ঢাকা রোববার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

চট্টগ্রামে ডেঙ্গু

দুধের শিশুকে এতিম করে না ফেরার দেশে মা

দুধের শিশুকে এতিম করে না ফেরার দেশে মা
×

রাশেদা বেগম রিমি

 শৈবাল আচার্য্য, চট্টগ্রাম 

প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:০২

| প্রিন্ট সংস্করণ

এক মাস আগে দ্বিতীয়বারের মতো মা হন রাশেদা বেগম রিমি (২৯)। দ্বিতীয় সন্তানের আগমনে আনন্দের বন্যা বয়ে যায় পুরো পরিবারে। সন্তান জন্মের পর থেকে আত্মীয়স্বজনের আনাগোনায় অন্যরকম এক আবহে সময় কাটছিল রিমি ও আমিরুল হোসাইন দম্পতির। তবে সেই সুখ ফিকে হয়ে গেল খুব অল্প সময়ে। ডেঙ্গুর ছোবলে প্রাণ দিতে হলো এই গৃহবধূকে। দুগ্ধজাতসহ দুই ছেলেকে এতিম করে চলে গেলেন না ফেরার দেশে।

চট্টগ্রাম নগরের আগ্রাবাদের মা ও শিশু হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) গত বৃহস্পতিবার চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয় রাশেদা বেগম রিমির। হাসপাতালের ডেথ রেকর্ডে মৃত্যুর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘কারডিওরেসপিরেটরি ফেইলিয়র অ্যান্ড এক্সপ্যান্ডেড ডেঙ্গু সিন্ড্রোম।’ যা চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায়, ডেঙ্গু রোগের অত্যন্ত জটিল, বিরল এবং জীবনঘাতী পর্যায়।
চিকিৎসকরা বলেন, ডেঙ্গু যখন শরীরের প্রধান প্রধান অঙ্গগুলোকে (যেমন– হার্ট, ফুসফুস, লিভার, মস্তিষ্ক) সরাসরি আক্রমণ করে অকেজো করে দেয়, তখন তাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় ‘এক্সপ্যান্ডেড ডেঙ্গু সিন্ড্রোম’ বলা হয়। এর ফলে রোগীর হৃদযন্ত্র ও শ্বাসতন্ত্র একসঙ্গে বিকল হতে পারে।

রিমি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ থেকে উচ্চশিক্ষার পাঠ চুকিয়ে ২০২৪ সালে চট্টগ্রামের নিজ উপজেলা সন্দ্বীপের বাউরিয়া ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডে স্বাস্থ্য সহকারী হিসেবে যোগ দেন। তাঁর স্বামী আমিরুল হোসাইন নগরের মোস্তফা হাকিম ডিগ্রি কলেজের প্রভাষক। দ্বিতীয় সন্তানের জন্মের কারণে মাতৃত্বকালীন ছুটিতে ছিলেন রিমি। এ কারণে বেশ কিছুদিন ধরে হালিশহর এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতেন। সম্প্রতি এ বাসাটি ছেড়ে দক্ষিণ কাট্টলীর ছদু চৌধুরী সড়কের একতা আবাসিক এলাকায় নতুন বাসা নিয়েছিলেন তারা। পরিবারের সদস্যরা মনে করছেন, হালিশহরে থাকাকালীন সময়ে তিনি ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন।

পরিবারসহ সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, গত ৩ সেপ্টেম্বর হঠাৎ রিমির শরীরে দেখা দেয় তীব্র জ্বর। ক্রমেই শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় পরীক্ষার পর তাঁর ডেঙ্গু পজিটিভ শনাক্ত হয়। এক দিন পর তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এর মধ্যে গত বুধবার রাতে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে দ্রুত আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়। চিকিৎসকরা তাঁর শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হবে এমন আশায় ছিলেন। তবে বৃহস্পতিবার ভোর থেকে রিমির শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি ঘটে, নামতে থাকে প্লাটিলেট। যে কারণে চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে সকাল ৯টার দিকে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। ওই গৃহবধূর এমন মৃত্যুকে কোনোভাবে মেনে নিতে পারছেন না কেউ। চিকিৎসকরা বলছেন, সন্তান জন্মের মাত্র এক মাসের মাথায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ায় তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়েছে। সন্তান প্রসবের কারণে শারীরিকভাবে খুব দুর্বল ছিলেন তিনি, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও কমে গিয়েছিল।

স্ত্রীকে হারিয়ে পাগলপ্রায় আমিরুল হোসাইন। বিলাপ করতে করতে তিনি বলেন, ‘আল্লাহ কেন আমাকে এত বড় শাস্তি দিলে? আমার দুই মাসুম বাচ্চাকে কেন এতিম করে দিলে? তারা এখন কাকে মা বলে ডাকবে? ডেঙ্গু আমার সাজানো সংসারকে তছনছ করে দিল। আমার দুগ্ধজাত সন্তানটি মায়ের পরশ, আদর, স্নেহও নিতে পারল না।’
রিমির মতো চট্টগ্রামে ডেঙ্গুতে প্রতিনিয়ত প্রাণ দিতে হচ্ছে আরও অনেককে। এতে দীর্ঘ হচ্ছে লাশের সারি। চলতি মাসের শুরু থেকে ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছে ডেঙ্গু। সেপ্টেম্বরের প্রথম ১১ দিনে রেকর্ড ৭০৬ জন নতুন করে আক্রান্ত হয়েছেন, প্রাণ গেছে চারজনের। আক্রান্ত ও মৃত্যুর এমন হার চলতি বছরের ৯ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। এ পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছেন দুই হাজার ৭৪২ জন, মৃত্যু হয়েছে ৯ জনের।
চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ সাজেদুর রহমান বলেন, মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে প্রাণ গেছে চারজনের, সেপ্টেম্বরের ১১ দিনে আক্রান্ত হয়েছে সাত শতাধিক– বিষয়টি উদ্বেগের। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে মশা মারতে না পারলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।
চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল তসলিম উদ্দীন বলেন, ডেঙ্গু ওয়ার্ডে প্রতিনিয়ত বাড়ছে রোগীর চাপ। বাড়তি রোগীর চাপ সামাল দিতে ডাক্তার, নার্সসহ সবাইকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। নতুন করে আক্রান্তের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে দায়িত্বশীলদের প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে।
জেনারেল হাসপাতালের জ্যেষ্ঠ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. এএসএম লুৎফুল কবির শিমুল বলেন, অনেকে চিকিৎসা নিতে অবহেলা করছে। যে কারণে শারীরিক অবস্থা আরও জটিল হচ্ছে।
 

আরও পড়ুন

×