নানা জটিলতা কাটিয়ে অবশেষে আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন কোম্পানির (এপিএসসিএল) নতুন নির্মিত ৪০০ মেগাওয়াট ক্ষমতা সম্পন্ন কম্বাইন্ড সাইকেল (পূর্ণ শক্তিতে) পাওয়ার প্লান্ট (ইস্ট) থেকে পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হয়েছে। গত সোমবার সকাল থেকে এ ইউনিটটি সিম্পল সাইকেলে (আংশিক শক্তি) পরীক্ষামূলক উৎপাদনের চেষ্টা শুরু করে কর্তৃপক্ষ। 

প্রথম ২-১ দিন বিদ্যুৎ উৎপাদন কম হলেও পর্যায়ক্রমে তা বাড়ছে এবং বৃহস্পতিবার দুপুরে ইউনিটটি (সিম্পল সাইকেলে নির্ধারিত) প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে সক্ষম হয়েছে। ফলে জাতীয় গ্রিডে অতিরিক্ত ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যোগ হলো। আগামী সেপ্টেম্বর শেষে ইউনিটটি পূর্ণ শক্তিতে চালু হলে ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ হবে বলে জানিয়েছে এপিএসসিএল কর্তৃপক্ষ।

এদিকে এই ইউনিটটি চালু হলে জাতীয় গ্রিডে আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন কোম্পানির দৈনিক বিদ্যুৎ সরবরাহের সক্ষমতা দাঁড়াবে প্রায় ১৮০০ মেগাওয়াট। 

এপিএসসিএল সূত্রে জানা যায়, বর্তমান সরকারের বিদ্যুৎ উৎপাদনের মহা পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আশুগঞ্জকে ‘পাওয়ার হাব’ ঘোষণা করে এবং আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে এ কেন্দ্রের বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ৬ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীতকরণে কাজ শুরু করে। এর অংশ হিসেবে পূর্ণ শক্তিতে উৎপাদন যাওয়া উত্তর ও দক্ষিণ প্লান্ট থেকে ৪৫০ করে মোট ৯০০ মেগাওয়াট এবং ইউনাইটেড পাওয়ার প্লান্ট থেকে ২২৫ মেগাওয়াট ও ২০০ মেগাওয়াটের  ইউনিট চালু হয়।

এ ছাড়া লক্ষমাত্রা অর্জনে অধিক পুরোনো দুটি কম বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী (প্রতিটি ৬৪ মেগাওয়াটের ইউনিট জিটি-১ এবং জিটি-২ ও এসটি ইউনিটটি) ইউনিট অপসারণ করে প্রায় সমপরিমাণ জ্বালানি (গ্যাস) ব্যবহার করে অধিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে  ৪০০ মেগাওয়াট ক্ষমতা সম্পন্ন কম্বাইন্ড সাইকেল  (ইস্ট) প্লান্টটি নির্মাণের প্রকল্প হাতে নেয় কর্তৃপক্ষ। 

জানা গেছে, ২০১৫ সালের ২২ সেপ্টেম্বর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় ৪০০ মেগাওয়াট ক্ষমতা সম্পন্ন এই প্রকল্পটি অনুমোদন পায়। দরপত্র প্রক্রিয়ায় ২০১৮ সালে ২০ মার্চ সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে চায়না ন্যাশনাল টেকনিক্যাল ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট কর্পোরেশন এবং চায়না ন্যাশনাল কর্পোরেশন ফর ওভারসিস ইকোনোমিক্স কো-অপারেশন কনস্ট্রাকশন প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব পায়। 

প্রকল্পটি বাস্তবায়নে মোট ব্যয় ধরা হয় ১৮০.৩২৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে এডিবি ১০৭.৯২ মিলিয়ন ডলার, আইডিবি ৮৫ মিলিয়ন ডলার এবং অবশিষ্ট টাকা বাংলাদেশ সরকার প্রদান করার কথা রয়েছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ২০১৮ সালের মার্চ মাসে চুক্তি স্বাক্ষর করলেও একই বছরে ১৬ জুলাই থেকে প্রকল্পের নির্মাণ কাজ শুরু করে। 

চুক্তি মোতাবেক প্রকল্পটি ২০২০ সালের ডিসেম্বরে আংশিক এবং ২০২১ সালের জুনে পুরোপুরি ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের কথা ছিল। কিন্তু প্রথমে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী দেশ চীন ও পরে সারা বিশ্বে ‘করোনা’ ভাইরাসের বিস্তার এবং মহামারি আকার ধারণ করায় প্রকল্পের কাজে স্থবিরতা নেমে আসে। তাছাড়া চুক্তি মোতাবেক প্রকল্পের গ্যাস টারবাইন ও স্টিম টারবাইন জার্মানের সিমেন্স কোম্পানির কিছু যন্ত্রপাতি চীন থেকে আসার কথা থাকলেও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বন্ধ থাকায় তা বাধাগ্রস্ত হয়।

করোনার প্রকোপ কমে গেলে জার্মান থেকে জেনারেটর ও কারিগরি টিম আসলে পুণরায় কাজ শুরু হলেও জেনারেটরের একটি অংশে ত্রুটি দেখা দেওয়ায় পুনঃনির্ধারিত সময়েও উৎপাদন শুরু সম্ভব হয়নি। পরে জেনারেটর সরবরাহকারী দেশ জার্মানের কারিগরি টিমের সার্বিক তত্ত্বাবধানে উদ্ভূত সমস্যা সমাধান ও পরীক্ষা–নিরীক্ষা শেষে গত সোমবার থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হয়। ইউনিটটি চালু হওয়ায় জাতীয় গ্রিডে অতিরিক্ত ৩০০ মেগাওয়াট সরবরাহ বৃদ্ধি পেয়েছে। 

এদিকে বর্তমানে এপিএসসিএলের প্রায় ১৪০০ (১৩৯১ মেগাওয়াট) মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন ৬টি ইউনিট থেকে দৈনিক প্রায় ১৩০০ (১২৯৩) মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে। নতুন ইউনিটটি পুরোদমে চালু হলে এ কেন্দ্রের বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা দাঁড়াবে প্রায় ১৮০০ (১৭৯৩) মেগাওয়াট এবং জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ১৭০০ (১৬৯০) মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করবে। 

এই ব্যাপারে নতুন ৪০০ মেগাওয়াট কম্বাইন্ড সাইকেল পাওয়ার প্লান্ট (ইস্ট) প্রকল্পের পিডি প্রকৌশলী মো. আব্দুল মজিদ সমকালকে বলেন, পরীক্ষামূলক ভাবে দৈনিক ৬-৭ ঘণ্টা করে চালু রাখা হচ্ছে এবং ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। 

এপিএসসিএলের এমডি এ.এম.এম সাজ্জাদুর রহমান সমকালকে বলেন, নতুন ইউনিটে বর্তমানে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। সব কিছু ঠিক থাকলে আগামী সেপ্টেম্বর নাগাদ এটি পুরোদমে চালু করা সম্ভব হবে এবং দৈনিক ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে।