ঢাকা মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য আমদানি

বেনাপোলের ১০ সিএন্ডএফ এজেন্টের বিষয়ে তদন্তে এনবিআর

বেনাপোলের ১০ সিএন্ডএফ এজেন্টের বিষয়ে তদন্তে এনবিআর
×

যশোর অফিস ও বেনাপোল প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১৬ আগস্ট ২০২০ | ০৯:৪৫ | আপডেট: ১৬ আগস্ট ২০২০ | ১১:০০

মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে পণ্য আমদানির সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে বেনাপোলের ১০ সিএন্ডএফ এজেন্টের ব্যাপারে তদন্তে নেমেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এনবিআরের তদন্ত দল গত কয়েকদিন বেনাপোল কাস্টম হাউজ ও বন্দরে অনুসন্ধান চালায়। তারা বেনাপোলে শুল্ক ফাঁকির বড় ধরনের ঘটনার প্রাথমিক প্রমাণও পেয়েছে বলে জানা গেছে।

তবে তিন সদস্যের তদন্ত দলের প্রধান মোংলা কাস্টমের কমিশনার হোসেন আহমদ বলেন, বেনাপোলে সরেজমিন তদন্তকালে তারা অভিযুক্ত সিএন্ডএফ প্রতিষ্ঠান মালিকদের বক্তব্য গ্রহণ করেন। অবশ্য এ সময় সিএন্ডএফ ব্যবসায়ীরা তাদের বিরুদ্ধে আনা শুল্ক ফাঁকির অভিযোগ মিথ্যা দাবি করে লিখিতপত্র জমা দেন।

চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে মোটরসাইকেল আমদানি করে ৫০ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দেয়ার ঘটনা ধরা পড়ে। এরপর রাজস্ব ফাঁকির ঘটনা তদন্ত করে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর।

শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, ঢাকার আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান টিভিএস অটো বাংলাদেশ লিমিটেড মোটরসাইকেলের খুচরা যন্ত্রাংশ আমদানির ঘোষণা দেয়। কিন্তু ঘোষণা অনুযায়ী খুচরা যন্ত্রাংশ আমদানি না করে বেনাপোল বন্দর দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি শ’ শ’ পূর্ণাঙ্গ (কমপ্লিট) মোটরসাইকেল আমদানি করে। যন্ত্রাংশ ঘোষণা দিয়ে এইচএস কোড ৮৭১৪.১০.৯০ এর বিপরীতে ৫৮.৬০ শতাংশ শুল্ক কর পরিশোধ করে। সিপিসি ৬৮০ এর সুবিধা নিয়ে রেয়াতি হারে বিপুলসংখ্যক পণ্য খালাস করে। এভাবে কমপক্ষে ৫০ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দেয়া হয়েছিল।

টিভিএস অটো বাংলাদেশ লিমিটেড ও বেনাপোল সিএন্ডএফ এজেন্ট মেসার্স শামসুর রহমান এবং সুজন এন্টারপ্রাইজ জালিয়াতির মাধ্যমে বড় ধরনের শুল্ক ফাঁকি দেয়। পণ্য চালানে এলসি, ইনভয়েজ ও প্যাকিং লিস্ট জালিয়াতি করে শুল্ক ফাঁকি ও মানি লন্ডারিং করা হয়েছিল বলে অভিযোগ যায় এনবিআরে। আর তাকে সহযোগিতা করেন বেনাপোল কাস্টমের সাবেক কমিশনার বেলাল হোসাইন চৌধুরী। মেসার্স শামছুর রহমানের স্বত্তাধিকারী ও বেনাপোল সিএন্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি শামছুর রহমানের বিরুদ্ধে শুল্ক ফাঁকির ঘটনা পুরোনো।

বেনাপোল কাস্টম সূত্র জানায়, শামছুর রহমানসহ বেনাপোলের ১০ জন সিএন্ডএফ ব্যবসায়ীর শুল্ক ফাঁকির অভিযোগ যায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে। সেখান থেকে বিষয়টি খোঁজ নিতে এনবিআরকে চিঠি দেয়া হয়। পরে এনবিআর ৩ সদস্যর কমিটি গঠন করে।

শুল্ক ফাঁকির অভিযোগ রয়েছে এমন বাকি ৯টি প্রতিষ্ঠান হলো শামছুর রহমানের ছোট ভাই হাবিবুর রহমানের মালিকানাধীন জয়েন্ট এন্টারপ্রাইজ, তাদের ভাগ্নে এমদাদুর রহমানের মেসার্স অর্ণব এন্টার প্রাইজ, আহসান হাবিব সেলিমের সোহান ট্রেড, নুরুজ্জামান লিটনের লিটন এন্টার প্রাইজ, মোত্তালিব, দিলাল উদ্দিনের মিলেনিয়াম এন্টারপ্রাইজ, নুরুল আলম স্বপনের আনুষা ইমপেক্স, আব্দুল লতিফের নুর ইন্টারন্যাশনাল এবং খায়রুজ্জামান মধুর জামান ট্রেডার্স।

এদিকে মেসার্স শামছুর রহমানের স্বত্ত্বাধিকারী শামছুর রহমান দাবি করেন, তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ আনা হয়েছে। তিনিসহ অভিযুক্ত অন্য সবাই তদন্ত কমিটির কাছে লিখিত ব্যখ্যা দিয়েছেন।

মেসার্স অর্ণব এন্টার প্রাইজের মালিক এমদাদুর রহমান জানান, আমাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। অযথা হয়রানির উদ্দেশ্য মিথ্যা অভিযোগ করা হয়েছে।

বেনাপোল কাস্টমের কমিশনার আজিজুর রহমান জানান, তদন্ত কমিটি দুই দিন ধরে কাজ করে ফিরে গেছেন। পরে তারা এনবিআরে তদন্ত রিপোর্ট জমা দেবেন। অভিযোগগুলো প্রমাণ হলে সেখানে তারা সুপারিশ করবেন অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কি ব্যবস্থা নেয়া যায়।

এ ব্যাপারে তদন্ত কমিটির প্রধান ও মোংলা কাস্টমস কমিশনার হোসেন আহমদ জানান, আমরা খুব বেশি তথ্য প্রমাণ ছাড়াই তদন্তে নেমেছিলাম। তারপরও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে প্রমাণ জোগাড় করেছি। খুব শিগগিরই তদন্ত রিপোর্ট জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে জমা দেব।

দেশের সর্ববৃহৎ স্থলবন্দর বেনাপোলে শুল্ক ফাঁকির ঘটনা পুরনো। প্রতি বছর গড়ে দুই শতাধিক শুল্ক ফাঁকির ঘটনা ঘটলেও যারা শুল্ক ফাঁকি দিচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয় না। গত ১০ অর্থবছরে বেনাপোলে ২ হাজারে বেশি শুল্ক ফাঁকির ঘটনা ধরেছে কাস্টমের শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগ। এসব ঘটনায় তারা শুধু জরিমানা আদায় করে ছেড়ে দিয়েছেন। শুল্ক ফাঁকির সাথে সরাসরি আমদানিকারক, সিএন্ডএফ প্রতিনিধিরা জড়িত। আর এদের প্রত্যক্ষভাবে সহযোগিতা করেন কাস্টমের কতিপয় কর্মকর্তা। যে কারণে শুধু জরিমানা আদায় ছাড়া আর কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেন না কাস্টম কর্তৃপক্ষ। এতে শুল্ক ফাঁকিবাজরা উৎসাহিত হচ্ছেন।

২০১১ সালের দিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গোয়েন্দা শাখার তদন্তেও এ বন্দরের অনিয়ম, শুল্ক ফাঁকির ঘটনা উল্লেখ করা হয়। গোয়েন্দা শাখার ওই প্রতিবেদনটি হাতে পাবার পর এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেয়া হয়।

আরও পড়ুন

×