ঘরে ঘরে স্বজনের কান্না
মাছ ধরতে গিয়ে সাড়ে পাঁচ মাসেও ফেরেননি ৯ জন
ফিরে আসা ছেলে তাহমিদের মাথায় হাত ধরে বসে আছেন কহিনুর বেগম। পাশে মিয়ানমারের কারাগারে বন্দি অন্য কয়েক জেলের স্বজন। গতকাল সোমবার লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলার চর পোড়াগাছায় সমকাল
আতোয়ার রহমান মনির, লক্ষ্মীপুর
প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:৩১
| প্রিন্ট সংস্করণ
ভাতের জন্য, সংসারের জন্য সাগরে মাছ ধরতে গেছেন সন্তান। যাওয়ার সময় মা কহিনুর বেগমকে বলে যান, ‘আমরা আসব, তোমরা দোয়া করিও।’ কিন্তু ছয়-সাত মাস হয়ে গেল, ছেলে আর আসে না। এখন শুধু পথের দিকে তাকিয়ে আছেন এই মা। তাঁর একটাই আকুতি, বুকের মানিককে ঘরে ফিরে পাওয়া।
কহিনুর বেগম লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলার চর পোড়াগাছা ইউনিয়নের চর পোড়াগাছার আবু তাহেরের স্ত্রী। তাঁর দুই ছেলে গত মার্চের শেষ দিকে বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরতে গিয়ে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর হাতে আটক হন। এদের মধ্যে কিশোর বয়সী ছোট ছেলে মো. তাহমিদ (১৫) ফিরলেও বড় ছেলে মো. তামজিদ (২০) এখনও বন্দি। গতকাল সোমবার বড় ছেলের কথা বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন কহিনুর। তাঁর মতো দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন জেলার রামগতি ও কমলনগরের আরও আট জেলের পরিবারের সদস্যরা।
এই জেলেরা ছিলেন পরিবারের উপার্জনক্ষম সদস্য। বিদেশে বন্দি থাকায় তাদের কারও ঘরে খাবারের অভাব, আবার কেউ সন্তানদের পড়াশোনার খরচ জোগাতেও হিমশিম খাচ্ছেন। গতকাল অশ্রুভেজা আঁচলে ছেলে তামজিদের ছবি মুছতে মুছতে কোহিনুর বেগম বলেন, পেটের জ্বালা মেটাতে ছেলেদের সাগরে মাছ ধরতে পাঠিয়েছিলেন। গত রমজানের ঈদের এক দিন পর তারা সাগরে যায়। কিন্তু কক্সবাজারের সীমান্ত এলাকা থেকে অন্যদের সঙ্গে তাঁর দুই ছেলেকে ধরে নিয়ে যায় মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। তাঁর ভাষ্য, ‘যাওয়ার সময় (ওরা) বলেছে– মা, আমরা আসব, তোমরা দোয়া করিও। আমি প্রতিদিন নামাজ পড়ে দোয়া করি, আল্লাহ যেন আমার সন্তানদের ঘরে ফিরিয়ে দেন। ছোট ছেলেকে অনেক কষ্টে, ধারদেনা করে ফিরিয়ে এনেছি। বড় ছেলে এখনও বন্দি।’
জেলে স্বজনদের দেওয়া তথ্যমতে, চলতি বছরের ২৩ মার্চ কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার হোয়ানক থেকে ‘মা-বাবার দোয়া’ নামের একটি মাছ ধরার ট্রলার বঙ্গোপসাগরে রওনা হয়। এতে ছিলেন ১৬ জন মাঝিমাল্লা ও জেলে। তাদের বাড়ি লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায়। পরদিন থেকে তাদের সঙ্গে সবার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এ ঘটনায় ২৮ মার্চ মহেশখালী থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন ট্রলার মালিক মিজানুর রহমান। পরে জানা যায়, তাদের মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ধরে নিয়ে গেছে।
বয়স কম হওয়ায় পাঁচ মাসের বেশি মিয়ানমারের কারাগারে থাকার পর তাহমিদকে ছেড়ে দেওয়া হয়। গত সপ্তাহে দেশে ফেরে সে। বন্দিদশার কথা বর্ণনা করতে গিয়ে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ে তাহমিদ। তার ভাষ্য, সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে তারা ঝড়ের কবলে পড়ে। ট্রলার দিক হারিয়ে মিয়ানমারের দিকে চলে যায়। পরে মিয়ানমারের বাহিনী তাদের আটক করে কারাগারে পাঠায়। সেখানে অনেক কষ্টে ছিল জানিয়ে সে বলে, ‘আমার বয়স কম হওয়ায় আমাকে স্থানীয় এক মেম্বারের জিম্মায় দেওয়া হয়। এরপর দূতাবাসের মাধ্যমে দেশে ফিরেছি। কিন্তু আমার ভাইসহ যারা সেখানে আছে, তাদের কথা মনে হলে খুব কষ্ট হয়।’ তাদেরও দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি জানায় সে।
স্বজনদের দেওয়া তথ্যমতে, লক্ষ্মীপুরের যেসব জেলে এখনও সে দেশের কারাগারে বন্দি, তারা হলেন– রামগতির চর গজারিয়ার আমজাদ হোসেনের ছেলে মো. জুয়েল (৩০), সোনালী গ্রাম এলাকার মো. রুহুল আমিনের ছেলে ফরহাদ হোসেন (২২), চর পোড়াগাছার রফিকুল ইসলামের ছেলে মো. নিরব (৩৯), আবু তাহেরের ছেলে মো. তামজিদ (২০), শাহাব উদ্দিনের ছেলে মো. রাকিব হোসেন (৩১) ও মো. আবুল কালামের ছেলে সাদ্দাম হোসেন (৩৩), চর গজারিয়া এলাকার নুর ইসলামের ছেলে মো. মেজবাহ উদ্দিন (৪২), চর গাজীর দক্ষিণ টুমচর গ্রামের নূর উদ্দিনের ছেলে মো. লিটন (৩১), কমলনগরের চর জগবন্ধু এলাকার মৃত আনিছুল হকের ছেলে মো. অজি উল্যাহ (৬১)। তারা আরও যে জেলেদের তালিকা জমা দিয়েছেন, তারা হলেন– চট্টগ্রামের উত্তর কাট্টলীর মো. কামাল হোসেন (৪৪), কক্সবাজারের মহেশখালী নয়াপাড়ার তারেক রহমান (২৫), ভোলার দৌলতখানের চর ছোট লামছি ধলীর মো. সাইমুন (১৯), নোয়াখালীর সুবর্ণচরের উত্তর চর বাঘার জাবের হোসেন (৩৭), চর পানাউল্যাহর মো. সোহাগ (১৯) ও মো. শাহজাহান (৪২)।
রামগতির ইউএনও শেখ এহসান উদ্দীন জানান, বন্দি জেলেদের দেশে ফিরিয়ে আনতে তারা সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। লক্ষ্মীপুর-৪ (রামগতি-কমলনগর) আসনের সংসদ সদস্য ও সংসদের হুইপ এবিএম আশরাফ উদ্দিন নিজানের সঙ্গে কথা বলে তাদের দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা নেবেন। এসব জেলের পরিবার যেন সহায়তা পায়, সে বিষয়েও উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি।
- বিষয় :
- কান্না