ঢাকা রোববার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

টিকিট ছাড়া পার্কে ৫ শিশু, কান ধরে দাঁড় করিয়ে রাখলেন ইউএনও

টিকিট ছাড়া পার্কে ৫ শিশু, কান ধরে দাঁড় করিয়ে রাখলেন ইউএনও
×

পার্কে কান ধরিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখা শিশুদের তিনজন। ছবি: সমকাল

শরীয়তপুর প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১৬ এপ্রিল ২০২৪ | ২০:১৩ | আপডেট: ১৭ এপ্রিল ২০২৪ | ১১:০৬

শরীয়তপুর পার্কে টিকিট ছাড়া প্রবেশের দায়ে ৫ শিশুকে আটক করে কান ধরিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখার অভিযোগ উঠেছে শরীয়তপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মাইনউদ্দিনের বিরুদ্ধে। গতকাল সোমবার রাত ৮টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। পরে রাত ৮টা ২০ মিনিটের দিকে ৩ শিশুকে ছেড়ে দিলেও রাত ৯টা ২০ মিনিট পর্যন্ত গ্রাম পুলিশ ও আনসার সদস্যদের পাহারায় ২ জনকে আটকে রাখা হয়। 

আটক হওয়া শিশুদের মধ্যে ২ জনের দাবি, তারা অসচ্ছল পরিবারের হওয়ায় তাদের বেশি সময় আটক রাখা হয়। 

শিশুদের আটক রাখার একটি ভিডিও সমকালে কাছে এসেছে। সেই ভিডিওতে দেখা যায়, গতকাল সোমবার রাত ৮টার দিকে ৪ শিশুকে আটক করে গ্রাম পুলিশ এবং ইউএনওর ব্যক্তিগত আনসার সদস্যরা। পরে তাদের পার্কে অবস্থানরত ইউএনও’র কাছে নিয়ে আসা হয়। পার্কের পূর্ব পাশে একটি কড়ই গাছের সামনে চার শিশুকে দর্শনার্থীদের সামনে ইউএনও কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে বলেন। এসময় গ্রাম পুলিশ ও আনসার সদস্যদের উদ্দেশে করে ইউএনওকে বলতে শোনা যায়, বাবা-মা না আসা পর্যন্ত তাদেরকে তোমরা ছাড়বে না। ওই ঘটনার সময় পার্কে উপস্থিত অনেক দর্শনার্থী মোবাইল ফোন দিয়ে ছবি তোলেন ও ভিডিও ধারণ করেন। 

দীর্ঘ সময় কান ধরে দাঁড় করিয়ে রাখার কারণে কালো রঙের টি-শার্ট পরা একটি শিশু কেঁদে দিয়ে বলে, ‘স্যার আমাকে ছেড়ে দেন। আমি আর কখনও এইখানে ঢুকব না। পরে ইউএনও শিশুটিকে বলেন, দেয়াল টপকে প্রবেশ করা অপরাধ। এটা চুরির সমান অপরাধ, তোমরা জান কিনা? এই কাজ যেন আর কখনও করতে না দেখি? এই বলে শিশুটিকে ছেড়ে দেন তিনি। এ সময় আরও একটি শিশুকে ছেড়ে দেওয়া হয়। পরে ছাড়া পাওয়া শিশুদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, টিকেটের টাকা দেওয়ার পর তাদেরকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। 

পরে ইউএনও নীল রঙের গেঞ্জি পরিহিত আরেকটি শিশুকে ডাকেন এবং ছেলেটির চুল নেড়েচেড়ে দেখেন। তাকে বলেন, চুল এত বড় রেখেছো কেন? সঙ্গে আরও কিছু নির্দেশ দিয়ে শিশু থেকে তিনি ছেড়ে দেন। এ সময় আরও এক শিশুকে ধরে নিয়ে আসেন আনসার সদস্যরা। পরে তাকে লাল গেঞ্জি পরিহিত আরেকটি শিশুর সঙ্গে কড়ই গাছের নিচে দাঁড় করিয়ে রাখেন। তখন ইউএনও গ্রাম পুলিশ সদস্যদের উদ্দেশে বলেন, পার্ক বন্ধ হওয়ার এক ঘণ্টা পর তাদেরকে ছাড়বে। এই বলে ইউএনও পার্ক থেকে চলে যান। পরে রাত নয়টা বিশ মিনিটের দিকে পার্ক বন্ধ করার সময় গ্রাম পুলিশ সদস্যরা ব্যস্ত হয়ে পরলে তখন ওই দুই শিশু তাদের চোখ এড়িয়ে পার্ক থেকে বের হয়ে যায়।

তোমাদের কেন আটকে রাখা হয়েছে এমন প্রশ্নের জবাবে শরীয়তপুর জেলা শহরের একটি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র বলে, ‘আমি পার্কের দেয়ালের উপর বসে খেলছিলাম। খেলার সময় অন্য বন্ধুরা আমাকে ধাক্কা মারলে আমি পার্কের ভেতরে পড়ে যাই। তখন আনসার সদস্যরা অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে আমাকে লাল শার্ট পরিহিত একজন স্যারের সামনে নিয়ে আসে। (ইউএনও লাল শার্ট পরিহিত অবস্থায় ছিলেন)। এসে দেখি কয়েকজনকে কানে ধরিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছেন। পরে আমাকেও একটি ছেলের সঙ্গে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। তখন ওই স্যার বলেন, ওদেরকে শিশু পার্ক বন্ধ হওয়ার এক ঘণ্টা পর ছাড়বে।’ 

অষ্টম শ্রেণির ওই ছাত্র আরও বলে, ‘অন্য একজন বলে, এই দুজনকে পিটিয়ে ছেড়ে দাও। এই সময় আমার স্কুলের আর এক বন্ধু বিষয়টি দেখে হাসতে থাকে। এখন যদি বন্ধু স্কুলের সবাইকে বলে দেয়, সবাই আমাকে দেখে হাসবে। তার চেয়ে ভালো আমি আর স্কুলে যাব না। কয়েকজনের কাছ থেকে ৩০ টাকা নিয়ে টিকিট কেটে তাদের ছেড়ে দিয়েছে। আমার পকেটে থাকা ২০ টাকা দিয়ে ছাড়া পেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আমাকে ছাড়েনি।’ 

এ শিশুর বাবা বলেন, ‘আমার ছেলে বাসায় এসে কান্নাকাটি করছিল। ভয়ে কিছু বলতে চায়নি। তাকে কোনো বকাঝকা করব না আশ্বস্ত করলে ছেলে আমাকে বলে, টিকেট ছাড়া পার্কে ঢুকেছিল। তাই তাকেসহ কয়েকজন শিশুকে নাকি কান ধরিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছিল। এসব দেখে নাকি তার বন্ধুরা হাসাহাসি করেছে। এখন সে বলছে, আর স্কুলে যাব না।’ 

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাইন উদ্দিন ঘটনা অস্বীকার করে বলেন, ‘ওই শিশুদের কান ধরিয়ে রাখার বিষয়টি আমার জানা নেই। আমি কাউকে কানে ধরে দাঁড় করিয়ে রাখিনি। কয়েকজন শিশু দেয়াল টপকে ঢুকেছিল। তারপর পাশে যারা ছিল তারা তাদের ধরে এনেছে। ওরা দাঁড়িয়ে ছিল, ভয়ে হয়তো কানে হাত দিয়েছে। তখন আমি তাদের বলেছি, কান থেকে হাত নামাও। আমি তাদের বলেছি, দেয়াল টপকে প্রবেশ করা অপরাধ। এটা চুরির সমান অপরাধ, তোমরা জান কিনা তা জিজ্ঞাসা করেছি। তোমরা আর কখনো এ কাজ করবে না। সৎ ও ভাল মানুষ হয় জীবন যাপন করবে এমন কথা বলে ছেড়ে দিয়েছি। আর দুই শিশুকে দেড় ঘণ্টা আটকে রাখার ঘটনাটি আমার জানা নেই। আর আমি খোঁজ নিয়ে দেখবে, এ বিষয়ে গ্রাম পুলিশ সদস্যদের কোনো অবহেলা রয়েছে কিনা। 

শরীয়তপুর আদালতে শিশু ও কিশোর অপরাধ নিয়ে কাজ করেন অ্যাডভোকেট তৌহিদ কোতোয়াল। এ বিষয়ে তিনি বলেন, শিশুদের মন কোমল ও নরম হয়। যেকোনো পরিস্থিতিতে তাদের সঙ্গে কোমল ও নমনীয় আচরণ করতে হবে। আর তাদের জন্য দেশে আলাদা আইন আলাদা আদালত করা হয়েছে। তারা কোনো অপরাধ করলে আদালত তাদের অপরাধের বিচার করবেন। কিন্তু জনসম্মুখে তাদেরকে কোনো অপরাধের শাস্তি কেউ দিতে পারবেন না। জনসম্মুখে কোন শাস্তির ঘটনা ঘটলে শিশুটি একটি বিক্ষিপ্ত মনোভাব নিয়ে বড় হবে, যা সমাজের জন্য ক্ষতিকর। আর আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কোনো লোক কিভাবে আইন বহির্ভূতভাবে এমন কাজ করতে পারেন তা বুঝতে পারছি না। আর আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কোনো কর্মকর্তা যদি অপরাধ করে থাকেন তাহলে তার বিরুদ্ধে অবশ্যই বিভাগীয় শাস্তি গ্রহণ করা উচিত।’

আরও পড়ুন

×