এক দিন চলাচল করলে আরেক দিন বিশ্রামে
ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডুর সড়কে একটি স্থানীয় তিন চাকার যান ঠেলে দিচ্ছেন এক ব্যক্তি। গত বুধবার উপজেলার শড়াবাড়িয়া এলাকায় সমকাল
এম. সাইফুজ্জামান তাজু, হরিণাকুণ্ডু (ঝিনাইদহ)
প্রকাশ: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:৪১
| প্রিন্ট সংস্করণ
‘এক দিন এই রাস্তা দিয়ে গেলে আর যেতে ইচ্ছে করে না। ঝাঁকুনিতে পুরো শরীর ব্যথায় কাতর হয়ে পড়ে। অনেক বছর ধরে শুনছি রাস্তা হবে। হয় না। নেতাদের মুখের কথা মুখেই থাকে, বাস্তবে ফল শূন্য।’ চলাচলের অনুপযোগী সড়ক নিয়ে এভাবে ক্ষোভের কথাগুলো বলছিলেন আলম হোসেন। এই অটোরিকশাচালককে গত মঙ্গলবার দুপুর ১২টার দিকে পাওয়া যায় হরিণাকুণ্ডুর ভায়না ইউনিয়নের রহিমপুর গ্রামে।
একই সড়ক দিয়ে ঝিনাইদহ জেলা শহরের সরকারি কেশবচন্দ্র মহাবিদ্যালয়ে নিয়মিত যাতায়াত করেন আল মামুন। তিনি পড়েন রাষ্ট্রবিজ্ঞানে। বাড়ি থেকে কলেজের দূরত্ব প্রায় ১২ কিলোমিটার। আল মামুন বললেন, সড়কটি ভেঙেচুরে এমন অবস্থা হয়েছে যে, এক দিন গেলে পরের দিন বিশ্রামে থাকতে হয়। কারণ সড়কটির বিভিন্ন জায়গায় ছোটবড় অসংখ্য গর্ত। ফলে চলাচলকারী ছোটবড় যানবাহনকে ঝুঁকি নিয়ে হেলেদুলে চলতে হয়। ঝাঁকুনিতে পুরো শরীরে ব্যথা হয়ে যায়।
বেহাল এই সড়ক নিয়ে আক্ষেপ করলেন আলম হোসেন ও আল মামুনের মতো অসংখ্য মানুষ। আমতলা-তৈলটুপি-আলমডাঙ্গা (জেড-৭৪০৪) সড়কটি ঝিনাইদহ-কুষ্টিয়া মহাসড়কের আমতলা বাজার থেকে হরিণাকুণ্ডু উপজেলার চাঁদপুর, ফলসী, রঘুনাথপুর, জোড়াদহ এবং ভায়না ইউনিয়নের মধ্য দিয়ে কুষ্টিয়া সদর উপজেলার ঝাউদিয়া হয়ে চুয়াডাঙ্গা জেলার আলমডাঙ্গার সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করেছে। প্রতিদিন শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী, কৃষকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার অগণিত মানুষ এই সড়ক দিয়ে যাতায়াত করেন।
কৃষিপণ্য পরিবহন ও স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও সড়কটির বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। ৩৬.০২৫ কিলোমিটার দীর্ঘ সড়কটি দীর্ঘদিনের অযত্ন-অবহেলায় এখন চলাচলের প্রায় অনুপযোগী। সড়কটির কিছু অংশে যান চলাচল একেবারেই কঠিন। সরেজমিনে উপজেলার চাঁদপুর ইউনিয়নের আমতলা বাজার, মকিমপুর, ছোট ভাদড়া, কন্যাদহ; রঘুনাথপুর ইউনিয়নের জিন্দারের মোড়, দরিবিন্নি, সড়াবাড়িয়া ও ভায়না ইউনিয়নের রহিমপুর, মালিপাড়া গ্রামসহ কয়েকটি জায়গায় এ সড়কে ফাটল ও ছোট-বড় গর্ত দেখা গেছে। বর্ষা মৌসুমে পানি জমে খানাখন্দগুলো আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। বৃষ্টির সময় পুরো রাস্তা কাদায় ভরে যায়। ফলে দুর্ঘটনার আশঙ্কাও রয়েছে। বিশেষ করে মোটরসাইকেল, ইজিবাইক, ভ্যান ও ছোট যানবাহন চালকেরা ঝুঁকি নিয়ে চলাচলে বাধ্য হচ্ছেন।
স্থানীয় লোকজনের ভাষ্য, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ও গ্রামীণ ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার সুবিধার জন্য এক জেলা থেকে অন্য জেলায় যাতায়াতে সড়কটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এটি সংস্কার হলে চুয়াডাঙ্গা জেলার আলমডাঙ্গা উপজেলা ও ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু উপজেলার হাজারো মানুষের মধ্যে নানা ক্ষেত্রে সংযোগ তৈরি হবে। এই সড়কে চলাচল করেন হরিণাকুণ্ডুর অন্তত ২০-২৫ গ্রামের কয়েক হাজার মানুষ। তৈলটুপি থেকে মালিপাড়া, রহিমপুর, ভায়না, চরপাড়া, নিত্যানন্দপুর হয়ে আমতলায় সড়কটি মিশেছে ঝিনাইদহ-কুষ্টিয়া মহাসড়কে।
এলাকাবাসী বলছেন, মাঝে মধ্যে সড়কের কিছু অংশে ইট, বালু ও মাটি ফেলে সামান্য মেরামত করা হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় একেবারে কম। কিছুদিন যেতে না যেতে সংস্কার করা অংশে গর্ত তৈরি হয়। তারা দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই সংস্কারের দাবি জানান।
রহিমপুর গ্রামের বাসিন্দা মহসিন আলীর দেওয়া তথ্যমতে, ২০০৫ সালের দিকে সর্বশেষ সড়কটির সংস্কারকাজ হয়। পরে চলাচলের উপযোগী রাখতে এলাকাবাসী ইট, বালু, খোয়া ফেলেন। নানা প্রয়োজনে এ অঞ্চলের অন্তত ৪০-৫০ হাজার মানুষের যোগাযোগের অন্যতম প্রধান সড়ক। এটি পুনর্নির্মাণ বা সংস্কার হওয়া প্রয়োজন বলেও মনে করেন তিনি।
ভায়না গ্রামের কৃষক আকরাম আলীর ভাষ্য, জেলার অন্যতম বড় পাইকারি বাজার ভাটইতে পাট, কাঁচামালসহ অন্যান্য কৃষিপণ্য নিয়ে যাতায়াতের জন্য সহজ পথ এটি। ভাঙাচোরা ও বেহাল হওয়ায় অন্তত ১০ কিলোমিটার ঘুরে তাদের চলাচল করতে হয়। এতে খরচ ও সময় বেশি লাগে।
এ সড়কের কারণে জনভোগান্তির কথা স্বীকার করে রঘুনাথপুর ইউপি চেয়ারম্যান বসির উদ্দিন বলেন, ‘আমরা অনেক চেষ্টা করেছি। সওজ কর্তৃপক্ষ কোনো বছরে এক কিলোমিটার আবার কোনো বছর একেবারেই কাজ করে না। ফলে পরের বছর আসতে সেই অংশটুকুও চলাচলের অনুযোগী হয়ে পড়ে।’ একই রকম মন্তব্য ভায়না ইউপি চেয়ারম্যান নাজমুল হুদা তুষারের।
সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তর ঝিনাইদহের তথ্যমতে, এলজিইডি থেকে সওজের কাছে হস্তান্তরিত ৩৬.০২৫ কিলোমিটারের সড়কটির মাত্র ১৩ কিলোমিটার অংশ মোটামুটি চলাচলের উপযোগী। আমতলা বাজার থেকে ০-৪ কিলোমিটার, ৫-১৩ কিলোমিটার ও ২৫-৩৪ কিলোমিটার অংশ যানবাহন চলাচলে একেবারে অনুপযোগী। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩ কোটি ১০ লাখ টাকা খরচের চারটি দরপত্রের মাধ্যমে ৩ হাজার ৩৫০ মিটার সড়ক সংস্কার হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কোনো সংস্কারকাজ হয়নি।
সওজ ঝিনাইদহের নির্বাহী প্রকৌশলী তুহিন আল মামুন এ জন্য বরাদ্দের অপ্রতুলতাকে দায়ী করেন। তিনি বলেন, বরাদ্দ পাওয়া সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় সংস্কারকাজ করতে পারবেন। সড়কটি নিয়ে তাদের একটি দীর্ঘমেয়াদি কাজের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এটি সময়সাপেক্ষ।
- বিষয় :
- সড়ক