনি বলেন, ঈদে দাওয়াত না দিলেও জামাইরা মন খারাপ করেন না। কিন্তু মেলায় না ডাকলে তারা কষ্ট পান।
বগুড়া লেখক চক্রের সভাপতি ইসলাম রফিক বলেন, পোড়াদহের মেলা এ অঞ্চলের মানুষের প্রাণের মেলা। এই মেলার জৌলুস আগের মতো না থাকলেও মেলাটি ঘিরে এ অঞ্চলের ঘরে ঘরে আনন্দ-উৎসব ছড়িয়ে পড়ে। এবার স্থান পরিবর্তন করে কাতলাহার বিলের পাশে আয়োজন করায় সাহিত্যপ্রেমীরা আখতারুজ্জামান ইলিয়াসকে স্মরণ করছেন। তার উপন্যাস খোয়াবনামায় বর্ণিত সেই বিলটিকে চোখ ভরে দেখছেন দর্শনার্থীরা।
মেলার আয়োজক পোড়াদহ সার্বজনীন পূজা কমিটির সাধারণ সম্পাদক শঙ্কর কুমার রায় জানান, সামাজিকভাবে এই মেলার গুরুত্ব অনেক বেশি। কারণ এই মেলাকে ঘিরে ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ উৎসবে মেতে ওঠেন। তবে তিনি মেলাটি আগের স্থানে আয়োজনের দাবি জানিয়ে বলেন, আমাদের মন্দিরের পাশেই মেলাটির আয়োজন করা হোক।
- বিষয় :
- পোড়াদহের মেলা
- বগুড়া