তেলের গরমে সড়ক শীতল
ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে শনিবার যানবাহনের চাপ ছিল কম। মানিকগঞ্জ বাসস্ট্যান্ডে দুপুর ১টার দিকে দেখা যায় এ চিত্র -সমকাল
বিপ্লব চক্রবর্তী, মানিকগঞ্জ ও মাহাবুবুর রহমান টিপু, দোহার (ঢাকা)
প্রকাশ: ০৬ আগস্ট ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ০৭ আগস্ট ২০২২ | ০০:০৮
চিকিৎসার প্রয়োজনে সপ্তাহে দু'বার ঢাকা যেতে হয় ফরিদা আহমেদকে। গতকাল শনিবার সকালে মানিকগঞ্জ বাসস্ট্যান্ডে দেড় ঘণ্টার মতো বাসের অপেক্ষায় থাকতে হয় তাঁকে। তিনি বলছিলেন, পাটুরিয়া ঘাট থেকে ঢাকাগামী সব বাসই যাত্রীতে ঠাসা। কোনো সিট খালি নেই। তবে তাঁর কাছে কেউ বাড়তি ভাড়া দাবি করেননি।
এদিন মানিকগঞ্জ থেকে ঢাকাসহ বিভিন্ন রুটে চলাচলকারী ডিজেলচালিত যাত্রীবাহী বাসের সংখ্যা নেমে আসে অর্ধেকে। শুক্রবার রাতেই সরকার ডিজেলের ৪২ দশমিক ৫ শতাংশ দাম বাড়ানোর ঘোষণা দেয়। সেই সঙ্গে কেরোসিনের ৪২ দশমিক ৫ শতাংশ, অকটেনের ৫১ দশমিক ৬৮ শতাংশ ও পেট্রোলের দাম ৫১ দশমিক ১৬ শতাংশ বাড়ানো হয়। এর প্রভাব পড়ে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কেও। বাস কম থাকায় যাত্রীদের চাপ বেড়ে যায়। তাঁদের অভিযোগ, নির্ধারিত ভাড়ার বেশি আদায় করা হচ্ছে। তবে অন্তত ২৫টি বাসের চালক ও সহকারীর দাবি, তাঁরা এখনও আগের ভাড়াই আদায় করছেন। ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হলে তা কার্যকর করবেন।
সোহেল নামে এক শিক্ষার্থী বলেন, 'শিবালয়ের বরঙ্গাইল থেকে মানিকগঞ্জ বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত এতদিন বাস ভাড়া ২০ টাকা দিয়ে আসছি। আজ ৩০ টাকা দিতে হয়েছে।'
সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত মানিকগঞ্জ বাসস্ট্যান্ড এলাকা ও সড়কের পাশে রাখা ছিল বিভিন্ন পরিবহনের বিপুলসংখ্যক বাস। অনেক মালিক বাস বসিয়ে রাখেন। ফলে অল্পসংখ্যক বাসে উঠতে প্রতিযোগিতা করতে হয় যাত্রীদের।
মতি মিয়া নামে এক বাসচালক বলেন, তেলের দাম বাড়ার সংবাদ পেয়ে রাতেই তিনি গাড়িতে তেল ভরেছেন। তাই শনিবার নির্ধারিত ভাড়াই আদায় করা হয়। তবে রোববার ভাড়া না বাড়ালে গাড়ি বন্ধ রাখতে হবে তাঁকে।
নীলাচল পরিবহনের ইনচার্জ চণ্ডী চক্রবর্তী বলেন, ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে তাঁদের ৭০টি বাস নিয়মিত চলাচল করে। শনিবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত মাত্র ২৫টি বাস নেমেছে। লোকসানের ভয়ে অনেক মালিক গাড়ি চালাতে দেননি।
জেলা বাস মালিক সমিতির সভাপতি জাহিদুল ইসলাম বলেন, আগের দামের চেয়ে জ্বালানি তেলের দাম এক-তৃতীয়াংশ বাড়ানো হয়েছে, এটি অস্বাভাবিক। এই অনুপাতে ভাড়া না বাড়ানোয় অনেক মালিক বাস নামাননি।
শনিবার সকাল থেকেই ঢাকার দোহারে বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ পাওয়া যায়। উপজেলার জয়পাড়া থেকে ঢাকার গুলিস্তান যেতে আরাম পরিবহনের বাসে ভাড়া রাখা হয় ১৩০ টাকা, আগে যা রাখা হতো ১১০ টাকা। নগর পরিবহনে ৯০ টাকার জায়গায় ১১০ টাকা রাখার তথ্য পাওয়া গেছে। একই ধরনের তথ্য পাওয়া গেছে জয়পাড়া পরিবহন, যমুনা পরিবহন, পদ্মা পরিবহনের বাসযাত্রীদের কাছ থেকে।
স্পিডবোট-ট্রলারেও বাড়তি ভাড়া :দোহারের মৈনটঘাট দিয়ে স্পিডবোট ও ট্রলারে করে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলগামী যাত্রীদের কাছ থেকেও বাড়তি ভাড়া আদায়ের তথ্য পাওয়া গেছে। এ রুট দিয়ে চরভদ্রাসন, গোপালপুর ও বাংলাবাজার ঘাটে যাত্রী পরিবহন করা হয়। স্ত্রী নিয়ে ফরিদপুরের চরভদ্রাসনে বাড়ি যাচ্ছিলেন আবুল কালাম। তিনি বলেন, শনিবার ২০০ টাকা করে ভাড়া রাখা হয়েছে। আগে ভাড়া ছিল ১৫০ টাকা।
এসব অভিযোগের বিষয়ে হাসান নামে এক স্পিডবোট চালক বলেন, আগে ১ হাজার ৯০০ টাকায় ২০ লিটার তেল কিনতেন। এখন লাগছে ২ হাজার ৮৫০ টাকা। আগের ভাড়া ছিল ১৬০ টাকা, এখন ২০০ টাকা আদায় করছেন।
ঘাটের ইজারাদার বাশার মুন্সি বলেন, 'তেলের কারণে সবাই দাম বাড়িয়েছে। আমরাও তাই করেছি।' তবে বাড়তি ভাড়া আদায়ের ব্যাপারে সরকারি নির্দেশনা আসেনি।
তবে বাড়তি ভাড়া আদায়ের বিষয়টি জানেন না কুতুবপুর নৌ পুলিশ ফাঁড়ির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. সামছুল আলম।
প্রভাব পড়বে কৃষি খাতে :জ্বালানি তেলের আকস্মিক দাম বাড়ার প্রভাব পরিবহনের মতো দেশের সব খাতে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। এর ফলে কৃষি, শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করছেন দোহারের মানবাধিকার কর্মী নাছির উদ্দিন পল্লব। তিনি বলেন, করোনা মহামারির ধকল কাটিয়ে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে। এ অবস্থায় তেলের দাম বাড়ানো মেনে নিতে পারছে না জনসাধারণ।
তাঁর কথার প্রমাণ মেলে সুতারপাড়া হলের বাজারের দেলোয়ারা খাতুনের কথায়। তিনি বলেন, 'এই তেলের দামের লাইগ্যা তরি-তরকারি, চাইল-ডাইল সবকিছুর দাম বাড়াইয়া দিছে।'
- বিষয় :
- যাত্রীবাহী বাস
- বাস ভাড়া