‘সন্ধ্যায় টেকা পইয়া বাজারও গেলে মাথা নষ্ট হইয়ায়’
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে কষ্টে ছাতকের মানুষ
শাহ্ মো. আখতারুজ্জামান, ছাতক (সুনামগঞ্জ)
প্রকাশ: ২৮ মার্চ ২০২৪ | ২১:৫৩
‘সূর্য উঠবার আগেই বাড়িত থাকি বাইর ওই। ভাই হারাদিন পরিশ্রমের খাম খইরা ৪০০-৫০০ টাকা রুজি খরি। বউ আর তিনটা বাইচ্চা নিয়া আমার সংসার। সন্ধ্যায় খামের টেকা পইয়া বাজারও গেলে মাথা নষ্ট হইয়ায়। সব টেকার বাজার করলেও অনেকতা কিনার বাকি থাকে। আমরা নিম্ম আয়ের মানুষ বড় কষ্টে আছি।’ কথাগুলো দিনমজুর রফিক মিয়ার। তাঁর বাড়ি সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নের গণেশপুর গ্রামে।
রফিক মিয়ার ভাষ্য, চাল-ডাল, মাছ-মাংসের দাম বাড়ছে। কিন্তু মজুরি বাড়ে না। এখন তারা কীভাবে বাঁচবেন? তাঁর কথার সঙ্গে সুর মিলিয়ে নোয়ারাই ইউনিয়নের কুপিয়া গ্রামের দিনমজুর সোনা মিয়া বলছিলেন, ‘ইলেকশন আইলে হখল নেতাই অনেক কিছুই মুখে দিয়া জাইন। ইলেকশনের ফরে আর দেখা পাই না। জিনিসপত্রের যে দাম, টাকার অভাবে বউ-বাইচ্ছারে মাসে একদিন গরুর মাংস দূরের কথা, পোলট্রি মুরগিও খাওয়াইবার টেকা হাতে থাকে না।’
ছাতকের সুরমা ও চেলা নদীর তীরে কয়েক হাজার শ্রমিক রয়েছেন। তারা অর্ধশতাধিক পাথর ভাঙা ক্রাশার ও বালুর মিল এবং সুরমা নদীতে নোঙর করা বাল্কহেড ও ইঞ্জিনচালিত নৌকায় লোডিং-আনলোডিংয়ের কাজ করেন। সেখানে পুরুষের সঙ্গে পাল্লা দিয়েই কাজ করেন নারীরা। পরিবার-পরিজন নিয়ে বেঁচে থাকতে ও সন্তানের মুখে দু’মুঠো ভাত তুলে দিতে তারা কাজ করছেন। তবে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় তাঁরা কষ্টে দিন পার করছেন।
স্থানীয় হাটবাজারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নিত্যপ্রয়োজনীয় অধিকাংশ পণ্যের দাম বেড়েছে। ক্রেতাদের অভিযোগে, যে যার ইচ্ছে মতো ব্যবসা করছে। একই পণ্য আলাদা দামে বিক্রি হচ্ছে বিভিন্ন দোকানে। কাটারিভোগ চাল ও নাজিরশাইল প্রতি কেজি ৬৫-৭৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া বিআর-২৮ ৫৬-৬০, মোটা ৪৫-৫০, আটা খোলা ৪৫ ও প্যাকেট বিক্রি হচ্ছে ৫৫ টাকা কেজি। এক মাসের ব্যবধানে প্রতিটি চাল ৫-৭ ও আটা কেজিতে ৩ টাকা বেড়েছে।
সয়াবিন তেলে সরকারি দর ১৬৩ টাকা হলেও বাজারে পর্যাপ্ত সরবরাহ নেই বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের। ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ২৪০-২৫০ টাকায়, আগে ছিল ২১০ টাকা। খামারের বড় লাল মোরগ ৫৫০ থেকে বেড়ে হয়েছে ৬৫০ টাকা। সোনালি ও কক মোরগ ৩৫০ টাকায় বিক্রি হলেও কয়েকদিন আগেও ছিল ৩০০ টাকা। এ ছাড়া ৭০০ টাকার গরুর মাংস ৭৫০ এবং ১ হাজার টাকার খাসির মাংষ ১১শ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
স্থানীয়রা বলছেন, উপজেলার মাসিক সভায় বাজার তদারকি নিয়ে অনেকে কথা বললেও কোনো প্রতিকার নেই। একটি বেসরকারি স্কুলের শিক্ষক হোসমা বেগম বলেন, আয় বাড়েনি। অথচ জিনিসপত্রের দাম দিন দিন বেড়েই চলেছে। তাদের মতো নিম্ন মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষের পছন্দের খাবার খাওয়া কঠিন হয়ে গেছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকারিভাবে নানা ঘোষণার কথা শোনা গেলেও বাজারের গিয়ে এর সুফল পাওয়া যায় না।
এ বিষয়ে ছাতক বাজারের ভুসিমাল ব্যবসায়ী হাসান মিয়ার ভাষ্য, ‘আমরা খুচরা দোকানি। সিলেট থেকে পণ্য কিনে বিক্রি করতে হয়। বড় আড়তদাররা দাম বাড়ালে আমরা কী করব। বড় ব্যবসায়ীরাই সবসময় নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ করেন।’
নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে বাজার তদারকি করা হচ্ছে বলে দাবি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) গোলাম মোস্তফা মুন্নার। তিনি বলেন, দোকানে পণ্য বিক্রির তালিকা রাখার নির্দেশনা রয়েছে। এর পরও বিভিন্ন হাটবাজারে ভ্রাম্যামাণ আদালতের অভিযান চালানো হচ্ছে।
- বিষয় :
- দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদ