ঢাকা মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

উৎপাদন বাড়লেও সংকট কাটছে না চা-শিল্পে, লোকসানে বাগান

উৎপাদন বাড়লেও সংকট কাটছে না চা-শিল্পে, লোকসানে বাগান
×

মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গলে ভাড়াউড়া চা বাগানে গতকাল সোমবার পাতা তোলার কাজে ব্যস্ত তিন চা শ্রমিক সমকাল

 শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ০৪ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:০৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

ব্রিটিশ আমল থেকেই দেশের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছে চা-শিল্প। সময়ের সঙ্গে উৎপাদন বাড়লেও সেই অনুপাতে বাড়েনি মুনাফা। জ্বালানি, সার, কীটনাশক, বিদ্যুৎ ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধিতে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে বহুগুণ। ফলে রেকর্ড উৎপাদনের পরও দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় এই খাত এখন তীব্র আর্থিক সংকটে।

বাংলাদেশ চা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে দেশে রেকর্ড ১০ কোটি দুই লাখ কেজি, ২০২৪ সালে ৯ কোটি ৩০ লাখ কেজি এবং ২০২৫ সালে ৯ কোটি ৪৯ লাখ কেজি চা উৎপাদিত হয়েছে। চলতি ২০২৬ সালে ১০ কোটি ৪০ লাখ কেজি চা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

উৎপাদন বৃদ্ধির বিপরীতে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে খরচ। বাংলাদেশ টি অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে প্রতি কেজি চা উৎপাদনে গড় ব্যয় হয়েছে প্রায় ২৬০ টাকা। অথচ নিলামে গড় বিক্রয়মূল্য ছিল ২০৮ টাকা ৮৮ পয়সা। ফলে প্রতি কেজিতে বাগানগুলোর ক্ষতি বা ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৫১ টাকা ১২ পয়সা। গত এক দশকে যেখানে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে ৭৮ দশমিক ৩১ শতাংশ, সেখানে ২০০২ সালের পর থেকে চা রপ্তানি কমেছে প্রায় ৭৯ শতাংশ।
চা-বাগান মালিকদের অভিযোগ, চা-শিল্পকে কৃষি খাতের পরিবর্তে শিল্প খাত হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করায় উচ্চ সুদে ঋণ নিতে হচ্ছে। অতীতের ব্যাংক ঋণ পরিশোধ করতে না পারায় অনেক বাগান নতুন করে আর ঋণ পাচ্ছে না। অন্যদিকে শ্রমিক নেতাদের দাবি, বর্তমান জীবনযাত্রার ব্যয়ের তুলনায় তাদের দৈনিক মজুরি এখনও অপ্রতুল।
চাতলাপুর চা-বাগানের ব্যবস্থাপক শুভঙ্কর চন্দ্র নাথ বলেন, চা উৎপাদন বাড়লেও অধিকাংশ বাগানের আর্থিক অবস্থা ভালো নয়। উৎপাদন 
খরচ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাওয়ায় অনেক বাগান পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তুলনামূলক ভালো দাম পেতে উচ্চমানের চা উৎপাদনের বিকল্প নেই।
বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাংগঠনিক সম্পাদক বিজয় হাজড়া বলেন, বর্তমানে চা উৎপাদনের সার্বিক অবস্থা আগের তুলনায় ভালো। উৎপাদন বাড়ছে, শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে মজুরি বৃদ্ধির বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন।

এদিকে এই সংকট থেকে উত্তরণে গঠিত সরকারি টাস্কফোর্স আটটি অগ্রাধিকার খাতে ৫৯টি সুপারিশ পেশ করেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো– চা-বাগানকে পুনরায় ‘কৃষি’ খাত হিসেবে ঘোষণা, ছয় শতাংশ সরল সুদে ঋণ সুবিধা প্রদান, পুরোনো ঋণ পুনর্গঠন, ভ্যাট হ্রাস, পুরোনো চা গাছ তুলে নতুন চারা রোপণ (পুনরোপণ), রপ্তানি সম্প্রসারণ ও বিনোয়োগ বৃদ্ধি।
এ ছাড়া চা-শিল্পের আর্থিক মন্দা কাটাতে দুই হাজার ৫০ কোটি টাকার টি সেক্টর অ্যাসিস্ট্যান্স ফান্ড গঠনেরও প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি একটি জাতীয় চা পুনরোপণ মহাপরিকল্পনা গ্রহণ, নিজস্ব জাতীয় চা ব্র্যান্ড তৈরি, দেশীয় চায়ের জিআই (জিআই) স্বীকৃতি অর্জন এবং পাকিস্তান, মিসর, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও রাশিয়ায় রপ্তানি বাজার পুনর্দখলের জোর তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ চা বোর্ডের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো. মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন, রোগবালাই, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি ও পানিসংকটের মতো নানাবিধ প্রতিকূলতা মোকাবিলা করেই চা-শিল্প এগিয়ে যাচ্ছে। উৎপাদন বৃদ্ধি, মানোন্নয়ন এবং নতুন নতুন আন্তর্জাতিক বাজার অনুসন্ধানের মাধ্যমে এ শিল্পকে পুনরায় লাভজনক করার কাজ চলছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু উৎপাদন বাড়ানোই যথেষ্ট নয়; উৎপাদন ব্যয় কমানো, নিলামে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, সহজ শর্তে অর্থায়ন এবং শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি টাস্কফোর্সের ৫৯টি সুপারিশ দ্রুত বাস্তবায়িত হলে দেশীয় চা-শিল্প আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারবে বলে আশা করছেন তারা।
 

আরও পড়ুন

×