ঢাকা রোববার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ইসলামের সঙ্গে ফকির লালনের কোনো বিরোধ নেই: ফরহাদ মজহার

ইসলামের সঙ্গে ফকির লালনের কোনো বিরোধ নেই: ফরহাদ মজহার
×

কুষ্টিয়ার কুমারখালীর ছেঁউরিয়ায় লালন একাডেমির সেমিনারে বক্তব্য প্রদান করেন কবি ও চিন্তক ফরহাদ মজহার। ছবি: সমকাল

কুমারখালী (কুষ্টিয়া) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ২০:২৭

কবি, চিন্তক ও গবেষক ফরহাদ মজহার বলেছেন, ইসলামের সঙ্গে ফকির লালন শাহের কোনো বিরোধ নেই। লালন ইসলাম সংস্কারের জন্য আসেননি, আবার শরিয়ত-মারফত নিয়েও কোনো তর্ক তোলেননি। তিনি তার নিজস্ব একটি পথের কথা বলেছেন, যাকে ‘নদীয়ার ভাবের ভুবন’ বলা যায়। এটা দর্শনচর্চা, ভাবচর্চা ও রসচর্চার অংশ।

রোববার বিকেলে কুষ্টিয়ার কুমারখালীর ছেঁউরিয়ায় লালন একাডেমির মিলনায়তনে ‘ফকির লালন শাহ বাংলার ভাব ও ভাষার ঐশ্বর্য’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান বক্তার বক্তব্যে ফরহাদ মজহার এসব কথা বলেন। ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’ প্রতিপাদ্যে জেলা প্রশাসন ও লালন একাডেমি যৌথভাবে এ সেমিনারের আয়োজন করে।

ফরহাদ মজহার বলেন, ‘আমাদের এখানে চারটা এমপির মধ্যে তিনই জামায়াতের। জামায়াতের সঙ্গে আমাদের কোনো বিরোধ নাই। তাদের মধ্যে বড় বড় নেতা যারা এখন নেই, তারা জীবিত থাকলে ভিন্নভাবে ফকির লালনকে নিতেন। তারা অনেক বিচক্ষণ ছিলেন। তারা বুঝতেন যে, ইসলামের সঙ্গে ফকির লালনের কোনো বিরোধ নাই।’

লালনের দর্শনচর্চার ধারার কথা তুলে ধরে ফরহাদ মজহার বলেন, ‘এই ভাবচর্চা, রসচর্চার আগে ছিল তন্ত্র। তন্ত্র থেকে রস, রস থেকে ভাব- এই তিনটা স্তর বাংলায় ভাবের মূল। এটা অসাধারণ একটা কাজ।’

তিনি বলেন, পুরোনো গুরুমশাইদের অধিকাংশই এখন আর জীবিত নেই। তাদের কাছ থেকে অল্প কিছু কথা শুনেছেন এবং কিছু শিক্ষা পেয়েছেন- এমন মানুষের সংখ্যা এখন কম। তাদের কথা বলা হলেও অনেকে তা গ্রহণ করতে চান না বলে মন্তব্য করেন তিনি।

ফরহাদ মজহার বলেন, ‘আপনারা আমাদের কথা মনোযোগ দিয়ে অন্তত না শুনলে আমরা বিব্রত অবস্থার মধ্যে পড়ি। তাহলে আমরা কেউ কিন্তু এই মাজারকে রক্ষা করতে পারব না।’

ফকির লালনের গান ও ভাষার ব্যবহার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, লালন বাংলা, আরবি ও ফারসি ভাষার শব্দ ও ভাবকে ভিন্নভাবে ব্যবহার করেছেন। তার গানের রূপক অর্থ বোঝার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

ফরহাদ মজহার বলেন, ‘রূপকাষ্ঠের নৌকা’- এ কথাটির মধ্যেও রূপক অর্থ রয়েছে। ধর্মপ্রাণ মানুষেরা অনেক সময় এ ধরনের গানের কথা নিয়ে আপত্তি করেন। তবে গানের রূপক অর্থটি তারা খেয়াল করেন না।

লালনকে ঘিরে বিভিন্ন মত ও ভাবগত বিতর্ক প্রসঙ্গে ফরহাদ মজহার বলেন, ‘ভাবগত তর্কগুলো আমাদের মধ্যে আছে, ফকিরদের মধ্যে আছে, সমাজের মধ্যেও আছে। থাকুক, অসুবিধা কী? কিন্তু আমরা যেন কারও অনুভূতিতে আঘাত না করি।’

তিনি আরও বলেন, এমন কোনো পরিস্থিতি তৈরি করা উচিত নয়, যাতে ছেঁউরিয়ার লালন আখড়া বা ফকির লালন নিজেই বিপদের মধ্যে পড়েন। এ ধরনের বিপদের সম্ভাবনা তিনি ইতিমধ্যে বিভিন্নভাবে দেখতে পেয়েছেন বলেও মন্তব্য করেন।

সেমিনারে ফকির লালন শাহের জীবন, কর্ম ও দর্শনের ওপর আলোচনা করেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক আ-আল মামুন, ফোকলোর বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সুস্মিতা চক্রবর্তী, আলোকচিত্রী ও সাবেক শ্রম সংস্কার কমিশনের সদস্য তাসলিমা আখতার, জেলা প্রশাসক তৌহিদ বিন হাসান এবং কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার মো. আমিনুল ইসলামসহ আরও অনেকে।

অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (উপসচিব) মো. মিজানুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সেমিনারে বক্তারা বলেন, ফকির লালন শাহ শুধু বাউলসম্রাট নন, তিনি বাংলার ভাব ও ভাষার ঐশ্বর্যের অন্যতম প্রধান রূপকার। তার গান ও দর্শনে মানবতা, অসাম্প্রদায়িকতা ও মানুষের মুক্তির কথা উঠে এসেছে। সহজ ভাষায় রচিত লালনের গান বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে।

সেমিনারে জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা, লালন একাডেমির সদস্য, শিক্ষক-শিক্ষার্থী, গবেষক, সাংবাদিক ও লালনভক্তরা উপস্থিত ছিলেন।

আরও পড়ুন

×