মাটির টানে পালপাড়ায় টিকে থাকার লড়াই
হাঁড়ি তৈরিতে ব্যস্ত আন্না রানী পাল। গত বুধবার বাগমারার বীরকুৎসায় সমকাল
বাগমারা (রাজশাহী) সংবাদদাতা
প্রকাশ: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:৪২
| প্রিন্ট সংস্করণ
সত্তরের দ্বারপ্রান্তে মনোরঞ্জন চন্দ্র। শরীরে বার্ধক্যের ছাপ। মুখে বয়সের রেখা। শরীরও আগের মতো সায় দেয় না। তবু থামেনি তাঁর চাকা। সংসারের প্রয়োজন আর কাদামাটির প্রতি ভালোবাসা। এই দুই টানে প্রতিদিন বসেন ঘূর্ণায়মান চাকার সামনে। দিনরাত চাকা ঘোরান। কাদামাটি দিয়ে তৈরি করেন পাতিল, হাঁড়ি, কলস, সরা, প্রদীপসহ বিভিন্ন সামগ্রী। তাঁর হাতে কাদামাটি পায় নতুন জীবন। চাকার ঘূর্ণনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে মাটি হয়ে ওঠে একেকটি শিল্পকর্ম।
রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার সর্বপূর্বের গ্রাম বীরকুৎসা। সেখানকার পালপাড়ার শেষের মাটির বাড়িটির এক কোণে বসে নীরবে এই কাজ করে চলেছেন মনোরঞ্জন। শুধু মনোরঞ্জন নন, একসময় পুরো পাড়ায় ছিল মৃৎশিল্পের বসতি।
মনোরঞ্জনের মতো কুড়িখানেক পরিবার রয়েছে এ পাড়ায়, বংশপরম্পরায় তারা এখনও মৃৎশিল্পের সঙ্গে যুক্ত। একসময় পাড়ার প্রায় সবাই এ কাজে নিয়োজিত ছিলেন। সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে সেই চিত্র।
প্লাস্টিক, অ্যালুমিনিয়াম ও স্টিলের পণ্যের ব্যবহার বেড়েছে। কমেছে মাটির জিনিসপত্রের চাহিদা। আর্থিক সংকটে পড়ে অনেকে ছেড়েছেন পৈতৃক পেশা। যুক্ত হয়েছেন অন্য কাজে। তবু কয়েকটি
পরিবার এখনও ঐতিহ্য আঁকড়ে ধরে আছে। প্রতিকূলতার মধ্যেও চলছে টিকে থাকার চেষ্টা।
স্বামীর সংসারে স্বপ্না রানী পালের তিন বছর। এর মধ্যে শাশুড়ির কাছ থেকে শিখে নিয়েছেন কাদামাটি দিয়ে বিভিন্ন পাত্র তৈরির কৌশল। পরিবারের অন্যদের মতো তিনিও এখন নিয়মিত মৃৎশিল্পের কাজে
যুক্ত। দক্ষ হাতে কাদামাটিকে নানা আকৃতি দেন। তৈরি করেন নিত্যপ্রয়োজনীয় ও শৌখিন সামগ্রী।
স্বপ্না রানী পাল বলেন, ‘আমরা স্বামী-স্ত্রী দুজন এই কাজ করি। এর আয় দিয়ে আমাদের সংসার চালাতে হয়। কষ্ট হলেও কিছু করার নেই।’
জন্মের পর থেকে মাটির সঙ্গে সখ্য সুনীল চন্দ্র পালের। দশ বছর বয়সে কাজ শুরু করেছিলেন। বয়স এখন ৫০ পেরিয়েছে। আর কোনো কাজ জানা নেই। তাই
দশকের পর দশক কাদামাটির এই পেশাতে রয়ে গেছেন।
তাঁর অভিযোগ, মৃৎশিল্পীদের জন্য প্রশিক্ষণ ও ভাতার ব্যবস্থা নেই। এই শিল্প টিকিয়ে রাখতে সরকারি সহযোগিতা প্রয়োজন বলেও মনে করেন তিনি।
মাটি এখন আর আগের মতো কথা শোনে না। তাই নিজে মাটি তৈরি করে দেন স্ত্রী আন্না রানী পালকে। আন্না রানী প্রতিদিন একশর বেশি পাতিল তৈরি করেন।
আন্না রানী পাল বলেন, ছোটবেলা থেকে তিনি কাদামাটির কাজ করেন। বিয়ের আগে বাবার বাড়িতে করতেন। বিয়ের পর স্বামীর সংসারেও সেই কাজ করে যাচ্ছেন। দীর্ঘদিনের কাজে মাটির সঙ্গে তাঁর যেন গড়ে উঠেছে নিবিড় সম্পর্ক।
বীরকুৎসা স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ জুলফিকার আলী আলিম জানান, তাঁর জন্ম এ গ্রামেই। ছোটবেলা থেকে পালপাড়ার মৃৎশিল্পীদের সংগ্রামী জীবন দেখে আসছেন। এখন এ শিল্প অনেকটা বিলুপ্তির পথে। সরকারি সহায়তা পেলে এখানকার মৃৎশিল্প টিকে যেতে পারে।
উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মতিনুর রহমান বলেন, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে সমাজসেবা অফিসের প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের আওতায় মৃৎশিল্পীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। বীরকুৎসা পালপাড়ার মৃৎশিল্পী পরিবারগুলোকেও পর্যায়ক্রমে প্রশিক্ষণ ও ঋণের ব্যবস্থা করা হবে।
- বিষয় :
- মাটি