ঢাকা শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নিম্নবিত্তের ফ্ল্যাটবাড়ি প্র্রকল্পে জি কে শামীমের 'আসর'

নিম্নবিত্তের ফ্ল্যাটবাড়ি প্র্রকল্পে জি কে শামীমের 'আসর'
×

প্রতীকী ছবি

তৌফিকুল ইসলাম বাবর, চট্টগ্রাম

প্রকাশ: ২৭ নভেম্বর ২০২১ | ১২:০০ | আপডেট: ২৭ নভেম্বর ২০২১ | ১৪:৩৮

সীমিত আয়ের মানুষের মাথা গোঁজার ঠাঁই করে দিতে চট্টগ্রাম শহরের হালিশহরে ২০১৮ সালের আগস্টে শুরু হয় 'ফ্ল্যাটবাড়ি' প্রকল্পের কাজ। ২০০ কোটি টাকায় এই প্রকল্পের আওতায় ১৪ তলাবিশিষ্ট ছয়টি আবাসিক ভবনে ৩১২টি ফ্ল্যাট নির্মাণের কথা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরের মধ্যেই এ প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু তিন বছরে প্রকল্পের কাজ খুব সামান্যই হয়েছে।

এ কারণে প্রকল্পটির মেয়াদ ২০২২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু এই বর্ধিত সময়েও যে ভবন নির্মাণের কাজ শেষ হবে না- এটি মোটামুটি নিশ্চিত। কারণ প্রকল্পের আওতায় যে ছয়টি ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে, এর মধ্যে তিনটির কাজ এখনও শুরুই হয়নি। অন্য তিন ভবনের মধ্যে দুটির চারতলা পর্যন্ত ছাদ ঢালাই হয়েছে। আরেকটির বেসমেন্ট নির্মাণ শুরু করার পর দিনের পর দিন ফেলে রাখায় লোহায় জং ধরেছে। অবশ্য প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের দাবি, প্রকল্পের ২৮ শতাংশ কাজ হয়েছে।

'চট্টগ্রামের হালিশহর হাউজিং এস্টেটের জি ব্লকে সীমিত আয়ের লোকজনের জন্য আবাসিক ফ্ল্যাটের নির্মাণ প্রকল্পের (৪র্থ পর্যায়)' ভবনগুলো নির্মাণ করছে দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হচ্ছে গণপূর্তের বহুল আলোচিত-সমালোচিত 'টেন্ডার কিং' গোলাম কিবরিয়া শামীম ওরফে জি কে শামীমের। তার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জিকেবিপিএলের (জিকে বিল্ডার্স প্রাইভেট লিমিটেড) সঙ্গে যৌথভাবে প্রকল্পটির নির্মাণ কাজ করছে কম্প্র্রিহেনসিভ গ্রুপের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সিএইচএল (কম্প্র্রিহেনসিভ হোল্ডিং লিমিটেড)। অনেকেরই ধারণা, জি কে শামীমের 'আসরে' এ প্রকল্পের দশা এমন করুণ।

চট্টগ্রাম নগরীর হালিশহর আবাসিকের 'জি ব্লকে' প্রবেশ করে একটু এগোলেই চোখে পড়বে এ গৃহায়ন প্রকল্প। গত ১৫ নভেম্বর সেখানে গিয়ে কর্মযজ্ঞের কোনো চিত্র চোখে পড়েনি। তেমন কোনো কর্মকর্তা বা কর্মীও ছিলেন না সেখানে। গেটে দারোয়ান বসেছিলেন অলস ভঙ্গিতে। ভেতরে ঢুকে দেখা যায়, ছয়টি ভবনের মধ্যে প্রকল্পের প্রবেশমুখে পাশাপাশি দুটি ভবন চারতলা পর্যন্ত উঠেছে। ভেতরের দিকে একটি ভবনের বেসমেন্টের কাজ শুরু করা হলেও সেটি দীর্ঘদিন ফেলে রাখায় লোহার রডে জং ধরেছে। প্রকল্পের একটি স্থানে পাইলিংয়ের জন্য স্তূপ করে রাখা হয়েছে বেশ কিছু আরসিসি পিলার।

একসময় সেখানে পাওয়া যায় প্রকল্পের দায়িত্বে থাকা কম্প্রিহেনসিভ হোল্ডিংসের সহকারী মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মো. কামরুল হাসানকে। তিনি বলেন, 'প্রকল্পের কাজ নানা কারণে তত দ্রুতগতিসম্পন্ন হয়ে ওঠেনি। হালিশহর চট্টগ্রাম শহরের নিচু এলাকাগুলোর একটি। বর্ষায় বৃষ্টিপাতে দফায় দফায় জলাবদ্ধ হয়েছে এ প্রকল্প এলাকা। ফলে প্রকল্পের কাজ ব্যাহত হয়েছে। তবে বর্ষা মৌসুম শেষ হওয়ায় এখন পুরোদমে কাজ শুরু হচ্ছে।'

বর্ধিত সময়েও প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন হবে কিনা জানতে চাইলে সংশয়ে পড়ে যান প্রকৌশলী কামরুল হাসান। প্রকল্পে ঠিকাদার হিসেবে কম্প্রিহেনসিভের সঙ্গে জি কে শামীমের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জিকে বিল্ডার্স থাকলেও তাদের তেমন কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলে দাবি করেন কম্প্রিহেনসিভের এই কর্মকর্তা।

জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ চট্টগ্রামের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মঈনুল হক মোতাইদ বলেন, 'ভূমি-সংক্রান্ত জটিলতা ও করোনাসহ বিভিন্ন কারণে হালিশহরের জি ব্লকের ছয়টি ভবন নির্মাণ প্রকল্পের কাজে গতি কিছুটা কম ছিল। তবে এখন তেমন একটা সমস্যা নেই। প্রকল্পের কাজ দ্রুতগতিতে শেষ করার জন্য আমরা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে বারবার তাগাদা দিচ্ছি।'

জি কে শামীমের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কারণে সমস্যা হচ্ছে কিনা, জানতে চাইলে এই কর্মকর্তা বলেন, 'বিষয়টি তেমন না। কারণ প্রকল্পের কাজগুলো অন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কম্প্রিহেনসিভের তত্ত্বাবধানে হচ্ছে।' তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ সংশ্নিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, 'গৃহায়নের নিম্নবিত্তের স্বপ্নের ফ্ল্যাট প্রকল্পে জি কে শামীম আসর দিচ্ছে। কয় বছরে এই প্রকল্পের কাজ শেষ হবে কেউ জানে না।'

হালিশহর আবাসিক এলাকার 'জি ব্লকে' দুই দশমিক ২৩ একর জায়গায় বাস্তবায়নাধীন ফ্ল্যাট প্রকল্পটির প্রতিটি ভবনের নকশা একই ধরনের। প্রতিটি ভবনে ৫২টি করে থাকবে ৩১২টি ফ্ল্যাট। প্রতিটি ফ্ল্যাটের আয়তন হবে এক হাজার ৩৬৫ বর্গফুট। এরই মধ্যে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে ফ্ল্যাটগুলো। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ব্যয় হচ্ছে ১৯৭ কোটি ৭ লাখ ৭৮ হাজার টাকা।

চট্টগ্রামে সীমিত আয়ের মানুষের জন্য বাস্তবায়নাধীন ফ্ল্যাট প্রকল্পসহ 'টেন্ডার কিং' হিসেবে পরিচিত আলোচিত গোলাম কিবরিয়া শামীম ওরফে জি কে শামীমের অন্তত এক ডজন প্রকল্প রয়েছে। প্রভাব খাটিয়ে টেন্ডার বাগিয়ে নিতেন তিনি। ২০১৯ সালের ২০ সেপ্টেম্বর ঢাকার নিকেতনের জিকে বিল্ডার্সের অফিস থেকে টেন্ডারবাজি ও চাঁদাবাজির অভিযোগে জি কে শামীমকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। এরপর থেকে তার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান যেসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করছিল, সবগুলোতেই কমবেশি প্রভাব পড়ে।

আরও পড়ুন

×