আলোকিত মানুষ গড়ার কারিগরের জীবন আঁধারে
রেজিয়া খাতুনের সঙ্গে শামসুল হক। সম্প্রতি শেরপুরের কোহাকান্দায় সমকাল
দেবাশীষ ভট্টাচার্য, শেরপুর
প্রকাশ: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:১৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
‘ফেলে আসা স্মৃতির দিকে ফিরে দেখি, একটা জীবন কত কিছু শেখাল। সেই স্মৃতি বার বার ফিরে আসে। আল্লাহর রহমতে, এখনও রাতে চোখে দেখি, চশমার দরকার পড়ে না। তবে জীবনের চশমা দিয়ে বুঝেছি– জীবনের চেয়ে বড় শিক্ষক কেউ নেই। সন্তান, সমাজ, সহকর্মী কারও প্রতি আমার কোনো অভিযোগ নেই, অনুযোগ নেই।’ ক্ষীণকণ্ঠে এভাবে যাপিত জীবনের গল্প তুলে ধরলেন মানুষ গড়ার কারিগর কারি শামসুল হক। জীবনের পড়ন্ত বেলায় এসে অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটছে তাঁর। এই প্রবীণ শিক্ষক বর্তমানে অন্যের বাড়িতে আশ্রিত হয়ে এক অমানবিক জীবন পার করছেন।
শেরপুর সদরের ধলা ইউনিয়নের চান্দেরনগর মুসলিমপাড়ার বাসিন্দা কারি শামসুল হক (৮৮)। দীর্ঘ ৩৫ বছর স্থানীয় ‘চান্দের নগর কোহাকান্দা এমআর দাখিল মাদ্রাসায়’ শিক্ষকতা করেছেন তিনি। প্রায় ১৩ বছর আগে অবসরে গেছেন। এ ছাড়া বছরের পর বছর ধলা ইউনিয়নের বিভিন্ন মসজিদে ইমামতি করেছেন। কোনো দিন কারও কাছে হাত পাতেননি। নীতিতে অটল, আদর্শবান শিক্ষকের কাছে এক সময় দূরদূরান্ত থেকে কোরআন পাঠ শিখতে আসতেন শিক্ষার্থীরা। সারাজীবন জ্ঞানের আলো জ্বেলে গেছেন। শিখিয়েছেন নৈতিকতা, মানবতা আর কোরআনের শিক্ষা। অথচ সেই শিক্ষকই জীবনের পড়ন্ত বেলায় এসে অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছেন। তাঁর জীবনটাই যেন অনিশ্চয়তার অন্ধকারের চাদরে ঢেকে গেছে। কেউ খোঁজ নেয় না। তিন ছেলে, দুই মেয়ে, নাতি-নাতনি নিজ সংসার সামলাতে ব্যস্ত। বড় ছেলে বিপুল পরিমাণ ঋণ করায় অবসরকালীন ভাতার সব টাকাই এই শিক্ষক পাওনাদারদের দিয়ে ঋণ পরিশোধ করে নিঃস্ব হয়েছেন। তবুও কোনো দুঃখ নেই, আক্ষেপ নেই তাঁর।
জানা গেছে, এক সময় ধলা ইউনিয়নের গেরামারা গ্রামে বসবাস করতেন শামসুল হক। প্রায় ৬০ বছর আগে দাম্পত্য জীবন শুরু হওয়ার কিছু দিন পর চলে আসেন শ্বশুরবাড়ি কোহাকান্দা মুসলিমপাড়ায়। তাঁর ৭৮ বছর বয়সী স্ত্রী রেজিয়া খাতুনের পাঁচ সন্তান। তিন ছেলে, দুই মেয়ে। সবার বিয়ে হয়েছে। তবে এই শিক্ষক দম্পতির আফসোস– সন্তাদের মধ্যে কেউ প্রাথমিক শিক্ষার গণ্ডি পার না হওয়ায়।
বিয়ের পর ছেলেমেয়েরা যার যার মতো গ্রাম ছেড়েছে। ১৯৯৪ সালে শামসুল হকের জ্যেষ্ঠ দুই শ্যালক তাদের অংশের বসতভিটে বিক্রি করে দেন। এরপর চার-পাঁচ বছর আগে আরেক শ্যালক তাঁর অংশ বিক্রি করে দেন। তবে প্রবীণ শিক্ষক দম্পতিকে সেখানে আমৃত্যু বসবাসের নিশ্চয়তা দেন ক্রেতা। সেখানে একটি টিনের ঘর তুলে বসবাস শুরু করেন এই দম্পতি।
- বিষয় :
- জীবন