তুরাগ নদে প্রত্যাশা সেতু
ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতায় মাঝ পথে আটকে গেছে নির্মাণকাজ
আছাদুজ্জামান
প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:০৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
গাজীপুরের টঙ্গীর তুরাগ নদে পাঁচ বছর আগে শুরু হয়েছিল প্রত্যাশা সেতুর নির্মাণকাজ। তিন বছর মেয়াদি প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় ৬৮ কোটি টাকা। কাজও শুরু হয়। সেতুর ১৪টি পিলারের ১১টিতে স্প্যানও বসে। এই পর্যায়ে এসে ভূমি অধিগ্রহণ নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। বাকি তিনটি পিলার ও অ্যাপ্রোচ সড়কের কাজ আটকে যায়। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অপারগতা প্রকাশ করে প্রকল্প শেষ না করেই সরে যায়। নতুন করে কোনো ঠিকাদার নিয়োগ না হওয়ায় প্রকল্পের কাজ অসমাপ্তই রয়ে যায়।
এদিকে সেতু হওয়ার খবরে আশপাশের মানুষ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিল। তারা নতুন ব্রিজ ঘিরে স্বপ্ন দেখছিল, ভোগান্তির দিন বুঝি শেষ হবে এইবার। কিন্তু তাদের সেই আশা পূরণ হয়নি। পুরোনো, জরাজীর্ণ বেইলি ব্রিজ দিয়েই নদী পার হতে হয় দুই পাশের লক্ষাধিক মানুষকে।
প্রকল্প সূত্র ও সরেজমিন জানা গেছে, তুরাগ নদীর ওপর ৪৯৮ মিটার দীর্ঘ প্রত্যাশা সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০২২ সালে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ঢাকা জেলা এ প্রকল্পের বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান। প্রকল্পের কাজ পায় ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড নামে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। কাজ শুরু হওয়ার পর অধিগ্রহণ করা জমির মালিকদের আপত্তিতে আবার কাজ বন্ধ হয়ে যায়। জমির মালিকরা অভিযোগ করেন, তারা টাকা পাননি। পরে বিষয়টি উচ্চ আদালত পর্যন্ত গড়ায়।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘সেতুর কাজ করতে গিয়ে আমাদের প্রতিষ্ঠান বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে। জায়গা-সংক্রান্ত সমস্যার সমাধান না হওয়ায় আমরা এলজিইডিকে কাজ বুঝিয়ে দিয়ে সরে এসেছি।’
অধিগ্রহণ করা জমির টাকা না পাওয়া ঢাকা অংশের জমির মালিক হাজি মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘প্রথমে এলজিইডির পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, ব্রিজের পাইলিংয়ের কাজ করার সুযোগ দিলে জায়গার পাওনা দ্রুত বুঝিয়ে দেওয়া হবে। কাজ শুরু হলে আমি বাধা দিয়েছিলাম। পরে এলজিইডি টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলে সরে আসি। এরপর ব্যক্তিগত প্রয়োজনে দেশের বাইরে যাই। ফিরে এসে যোগাযোগ করেও আশানুরূপ ফল পাইনি।’
তিনি বলেন, ‘সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ এখন আমার সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। ভূমি অধিগ্রহণ কর্তৃপক্ষ ও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও যোগাযোগ করা হচ্ছে। আমাকে যেভাবে ভোগান্তিতে ফেলা হয়েছে, তা কাম্য নয়। তারা চাইলে অনেক আগেই আমার পাওনা বুঝিয়ে দিতে পারত।’
সর্বশেষ কী অবস্থা, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘শুনেছি, এলজিইডির পক্ষ থেকে ঢাকা জেলা প্রশাসক বরাবর টাকা জমা দিয়েছে। এখন সেখান থেকে পাওয়ার অপেক্ষার প্রহর গুনছি।’
গাজীপুরের টঙ্গী থানার মুদাফা এলাকার মো. ইকবাল হোসেনের জমি পড়েছে সেতুর অংশে। তিনি বলেন, ‘হঠাৎ একটি নোটিশ পাই। সেখানে দেখি, প্রত্যাশা সেতুতে আমাদের ৮ শতাংশ জায়গা পড়েছে। এলজিইডির সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা দ্রুত জায়গার মূল্য দেওয়ার কথা বলেছিল। পরে যোগাযোগ করলে বিষয়টি এড়িয়ে যায়।’
এদিকে সেতুর কাজ বন্ধ থাকায় ভোগান্তির শেষ নেই স্থানীয়দের। দীর্ঘদিনের পুরোনো বেইলি ব্রিজ জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। রিকশা ছাড়া অন্য কোনো যানবাহন ব্রিজ দিয়ে চলাচল করতে পারে না।
ফলে আশপাশের মানুষকে দীর্ঘ পথ ঘুরে চলাচল করতে হয়।
টঙ্গী স্টেশন এলাকার বাসিন্দা আলমগীর হোসেন বলেন, ‘সেতুর কাজের অগ্রগতি দেখে ভেবেছিলাম, এবার চালু হবে। কিন্তু কাজ বন্ধ হয়ে গেছে। জরুরি প্রয়োজনে তুরাগ যেতে হলে অনেক পথ ঘুরতে হয়।’
তুরাগের বাসিন্দা শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘নদীর ওপারে আমাদের অনেক আত্মীয়স্বজন। কোনো প্রয়োজনে সেখানে যেতে হলে অনেক পথ ঘুরতে হয়। নতুন সেতুর কাজ শুরু হওয়ায় আমরা আশাবাদী হয়েছিলাম। এখন দ্রুত জটিলতার সমাধান চাই।’
জানতে চাইলে গ্রামীণ সড়কের গুরুত্বপূর্ণ সেতু নির্মাণ প্রকল্পের পরিচালক ড. মো. জিয়াউল ইসলাম মজুমদার সমকালকে বলেন, ‘এলজিইডির নির্দেশ মতে সময়মতো কাজ সম্পন্ন করাই আমাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ এই সেতুটি সময়মতো সম্পন্ন করতে না পারার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ দুটি বিষয় ছিল। তার মধ্যে ঢাকা ও গাজীপুর অংশের যে ভূমি জটিলতা দেখা দিয়েছিল, ইতোমধ্যে ঢাকা অংশেরটি সম্পূর্ণ হয়েছে। অর্থ ছাড় পেলে কিছুদিনের মধ্যে টঙ্গী অংশের ভূমির মালিকদের অর্থ গাজীপুর জেলা প্রশাসন বরাবর আমাদের পক্ষ থেকে জমা দেওয়া হবে।’
তবে এলজিইডি-ঢাকা জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শরীফুজ্জামান জমির মালিকদের টাকা না দেওয়ার অভিযোগ নাকচ করেছেন। তিনি বলেন, ‘অভিযোগ ঠিক নয়। সেতুর দুই পাশে যাদের জায়গা পড়েছে, তাদের সঙ্গে আমরা সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছি।’ তিনি আরও বলেন, অ্যাপ্রোচের ঢাকা অংশের টাকা জেলা প্রশাসক বরাবর জমা দেওয়া হয়েছে। বরাদ্দ পেলে গাজীপুর অংশের টাকা জেলা প্রশাসক বরাবর জমা দেওয়া হবে।
নতুন করে ঠিকাদার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে কিনা, জানতে চাইলে নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন, ‘প্রকল্পের নতুন ঠিকাদার নিয়োগ প্রক্রিয়া চলমান। আশা করা যাচ্ছে, সব প্রক্রিয়া শেষ করে দ্রুত সময়ের মধ্যে অসমাপ্ত কাজ শুরু করা যাবে।’
- বিষয় :
- সেতু