কারাগারে তারেক সাঈদকে মারধরের অভিযোগ, স্থানান্তর
তারেক সাঈদ মোহাম্মদ
মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:৪৪ | আপডেট: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:৫৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
নারায়ণগঞ্জের সাত খুন মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক র্যাব কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল (বরখাস্ত) তারেক সাঈদ মোহাম্মদকে মুন্সীগঞ্জ জেলা কারাগারে নির্যাতনের অভিযোগ তুলেছেন স্বজনরা। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করে কর্তৃপক্ষ বলেছে, তিনি কারাগারে উচ্ছৃঙ্খল ও অশোভন আচরণ এবং কারাবিধি লঙ্ঘন করেছেন। এ জন্য তাঁর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
তারেক সাঈদকে এরই মধ্যে কিশোরগঞ্জ জেলা কারাগারে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। মুন্সীগঞ্জ জেলা কারাগারের জেল সুপার জান্নাত-উল-ফরহাদ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত তারেক সাঈদকে কারাগারে নির্যাতনের খবর পেয়ে তাঁর মা দিলুয়ারা বেগম গত সোমবার মুন্সীগঞ্জের সিভিল সার্জন বরাবর লিখিত আবেদন করেন। এতে তাঁর ছেলের সুচিকিৎসার দাবি জানান। সাঈদের ভাই মুসা মতিউর রহমান আবেদনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
স্বজনদের অভিযোগ, গত ১৬ সেপ্টেম্বর রাতে জেল সুপার জান্নাত-উল-ফরহাদের নির্দেশে অন্তত পাঁচজন কারারক্ষী কারাগারের বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করে তারেক সাঈদের ওপর লাঠি নিয়ে হামলা করেন। এতে তাঁর মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে জখম হয়। এ সময় সিসিটিভি বন্ধ রাখা হয়। পরে কারারক্ষীদের কাছ থেকে স্বজনরা এ তথ্য জানতে পারেন।
কারাগারের ভেতরে অন্য এক বন্দিকে জেল সুপারের ওপর নোংরা পানি ফেলতে উস্কানি দেওয়ার অভিযোগকে কেন্দ্র করে তারেক সাঈদের ওপর এ হামলা হয় বলে কারাসূত্রে জানা গেছে।
তারেক সাঈদের ভাই মুসা মতিউর রহমান অভিযোগ করেন, সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানের বিষয়ে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল তথ্য প্রকাশের আগ্রহ দেখিয়েছিলেন তারেক সাঈদ। সেই তথ্য যাতে প্রকাশ্যে না আসে, সে জন্য জিয়ার লোকদের মাধ্যমে তারেক সাঈদের ওপর এ হামলা চালানো হয়েছে। তারা এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত চান।
তারেক সাঈদের পরিবারের দাবি, কেরানীগঞ্জ জেলে থাকা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার আসামি ও অকালীন অবসরে পাঠানো আরেক সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানের বিষয়ে সংবেদনশীল তথ্য প্রকাশে আগ্রহ দেখানোর কারণে জিয়াউল আহসানের নির্দেশে তারেক সাঈদের ওপর এ হামলা চালানো হয়েছে।
তারেক সাঈদের পরিবারের পক্ষ থেকে তাঁর মা দিলুয়ারা বেগম কারা কর্তৃপক্ষকে নির্যাতনের অভিযোগের বিষয়টি জানিয়েছেন এবং আহত তারেক সাঈদের উন্নত চিকিৎসার জন্য মুন্সীগঞ্জের সিভিল সার্জনের কাছে লিখিত আবেদন করেছেন। আবেদনের সঙ্গে তারেকের চিকিৎসার পুরোনো কাগজপত্রও জমা দেওয়া হয়েছে।
কারা কর্মকর্তাদের ভাষ্য, তারেক সাঈদের সেলের পাশে কামাল নামে আরেকজন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি রয়েছেন। ওই দিন তারেক সাঈদ আগের দিনের নষ্ট খাবার কামালকে রেখে দিতে বলেন। জেল সুপার পরিদর্শনে এলে পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী কামাল ওই খাবার জেল সুপারের দিকে ছুড়ে মারেন। এ সময় তারেক সাঈদ এ নিয়ে জেল সুপারের সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে যান। তাদের আচরণ উগ্র ছিল এবং তারা হুমকি দিচ্ছিলেন। এ সময় জেল সুপারের সঙ্গে থাকা সদস্যরা সেলের ভেতরে থাকা বন্দিদের নিবৃত্ত করেন।
কারাগার সূত্রে জানা গেছে, এ ঘটনায় কারাবিধি অনুযায়ী দুজনের বিরুদ্ধেই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তারেক সাঈদকে মুন্সীগঞ্জ কারাগার থেকে কিশোরগঞ্জ কারাগারে এবং কামালকে দিনাজপুর কারাগারে স্থানান্তর করা হয়েছে।
এ ছাড়া শাস্তি হিসেবে তারেক সাঈদ এক মাস টেলিফোনে বা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবেন না। আর কামালকে ডান্ডাবেড়ি পরানো হবে। জেল সুপার মো. জান্নাত-উল-ফরহাদ গতকাল মঙ্গলবার রাতে সমকালকে বলেন, তারেক সাঈদের ওপর কেউ হামলা করেননি। ঘটেছে তার উল্টো। তারেক সাঈদই তাদের ওপর হামলা চালিয়েছেন।
আলোচিত সাত খুনের ঘটনার পর থেকেই তারেক সাঈদ একাধিকবার দাবি করে আসছিলেন, এ ঘটনায় জিয়াউল আহসান সরাসরি সংশ্লিষ্ট ছিলেন। তিনিই চক্রান্ত করে সাঈদকে এ মামলায় ফাঁসিয়েছেন।
২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম, আইনজীবী চন্দন সরকারসহ সাতজনকে অপহরণ করা হয়। এ ঘটনার তিন দিন পর শীতলক্ষ্যা নদীতে ছয়জনের এবং আরও এক দিন পর আরেকজনের মরদেহ পাওয়া যায়।
সাতজনকে অপহরণ ও হত্যার এ ঘটনায় নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি ও আইনজীবী চন্দন সরকারের জামাতা বিজয় কুমার পাল দুটি মামলা করেন। এর পর ২০১৫ সালের ৮ এপ্রিল মামলার তদন্তকারী সংস্থা জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) দুটি মামলায় নূর হোসেন, চাকরিচ্যুত সাবেক র্যাব কর্মকর্তাসহ ৩৫ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিন্ন অভিযোগপত্র জমা দেয়।