দেশে কত বধ্যভূমি, জানে না কেউ
ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় হস্তান্তরের আগেই ধসে পড়েছে স্থাপনা - মোস্তাফিজুর রহমান
রাজীব নূর
প্রকাশ: ২২ মার্চ ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ২২ মার্চ ২০২২ | ১৪:২৬
বধ্যভূমির সংখ্যা কত? জানা গেল না মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় পরিবেশিত তথ্য থেকে। মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস ও স্মৃতি সংরক্ষণের দায়িত্বে নিয়োজিত সরকারের এ মন্ত্রণালয়ের কাছে শুধু ২৮০টি বধ্যভূমির নাম রয়েছে; সেগুলোতে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের প্রকল্প নেওয়া হয়েছে বলে। যদিও এ প্রকল্প বাস্তবায়নের দ্বিতীয় পর্যায়ের মেয়াদও শেষ হয়ে গেছে গত বছরের জুনে। নতুন করে তা বাড়ানো হয়েছে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত। এর পরও ২৪৬টি বধ্যভূমিতে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের কাজ শুরুই হয়নি। মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধ, গণহত্যা ও নির্যাতন নিয়ে গবেষণা করছে এমন দুটি বেসরকারি সংস্থার দেওয়া তথ্য থেকে ধারণা করা যায়, সারাদেশে চিহ্নিত বধ্যভূমির সংখ্যা হাজারেরও বেশি। সংস্থা দুটির একটি- ওয়ার ক্রাইমস ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি। তারা বছর দশেক আগে একটি জরিপ শেষে জানিয়েছিল, সারাদেশে পাঁচ হাজারের মতো বধ্যভূমি রয়েছে। এগুলোর মধ্যে তারা ৯৪২টি বধ্যভূমি শনাক্ত করতে পেরেছে বলে জানায়। তবে তালিকা প্রকাশ করেনি। অন্য সংস্থাটির নাম- গণহত্যা-নির্যাতন ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষণা কেন্দ্র। তারা ৬৪ জেলার ৩২টিতে জরিপ শেষ করে এনেছে। '১৯৭১ :গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর' (সংক্ষেপে গণহত্যা জাদুঘর নামে পরিচিত) নামের গবেষণা কেন্দ্রটি সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের আর্থিক সহযোগিতায় পরিচালিত হচ্ছে।
গণহত্যা জাদুঘর ট্রাস্টের সভাপতি অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন বলেন, '৩২ জেলার জরিপে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী বধ্যভূমির সংখ্যা ৭২৫টি, গণহত্যা ১৩ হাজার ৬৫০টি, গণকবর আছে এক হাজার একটি এবং নির্যাতনকেন্দ্রের সংখ্যা এক হাজার ৬২টি। দেশের আনাচে-কানাচে অসংখ্য বধ্যভূমি ও গণকবরের সন্ধান মিলছে আমাদের জরিপে। ওই জরিপের ওপর ভিত্তি করে গণহত্যা জাদুঘর গণহত্যার জিপিএস জরিপ এবং তা ডিজিটাল ম্যাপে প্রকাশ করছে।'
গণহত্যা জাদুঘরের গবেষণাকেন্দ্রের জরিপে পাওয়া তথ্য পুরোনো সব ধারণা বদলে দিচ্ছে। স্বয়ং মুনতাসীর মামুনের 'মুক্তিযুদ্ধ কোষ', দ্বিতীয় খণ্ডে সারাদেশের মোট ৯০৫টি গণহত্যা, গণকবর, বধ্যভূমি ও নির্যাতনকেন্দ্রের নাম ছিল। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও বাংলাদেশ ইতিহাস সম্মিলনীর সাধারণ সম্পাদক চৌধুরী শহীদ কাদের বলেন, বধ্যভূমিগুলো তো গণহত্যা বা জেনোসাইডের প্রমাণ হিসেবে সাক্ষ্য দেয়। কিন্তু রক্তাক্ত রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যে যারা ক্ষমতায় এসেছিল, তারা মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক আলোচনায় বিজয়কে সামনে নিয়ে আসে। উপেক্ষিত হয় গণহত্যা। গণহত্যার ইতিহাসচর্চার এ অচলাবস্থা কাটানোর তাগিদেই ২০১৪ সালের ১৭ মে খুলনায় প্রতিষ্ঠা করা হয় গণহত্যা জাদুঘর।
শহীদ কাদের এই গণহত্যা জাদুঘরের ট্রাস্টি ও ট্রাস্ট সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি জানান, গণহত্যা জাদুঘরের গবেষণাকেন্দ্র থেকে এ পর্যন্ত ১১১টি বধ্যভূমিতে সংঘটিত গণহত্যা নিয়ে ১১১টি বই প্রকাশ করা হয়েছে। বধ্যভূমি, গণহত্যা, গণকবর ও নির্যাতন নিয়ে ৩২টি জেলা জরিপ প্রকাশিত হয়েছে। তিনি নিজে চট্টগ্রাম নগরের পাহাড়তলী, নাথপাড়া; রাউজানের জগৎমল্লপাড়া ও আনোয়ারার বন্দরগ্রাম বধ্যভূমিতে পরিচালিত গণহত্যা নিয়ে কাজ করেছেন।
চট্টগ্রাম অঞ্চলে বধ্যভূমি ও গণহত্যা নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে শহীদ কাদের বলেন, 'অবহেলায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে চট্টগ্রামের অধিকাংশ বধ্যভূমি। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের সামনে অ্যাপোলো ফার্মেসির পেছনের বধ্যভূমিতে ১৫০ জনের মতো শহীদকে গণকবর দেওয়া হয়েছিল। ব্যক্তি মালিকানাধীন ওই জায়গায় এখন গড়ে উঠছে বহুতল ভবন। লালখানবাজার ও চকবাজার এলাকার দুটি গণকবরে গড়ে উঠেছে বাণিজ্যিক ও আবাসিক ভবন। পাহাড়তলীতে বিশ্ববিদ্যালয় ভবন। পাহাড়তলী বধ্যভূমি রক্ষায় অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন ও অধ্যাপক গাজী সালেহ উদ্দীনসহ আট গুণীজন দ্বারস্থ হয়েছিলেন আদালতের। তাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে দেশের সব বধ্যভূমি রক্ষায় যুগান্তকারী রায় দেন উচ্চ আদালত। এর পরও রক্ষা করা যাচ্ছে না শহীদের স্মৃতিবিজড়িত বধ্যভূমিগুলো।'
দেশের ৮ নাগরিকের করা রিট আবেদনের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ২০১৪ সালের মার্চে পাহাড়তলীর বধ্যভূমিটি সংরক্ষণের আদেশ দেন বলে জানান রিটকারীদের আইনজীবী মনজিল মোরসেদ। ওই রায়ের সাত বছর পরও অধিগ্রহণ করা হয়নি বধ্যভূমিটির এক দশমিক ৭৫ একর ভূমি। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের ভূমি অধিগ্রহণ শাখা থেকে বধ্যভূমিটি অধিগ্রহণ ও সংরক্ষণের জন্য সাড়ে ৬ কোটি টাকা বরাদ্দ চেয়ে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছিল ২০২০ সালে। মন্ত্রণালয় অর্থ বরাদ্দ না দেওয়ায় আটকে আছে অধিগ্রহণের কাজ।
মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের উপসচিব এবং বধ্যভূমি সংরক্ষণ ও স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ প্রকল্পের পরিচালক মো. জাহাঙ্গীর আলমের সরল স্বীকারোক্তি- পাহাড়তলী নিয়ে তারা 'গ্যাঁড়াকলে' আছেন। শুধু পাহাড়তলী নয়, ৪৪২ কোটি ৪০ লাখ ১৩ হাজার টাকার এ প্রকল্পের নির্ধারিত ২৮০টি বধ্যভূমির আরও অনেকগুলোতে অধিগ্রহণসংক্রান্ত জটিলতার কারণে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ আটকে আছে। এর মধ্যে ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার হরিরামপুর ইউনিয়নের রায়েরগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণের বধ্যভূমি, পৌরসভার দরিরামপুর মৌজায় মহাসড়কের পাশের বধ্যভূমি এবং ত্রিশাল সদর ইউনিয়নের পাঁচপাড়া গ্রামের বধ্যভূমি তিনটি রয়েছে।
ময়মনসিংহ গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদ আহসানের কাছে এ সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, 'অধিগ্রহণের দায়িত্ব আমাদের নয়। জমি পেলেই আমরা নির্মাণকাজ শুরু করে দেব।'
ময়মনসিংহের মুক্তাগাছার বধ্যভূমিতে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের কাজ শেষ হয়েছে। তবে সেটি অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে আছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তান সেনাবাহিনী মুক্তাগাছার বড় বাইশা বিলের কাতলশা নামক স্থানে তিন শতাধিক মানুষকে হত্যা করে আয়মন নদীর তীরের ডৌয়াখোলা এলাকার একটি ভাগাড়ে স্তূপ করে ফেলে রেখেছিল। সেখানেই নির্মিত হয়েছে স্মৃতিস্তম্ভটি। ২১ মার্চ সেখানে গিয়ে দেখা গেল, স্তম্ভের কোথাও কোথাও এরই মধ্যে ফাটল ধরেছে। ফটকের একাংশ খসে পড়েছে। নির্বিঘ্নে সেখানে বসে বিশ্রাম নিচ্ছিল একটি ছাগল।
নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদ আহসানকে ছবি পাঠিয়ে খসে পড়া গেট সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি পাল্টা জানতে চান, 'গেটটি খসে পড়েছে, নাকি খুলে ফেলা হয়েছে?' তাকে বলা হলো যতক্ষণ পর্যন্ত স্মৃতিস্তম্ভটি মুক্তিযোদ্ধা সংসদের হাতে হস্তান্তর না করছেন, ততক্ষণ তো খসে পড়া বা কারোর খুলে ফেলার দায়িত্ব আপনাদের নিতে হবে। উত্তরে তিনি বললেন, 'আমি ময়মনসিংহে এসেছি মাস তিনেক আগে। আমি যোগ দেওয়ার আগেই গণপূর্ত থেকে মুক্তাগাছার ইউএনওকে স্মৃতিস্তম্ভটি বুঝে নেওয়ার জন্য চিঠি দেওয়া হয়েছে।'
মুক্তাগাছার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবদুল্লাহ আল মনসুর চিঠি পাওয়ার কথা স্বীকার করে বলেন, 'আমার দেখে মনে হয়েছে কাজটি শেষ হয়নি। শেষ যে হয়নি এটা বোঝার জন্য ইঞ্জিনিয়ার হওয়া লাগে না। তাছাড়া এরই মধ্যে গেটসহ বিভিন্ন জায়গায় এটির ক্ষতি হয়ে গেছে। মুক্তিযোদ্ধাদের কেউ কেউ আমার কাছে অভিযোগ করে জানিয়েছেন, স্মৃতিস্তম্ভের যেখানে টাইলস দেওয়ার কথা ছিল, তা দেওয়া হয়নি। তবু আমি গণপূর্তকে বলেছি আমাকে নকশা অনুযায়ী স্তম্ভটি বুঝিয়ে দিতে। বুঝে পেলেই আমি সেটি রক্ষণাবেক্ষণের কাউকে দায়িত্ব দেব।'
পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলার বাড়ৈবাড়ি বধ্যভূমিতে নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভের অবস্থাও একই রকম বলে জানা গেল স্থানীয়দের কাছ থেকে। তারা জানান, এটি রক্ষণাবেক্ষণের কেউ নেই।
বধ্যভূমি সংরক্ষণ ও স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ প্রকল্পের পরিচালক মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, 'বর্তমানে ৩৪টি বধ্যভূমিতে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের কাজ চলছে। প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। প্রয়োজন হলে আরও বাড়ানো হবে।'