ঢাকা রোববার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

‘নিয়োগপত্র না পাওয়ার খবরে মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছে’

কুমিল্লায় প্রাথমিকের শিক্ষক নিয়োগে সুপারিশের পরও বাদ ৭৭ প্রার্থী, কারণ স্পষ্ট নয়

‘নিয়োগপত্র না পাওয়ার খবরে মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছে’
×

চাকরিপ্রার্থী মাছুম বিল্লাহ

কামাল উদ্দিন, কুমিল্লা

প্রকাশ: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৯:৫৬

কুমিল্লায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে নিয়োগের জন্য চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েও নিয়োগপত্র পাননি ৭৭ জন। রোববার সকাল থেকে তাদের অনেকে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ে এসে নিয়োগপত্র না পাওয়ার কারণ জানতে চান। তবে কারও কাছ থেকে তারা স্পষ্ট কোনো উত্তর পাননি বলে অভিযোগ করেছেন।

তাদের অভিযোগ, পুলিশ প্রতিবেদনের কারণে নিয়োগপত্র আটকে দেওয়া হয়েছে বলে কার্যালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। তবে তাদের বিরুদ্ধে কী অভিযোগ, তা জানানো হয়নি।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ১২ নভেম্বর কুমিল্লায় সহকারী শিক্ষক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। লিখিত পরীক্ষা হয় চলতি বছরের ৯ জানুয়ারি। মৌখিক পরীক্ষা হয় ২৮ জানুয়ারি থেকে ৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। জেলার জন্য ৫০৮ জনকে নিয়োগের সুপারিশ করা হয়। এর মধ্যে ৪৭৭ জন মেডিকেল সনদসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেন। তাদের মধ্যে গত সপ্তাহে ৪০০ জনকে চূড়ান্ত নিয়োগপত্র দেওয়া হয়। পুলিশ প্রতিবেদনসহ বিভিন্ন কারণে ৭৭ জনের নিয়োগপত্র দেওয়া হয়নি।

রোববার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে এসব প্রার্থী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ে আসেন। তাদের অনেকের হাতে ছিল নিয়োগ পরীক্ষার বিভিন্ন কাগজপত্র। কারও সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সও শেষ হওয়ার পথে।

বরুড়া উপজেলা থেকে স্কুলশিক্ষক বাবা আলী আকবরকে সঙ্গে নিয়ে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ে এসেছিলেন ইসরাত জাহান মিশু। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০২০ সালে স্নাতক ও পরে স্নাতকোত্তর শেষ করেছেন তিনি। এরপর দুইবার বিসিএসের লিখিত পরীক্ষায় অংশ নিয়েও উত্তীর্ণ হতে পারেননি। পরে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে সুপারিশপ্রাপ্ত হন।

ইসরাত জাহান বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়েও কেন বাদ পড়লাম, কেউ জবাব দিচ্ছে না। নিয়োগপত্র পাওয়ার অপেক্ষায় ছিলাম। শেষ সময়ে এসে নিয়োগপত্র না পাওয়ায় খুব হতাশ লাগছে।’

চান্দিনার প্রার্থী মাছুম বিল্লাহর গল্পও একই। কুমিল্লা সরকারি কলেজ থেকে স্নাতক শেষ করে চাকরির চেষ্টা করছিলেন তিনি। পরিবারের আর্থিক সংকটের মধ্যে টিউশনি করে পড়াশোনা শেষ করেছেন। তার বাবা স্থানীয় একটি মসজিদে ইমামতি করেন। তার আরও দুই ভাই কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন।

মাছুম বিল্লাহ বলেন, ‘বাবার ইমামতি আর আমার টিউশনির টাকায় লেখাপড়া শেষ করে চাকরিটি পেয়েছিলাম। এখন কী অপরাধে সরকার তা কেড়ে নিচ্ছে, বুঝতে পারছি না। চাকরি পাওয়ার খবরে পরিবারে আনন্দ দেখা দিয়েছিল। নিয়োগপত্র না পাওয়ার খবরে মনে হচ্ছে মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছে।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দেবিদ্বারের এক প্রার্থী বলেন, নিয়োগপত্র দিতে দেরি হওয়ায় কেউ কেউ এ নিয়ে প্রতিবাদ করে লেখালেখি করেছিলেন। সেটিই বাদ পড়ার কারণ কিনা, তারা জানেন না। তার ভাষ্য, কার্যালয় থেকে বলা হচ্ছে, রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার কারণে কেউ কেউ বাদ পড়েছেন।

ওই প্রার্থী বলেন, ‘মৌখিক পরীক্ষার আগেই এসব বিষয় যাচাই-বাছাই করে চূড়ান্ত সুপারিশ করলে এখন এমন বিতর্ক তৈরি হতো না।’

মনোহরগঞ্জের প্রার্থী হোসাইন আহমেদ বলেন, ‘এটা আমাদের সঙ্গে অত্যন্ত অমানবিক কাজ। পুলিশ প্রতিবেদনে খারাপ কিছু থাকলে বিষয়টি আমাদের জানার অধিকার আছে। পুলিশ প্রতিবেদন তো ভুলও হতে পারে।’

নাঙ্গলকোটের প্রার্থী তারিকুল ইসলাম জানান, সকাল থেকে তিনি জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ে অপেক্ষা করছেন। কিন্তু জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কক্ষ তালাবদ্ধ থাকায় তার সঙ্গে দেখা করতে পারেননি। কার্যালয়ের কর্মচারীরাও এ বিষয়ে কিছু বলছেন না।

একই উপজেলার প্রার্থী সৈয়দ ফরিদুল ইসলাম বলেন, ‘চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়া পর্যন্ত এই নিয়োগের জন্য কত দিন অপেক্ষা করেছি। এখন কী অপরাধে নিয়োগপত্র পাচ্ছি না, সেটাও জানতে পারলাম না। আশা করি, সরকার দ্রুত আমাদের বিষয়ে মানবিকভাবে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেবে।’

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মনছুর আলী চৌধুরী রোববার কুমিল্লায় ছিলেন না। তিনি কার্যালয়ের কাজে চট্টগ্রামে অবস্থান করছিলেন। ফলে নিয়োগপত্র না পাওয়া প্রার্থীদের বিষয়ে কার্যালয়ের অন্য কর্মকর্তারাও বিস্তারিত কিছু বলতে চাননি।

সহকারী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ মোতাহার বিল্লাহ সন্ধ্যায় সমকালকে বলেন, ‘পুলিশ প্রতিবেদনের কারণে যে ৭৭ জনের নিয়োগ বিলম্বিত হচ্ছে, এ বিষয়ে সরকারের নির্দেশনা পেলে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। বাদ পড়া প্রার্থীরা নিয়োগ পাবেন কিনা, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।’

পুলিশ প্রতিবেদনে ব্যক্তিগত বিষয়ের চেয়ে রাজনৈতিক বিষয়কে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে কিনা- এ বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) কুমিল্লা জেলা শাখার সভাপতি শাহ মোহাম্মদ আলমগীর খান বলেন, চূড়ান্তভাবে নিয়োগের জন্য সুপারিশপ্রাপ্ত কোনো প্রার্থীকে বাদ দেওয়া হলে এর কারণ স্পষ্ট করা উচিত।

তিনি বলেন, ‘মেধাবীরা আমাদের সন্তান, তারা দেশের সম্পদ। কারও রাজনৈতিক আদর্শের কারণে তাদের বাদ দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। কারও চরিত্র, দুর্নীতি ও নৈতিকতা দেখা যেতে পারে। কিন্তু ব্যক্তিগত কিংবা পারিবারিক রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কাউকে বাদ দেওয়ার সংস্কৃতি আমরা প্রত্যাশা করি না। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা দিয়ে মেধাবীরাই শিক্ষকতায় আসা উচিত।’

চাকরিপ্রার্থীদের বিষয়ে পুলিশ প্রতিবেদন প্রসঙ্গে কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) মো. জিয়াউর রহমান সন্ধ্যায় সমকালকে বলেন, ‘প্রাথমিক শিক্ষক পদে নিয়োগপ্রত্যাশীদের বিষয়ে আমাদের কাছে কিছু তথ্য চাওয়া হয়েছিল। বিধি অনুযায়ী আমরা তথ্য দিয়ে প্রতিবেদন দিয়েছি। কারও নিয়োগ দেওয়া বা বাতিলের বিষয়ে কোনো সুপারিশ করা হয়নি। বিষয়টি জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয় ভালো বলতে পারবে।’

আরও পড়ুন

×