বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন
আশ্রয়ের খোঁজে শহীদ সাব্বিরের স্ত্রী-সন্তান
নেত্রকোনা প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৫ জুলাই ২০২৬ | ০৮:২৯ | আপডেট: ২৫ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৫২
| প্রিন্ট সংস্করণ
বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে নিহত সাব্বির ইসলামের পরিবারের দিন কাটছে অসহায় অবস্থায়। নিজের কোনো ভিটেমাটি না থাকায় তাঁর দাফন হয়েছে অন্যের জমিতে। ভাড়া পরিশোধ করতে না পারায় বাসা ছাড়তে হয়েছে পরিবারটিকে। এখন চার সন্তান নিয়ে মানুষের বাড়ি বাড়ি আশ্রয় খুঁজে বেড়াচ্ছেন তাঁর স্ত্রী ফরিদা আক্তার। অভাবের কারণে সন্তানদের লেখাপড়াও বন্ধ হয়ে গেছে।
জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সকাল ৯টার দিকে ঢাকার সাভারের আশুলিয়া এলাকার ভাড়া বাসা থেকে বের হন সাব্বির ইসলাম। উদ্দেশ্য ছিল কাজের সন্ধানে যাওয়া এবং বাজার-সদাই নিয়ে ঘরে ফেরা, কিন্তু বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে যোগ দেন তিনি। সকাল সাড়ে ৯টার দিকে সাভারে গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়। একটি গুলি তাঁর ডান কানের পাশ দিয়ে ঢুকে মাথার পেছন দিয়ে বের হয়ে যায়। জুলাই আন্দোলনে শহীদের স্বীকৃতিও পেয়েছেন তিনি।
শহীদ সাব্বির ইসলাম নেত্রকোনার আটপাড়া উপজেলার লুনেশ্বর ইউনিয়নের খিলা বাউন্দি গ্রামের মৃত শুকুর আলীর ছেলে। প্রায় দুই দশক আগে বানিয়াজান গ্রামের জামাল উদ্দিনের মেয়ে ফরিদা আক্তারকে বিয়ে করেন তিনি। বিয়ের পর শ্বশুর বাড়িতেই বসবাস শুরু করেন। সেখানে দিনমজুরিসহ বিভিন্ন কাজ করতেন। পরে জীবিকার তাগিদে আশুলিয়ায় গিয়ে একটি সরিষার তেলের কারখানায় চাকরি নেন। স্ত্রী ও চার সন্তানকে নিয়ে ভাড়া বাসায় থাকতেন। ২০২৪ সালে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন শুরু হলে কারখানাটি বন্ধ হয়ে যায়। বেকার হয়ে পড়েন সাব্বির ইসলাম। ৫ আগস্ট সকালে কাজের সন্ধানে বের হলেও আর ঘরে ফেরা হয়নি তাঁর।
নিজেদের কোনো জমি না থাকায় সাব্বিরের লাশ দাফন করা হয় বানিয়াজান গ্রামের অন্যের জমিতে। তাঁর পরিবারে তিন মেয়ে ও এক ছেলে রয়েছে। ১২ বছরের ছেলে মমিন মিয়া বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী। বড় মেয়ে লিজা আক্তার অর্থাভাবে পঞ্চম শ্রেণির পর আর লেখাপড়া চালিয়ে যেতে পারেনি।
আটপাড়া উপজেলা সদরের একটি জরাজীর্ণ ঘরের বারান্দায় বসে কথা হয় ফরিদা আক্তারের সঙ্গে। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, আন্দোলনের সময় কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাদের সংসার প্রায় অচল হয়ে পড়ে। ধারদেনা করে চলছিল সংসার। শিক্ষার্থীদের ওপর গুলির ঘটনা দেখে তাঁর স্বামী আন্দোলনে যোগ দিয়ে নিহত হন। তিনি বলেন, ‘চার সন্তান নিয়ে আমি এখন কোথায় যাব? থাকার কোনো জায়গা নেই। ভাড়া দিতে না পারলে বাসা থেকে বের করে দেয়। সন্তানদের লেখাপড়া বন্ধ হয়ে গেছে। আমার ছেলেটাও প্রতিবন্ধী। বড় মেয়ের বিয়ের বয়স হচ্ছে। কিভাবে সংসার চালাব, বুঝতে পারছি না।’
আটপাড়া উপজেলার বানিয়াজান গ্রামে গিয়ে ফরিদা আক্তারের ভাই চঞ্চল মিয়ার সঙ্গে কথা হয়। তিনি জানান, জায়গার সংকট ও পারিবারিক সমস্যার কারণে তাঁর বোন ভাড়া বাসায় উঠেছিলেন, কিন্তু কয়েক মাসের ভাড়া পরিশোধ করতে না পারায় বের করে দিয়েছেন বাড়ির মালিক। এখন তারা বিভিন্ন আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতজনের বাড়িতে আশ্রয় নিচ্ছেন।
বানিয়াজান গ্রামের আগুর মিয়া বলেন, শহীদ সাব্বিরের পরিবার চরম সংকটের মধ্যে আছে। পরিবারটিকে সরকারি খাসজমি বন্দোবস্ত দিয়ে একটি ঘর নির্মাণ করে দেওয়া উচিত। একজন শহীদের পরিবার এভাবে মানুষের বাড়ি বাড়ি ঘুরবে, এটা মেনে নেওয়া যায় না।
আটপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহনুর রহমানের ভাষ্য, পরিবারটি সরকারি নিয়ম অনুযায়ী বিভিন্ন সহায়তা পাচ্ছে। তাদের নিজস্ব জমি না থাকায় নীতিমালা অনুযায়ী খাসজমিসহ একটি ঘরের ব্যবস্থা করে দেওয়ার চেষ্টা করা হবে।
- বিষয় :
- আশ্রয়ণ