তদারকি সংস্থা নির্বিকার
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে কনটেইনার ডিপোতে বিস্ম্ফোরণের ৬০ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও আগুন পুরোপুরি নেভানো সম্ভব হয়নি। মঙ্গলবার দুপুরের ছবি -মো. রাশেদ
সারোয়ার সুমন ও আবদুল্লাহ আল মামুন, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: ০৭ জুন ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ০৭ জুন ২০২২ | ১৪:৪৬
সমুদ্র পথে দেশে রপ্তানি পণ্যের শতভাগ শুল্ক্কায়ন হয় বেসরকারি ১৯টি কনটেইনার ডিপোতে। ৩৮ ধরনের আমদানি পণ্যেরও শুল্ক্কায়ন করে এসব ডিপো। এসব পণ্যের মধ্যে যেমন রয়েছে তুলা, তেমনি রয়েছে বিপজ্জনক দাহ্য পদার্থও। আছে দেশের অর্থনীতি টিকিয়ে রাখা তৈরি পোশাকও। চট্টগ্রাম বন্দরের বিকল্প হিসেবে এই ১৯টি ডিপোকে নানা শর্ত জুড়ে দিয়ে লাইসেন্স দেয় কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। ডিপো থেকে রপ্তানি পণ্য যাতে দ্রুত বন্দরে যায়, সে বিষয়টিতে নজর রাখে বন্দর কর্তৃপক্ষ। স্পর্শকাতর এসব স্থাপনায় নিয়োজিত শ্রমিকদের নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত হচ্ছে কিনা তা দেখভালের দায়িত্ব রয়েছে কলকারখানা অধিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিস ও পরিবেশ অধিদপ্তরের। এ ছাড়া বিভিন্ন দাহ্য পদার্থ নিরাপদে সংরক্ষণ ও পরিবহন মনিটরিংয়ের দায়িত্ব রয়েছে নৌ মন্ত্রণালয়ের। রয়েছে আইন, বিধিমালা; কিন্তু কখনোই যথাযথ দায়িত্ব পালন করে না এসব সংস্থা। মাঝে মাঝে রুটিন ওয়ার্ক করেই দায় সারছে সব তদারকি সংস্থা।
কোনো দুর্ঘটনা ঘটলেই কেবল তোড়জোড় শুরু হয় তাদের। পরে আবার তারা চলে যান 'শীতঘুমে'। তাদের এমন নির্বিকার ভূমিকায় শিল্পকারখানাসহ নানা প্রতিষ্ঠানে বাড়ছে দুর্ঘটনা। বাড়ে লাশের সংখ্যাও।
ডিপোতে শত অনিয়ম, দেখে না কাস্টমস :বেসরকারি ডিপো নির্মাণ করার আগে বন্দরের অনাপত্তিপত্র নিয়ে লাইসেন্সের জন্য আবেদন করতে হয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে। তাদের প্রতিনিধি হয়ে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ ডিপোর বন্ডেড ওয়্যারহাউস ও শুল্ক্ক স্টেশনের সক্ষমতা যাচাই করে দেখে। ডিপোটি কোথায় স্থাপন করা হচ্ছে, কীভাবে এটি পরিচালনা করা হবে, আমদানি-রপ্তানি পণ্য হ্যান্ডেল করার মতো সক্ষমতা আছে কিনা, তা খতিয়ে দেখে লাইসেন্স দেয় কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। কিন্তু যে ১৯টি ডিপো এরই মধ্যে লাইসেন্স পেয়ে পণ্য রপ্তানি করছে, সেগুলোর কোনোটিরই নিরাপত্তা ব্যবস্থা সন্তোষজনক নয়। ডিপোর ব্যাপারে শিপিং এজেন্ট ও ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার্স অ্যাসোসিয়েশন এর আগে কয়েক দফা আপত্তিও জানিয়েছে। তারপরও নতুন ডিপো হচ্ছে চট্টগ্রামে। তিনটি ডিপোর অনুমোদন প্রক্রিয়াও চূড়ান্ত হয়েছে। নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, নতুন স্থাপিত আইসিডিগুলোকে অবশ্যই শহরের ২০ কিলোমিটার দূরে স্থাপন করতে বলা হয়েছে। নতুন আইসিডি স্থাপনের ক্ষেত্রে নিজস্ব মালিকানাধীন জায়গা, ভাড়ার জায়গা বা লিজ নেওয়া জায়গায় আইসিডি স্থাপন করা যাবে। এ ক্ষেত্রে নূ্যনতম ১৫ একর জায়গা থাকতে হবে এবং সাড়ে ৪ হাজার টিইইউএস কনটেইনার রাখার জায়গা থাকতে হবে। কিন্তু এই নীতিমালাও মানছে না নতুন হতে যাওয়া তিন বেসরকারি কনটেইনার ডিপোও।
১৯ ডিপো নিয়ম মেনে গড়ে ওঠেনি :৩৮ বছরে যেসব বেসরকারি ডিপো গড়ে উঠেছে, সেগুলো মানেনি নিয়ম। নিয়ম অনুযায়ী, চট্টগ্রাম বন্দর থেকে অন্তত ২০ কিলোমিটার দূরে থাকবে কনটেইনার ডিপো। কিন্তু বন্দরের ৫ কিলোমিটারের মধ্যে নির্মিত হয়েছে আটটি কনটেইনার ডিপো। এগুলো হলো- এছাক ব্রাদার্স ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, চিটাগাং কনটেইনার লিমিটেড, কিউএনএস কনটেইনার সার্ভিস লিমিটেড, ট্রান্স কনটেইনার লিমিটেড ও কেঅ্যান্ডটি লজিস্টিক লিমিটেড, সি ফার লিমিটেড, ফিসকো বাংলাদেশ লিমিটেড ও সামিট এলিয়েন্স পোর্ট লিমিটেড।
ছয় থেকে ১০ কিলোমিটারের মধ্যে রয়েছে ওশান কনটেইনার লিমিটেড, গোল্ডেন কনটেইনার লিমিটেড, শফি মোটরস ও ইনকনট্রেড লিমিটেড। অন্য ডিপোগুলোর মধ্যে ইকবাল এন্টারপ্রাইজ, পোর্ট লিংক লজিস্টিক সেন্টার লিমিটেড ও কেডিএস লজিস্টিক লিমিটেড যথাক্রমে ১৪, ১৫ ও ১৯ কিলোমিটার দূরে নির্মিত হয়েছে।
এসব ডিপোর মধ্যে এখনও পোর্টলিংক ও সিসিটিএল ইউনিট-২ পণ্যাগারে খোলা মাঠে আমদানি-রপ্তানি পণ্য স্টাফিং ও আনস্টাফিং করে। এছাক ব্রাদার্স, সিসিটিএল এক ও দুই নম্বর ইউনিটের পানি নিস্কাশন ব্যবস্থা আধুনিক হয়নি এখনও। আবার অনেকে সীমানাপ্রাচীর তৈরি না করে শুধু কাঁটাতারের বেড়া দিয়েও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েছে। সর্বশেষ পরিদর্শক টিমের রিপোর্ট অনুযায়ী, কেঅ্যান্ডটি লজিস্টিকস লিমিটেডের পূর্ব পাশে সীমানাপ্রাচীর নেই। ওশান কনটেইনার লিমিটেড, ফিসকো বাংলাদেশ লিমিটেড, সামিট অ্যালায়েন্স পোর্ট লিমিটেড (পশ্চিম) এবং কিউএনএস- এই চারটির সীমানাপ্রাচীর নিরাপদ নয়। আবার অধিকাংশ পণ্যাগারে ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা নেই। সাত বছর আগে পরিদর্শক টিমের সেই মূল্যায়ন চিত্র তেমনই রয়ে গেছে। অধিকাংশ কনটেইনার ডিপো নিরাপত্তার বিষয়টিতে ঘাটতি রাখলেও তা মনিটরিং করে যথাযথ ব্যবস্থা নিচ্ছে না কাস্টমস কর্তৃপক্ষ।
চার মাসে একবার পর্যবেক্ষণ রিপোর্ট দেওয়ার কথা বন্দরের :কারখানা থেকে সরাসরি রপ্তানি পণ্য আনা হয় বেসরকারি কনটেইনার ডিপোগুলোতে। সেখানে পণ্য যাচাই-বাছাই করে সরাসরি বন্দরে নিয়ে তুলে দেওয়া হয় জাহাজে। এ জন্য বেসরকারি ডিপোগুলোর কার্যক্রম মনিটরিং করার কথা চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষর। প্রতি চার মাস পরপর চট্টগ্রাম বন্দরের নেতৃত্বে ১১ সদস্যের একটি দল ডিপো পরিদর্শন করে পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন দেওয়ার কথা উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে। কিন্তু এই প্রতিবেদনও দেওয়া হয় না নিয়মিত। উঠে আসে না প্রকৃত অনিয়মও। ১৯টি বেসরকারি ডিপোর মধ্যে অধিকাংশই নিরাপত্তার ব্যাপারে উদাসীন। পর্যাপ্ত সিসিটিভি ক্যামেরা ও নিরাপত্তা রক্ষী নেই কোনো ডিপোতেই।
পরিদর্শন শেষে নোটিশ দিয়েই দায়িত্ব সারে কলকারখানা অধিদপ্তর :বাংলাদেশ শ্রম বিধিমালা ২০১৫ অনুযায়ী, একটি প্রতিষ্ঠানের প্রত্যেক বিভাগে নিযুক্ত শ্রমিকের কমপক্ষে ১৮ শতাংশকে অগ্নিনির্বাপণ, জরুরি উদ্ধার ও প্রাথমিক চিকিৎসা এবং বহনযোগ্য অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রের ব্যবহার সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দিতে বলা হয়েছে। নিরাপত্তা নিশ্চিতে থাকবে তিনটি প্রশিক্ষিত দল। অগ্নিনির্বাপক দল, উদ্ধারকারী দল ও প্রাথমিক চিকিৎসা দল। প্রতিটি দলে সদস্য থাকবে ছয় শতাংশ।
এ ছাড়া বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ অনুযায়ী, ৫০ বা তার বেশি শ্রমিক-কর্মচারী আছে- এমন কারখানা ও প্রতিষ্ঠানে প্রতি ছয় মাসে অন্তত একবার অগ্নিনির্বাপণ মহড়ার আয়োজনের নির্দেশনা হয়েছে, যা রেকর্ড বুকে সংরক্ষণ করতে হবে। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অন্তত ২০ জনের সঙ্গে কথা বলে সমকাল। তাদের মধ্যে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন- এমন কাউকে পাওয়া যায়নি। কখনও আগুন নেভানোর মহড়াও তাঁরা দেখেননি।
তদারকি নেই ফায়ার সার্ভিসেরও :শ্রমবিধি অনুযায়ী, পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্রপাতি নিশ্চিত, অগ্নিনির্বাপণে পানির রিজার্ভার, ফায়ার হাইড্রেন্ট ও চার মাস অন্তর মহড়া দেওয়ার নিশ্চিত করার কথা থাকলেও বেসরকারি কনটেইনার ডিপো তা করে না। বিএম ডিপোতে অগ্নিকাণ্ডে পানি সংকটে হিমশিম খেতে হয় ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের। আগুন নেভাতে গিয়ে ফায়ার হাইড্রেন্টও পাননি তারা। ছিল না পর্যাপ্ত ফায়ার এক্সটিংগুইশারও। ফায়ার সার্ভিসের এসব নিয়মিত তদারকির দায়িত্ব থাকলেও তারা তা করে না।
চিঠি দিয়েই সেরেছে সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তর, উদাসীন মন্ত্রণালয়ও :বেসরকারি ডিপোগুলোতে ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম ডেঞ্জারাস গুডস (আইএমডিজি) বাস্তবায়ন করার কথা সমুদ্র বাণিজ্য অধিদপ্তরের। এই কোডে নিরাপত্তা-সংক্রান্ত ব্যাপারে গাইডলাইন দেওয়া আছে। এটি মনিটরিং করতে তিন বছর আগে সমুদ্র বাণিজ্য অধিদপ্তর নৌ মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেয়। কিন্তু সেই চিঠির জবাব আসেনি এখনও। এ প্রসঙ্গে কথা বলতে সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কমডোর জালাল আহমেদকে একাধিকবার ফোন দিলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।
কে কী বলেন :দুর্ঘটনার পর বিএম কনটেইনার ডিপো পরিদর্শন করেছেন চট্টগ্রাম কাস্টমসের কমিশনার মোহাম্মদ ফখরুল আলমসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। মোহাম্মদ ফখরুল আলম বলেন, 'আমরা লাইসেন্স দেওয়ার আগে কিছু শর্ত দিই। সেগুলোর বেশিরভাগ যাঁরা পূরণ করেন, তাঁরা লাইসেন্স পান। জনবল সংকটের কারণে ডিপোগুলোকে কঠিন মনিটরিংয়ে রাখা যাচ্ছে না। পর্যাপ্ত শুল্ক্ক কর্মকর্তাও দিতে পারছি না আমরা। লজিস্টিক সাপোর্ট পেলে মনযোগ আরও বাড়ানো যাবে।'
ঘটনাস্থল পরিদর্শনে আসা চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালক (নিরাপত্তা) মেজর ওয়াহিদুল হক বলেন, 'বেসরকারি কনটেইনার ডিপো বন্দরের সহায়ক প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করছে। যেহেতু রপ্তানি পণ্যের শতভাগ এখানে কার্যক্রম পরিচালনা করে, তাই নিরাপত্তার ব্যাপারে তাঁদের আরও সতর্ক হতে হবে। বন্দরকেও কঠোর হতে হবে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে।'
এ প্রসঙ্গে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের চট্টগ্রামের উপমহাপরিদর্শক আবদুল্লাহ আল সাকিব মুবাররাত সমকালকে বলেন, 'গত ২৮ ডিসেম্বর বিএম ডিপো পরিদর্শন করেছিল আমাদের দল। সেখানে অগ্নিনিরাপত্তা ত্রুটিসহ যেসব ত্রুটি পেয়েছি, তা নিশ্চিত করতে গত ৮ ফেব্রুয়ারি তাদের চিঠি দিয়েছি। ১০-১৫ দিনের মধ্যে তা নিশ্চিত করে অধিদপ্তরকে জানাতে বলেছিলাম। কিন্তু তারা এখনও জানায়নি।' ফায়ার মহড়াসহ অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকায় কোনো আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে কিনা- জানতে চাইলে তিনি এ বিষয়ে ফায়ার সার্ভিসের ওপর দায় চাপান।
ফায়ার সার্ভিস চট্টগ্রামের উপপরিচালক আনিসুর রহমান বলেন, 'চট্টগ্রামে ছয় শতাধিক শিল্পকারখানা রয়েছে। বন্দর, কাস্টমসসহ আর্থিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অর্ধশত স্থাপনা আছে। ১৯টি বেসরকারি ডিপো আছে। সবগুলো প্রতিষ্ঠান নিয়মিত মনিটরিং করার জন্য জনবল নেই আমাদের। তারপরও আমাদের সামর্থ্যের সর্বোচ্চটুকু দিয়ে চেষ্টা করছি।'
বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো অ্যাসোসিয়েশনের (বিকডা) সভাপতি নুরুল কাইয়ুম খান সমকালকে বলেন, বেসরকারি ডিপো আকাশ থেকে উড়ে আসেনি। যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণের পর নিয়ম মেনেই বিএম ডিপো লাইসেন্স পেয়েছে। ডিপোতে কোনো অনিয়ম হলে তা দেখার দায়িত্ব তদারকি বিভিন্ন সংস্থার। এ দুর্ঘটনার আগে কোনো সংস্থা তো আপত্তি তোলেনি। ৩৮ বছর ধরে ব্যবসা করছি আমরা। এটা ঠিক যে, সব প্রতিষ্ঠান সমমানের নয়। কারও দুর্বলতা থাকলে তা তদারকি সংস্থা বের করে ব্যবস্থা নিক। ঢালাওভাবে সব ডিপোকে দায়ী করা ঠিক হবে না।