ওষুধের অতিমূল্য নিয়ন্ত্রণে নির্দেশনাও উপেক্ষিত
তবিবুর রহমান
প্রকাশ: ১৮ মে ২০২৩ | ১৮:০০
ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামের দাম দফায় দফায় বৃদ্ধির নেপথ্য কারণ খুঁজতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় (পিএমও) থেকে সম্প্রতি ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরে চিঠি দেওয়া হয়। চিঠিতে নির্দেশনা দেওয়া হয় ওষুধের দাম সমন্বয়ের। সেই লক্ষ্যে গত বুধবার স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে অধিদপ্তর বৈঠক করেছে। তবে দুই ঘণ্টার বৈঠকে ওষুধের দাম কমানোর বিষয়ে তেমন কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। উল্টো ওষুধ শিল্প সমিতি ও অধিদপ্তর বলছে, ওষুধের দাম অতিরিক্ত বাড়ানো হয়নি। অযৌক্তিকভাবে দাম বৃদ্ধির প্রমাণ দিতে পারেনি কেউ। তবে মাঠ পর্যায়ে ফার্মেসিগুলোতে ওষুধের অতিরিক্ত দাম নেওয়া নিয়ন্ত্রণে তদারকি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বৈঠকে ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানির প্রতিনিধি, রসায়নবিদ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা কর্মকর্তা, মেডিকেল ডিভাইস অ্যান্ড ইনস্ট্রুমেন্ট ইম্পোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন, ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানি, আমদানিকারক সমিতি ও কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক
মেজর জেনারেল মোহাম্মদ ইউসুফ বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন।
বৈঠক সূত্র জানায়, ফার্মেসি মালিকরা ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের বেঁধে দেওয়া মূল্যের চেয়ে অতিরিক্ত দামে ওষুধ বিক্রি করছেন বলে অভিযোগ করেন ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে ফার্মেসি মালিকরা বলছেন, প্রশাসনের নজর এড়াতে মোবাইল ফোনে এসএমএস দিয়ে ওষুধের অতিরিক্ত মূল্য নির্ধারণ করছে প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠাগুলো। জবাবে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর বলছে, দ্রুত সারাদেশে অভিযান পরিচালনা করা হবে। বাজার তদারকিতে সহযোগিতা করবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও ভোক্তা অধিকার। কোনো ফার্মেসির বিরুদ্ধে অনৈতিকভাবে ওষুধের দাম বাড়ানোর প্রমাণ পেলে নিবন্ধন বাতিল করা হবে।
বৈঠকে ওষুধ শিল্প সমিতির সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন বলেন, করোনা মহামারি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, ডলার সংকটে এলসি জটিলতা, কাঁচামাল আনতে সমস্যা এবং দফায় দফায় গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির কারণে ওষুধ উৎপাদনে খরচ অনেক বেড়েছে। যে কারণে অধিদপ্তরের অনুমোদনের ভিত্তিতেই ওষুধের দাম বাড়ানো হয়েছে। তবে কোনো কোম্পানি ফার্মেসি মালিকদের কাছে এসএমএস পাঠিয়ে ওষুধের দাম বাড়াচ্ছে বলে যে অভিযোগ এসেছে, তা অস্বীকার করেন তিনি।
সঠিক দাম জনগণ জানতে না পারায় ফার্মেসি মালিকরা ইচ্ছামতো দাম নিচ্ছেন বলে উল্টো অভিযোগ করেন নাজমুল হাসান পাপন। তাঁর সঙ্গে একমত পোষণ করেন ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের কর্মকর্তারাও। বৈঠকে ক্যাবের সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন কবির ভূঁইয়া বলেন, দফায় দফায় দ্রব্যমূল্য বাড়ানো হয়েছে। এখন ফের ওষুধের দাম বৃদ্ধি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। আমাদের দাবি, প্রয়োজনে সরকারের কাছ থেকে ভর্তুকি নিন, তবু ওষুধের দাম বৃদ্ধির করবেন না। এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দেওয়া একটি প্রতিবেদনে ওষুধের দাম কমাতে ১৭টি সুপারিশ করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
বৈঠকে ওষুধ বাজার নিয়ন্ত্রণে নানা পরিকল্পনার কথা জানান অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ ইউসুফ। তিনি বলেন, দেশে অত্যাবশ্যকীয় তালিকায় ২১৯টি ওষুধ রয়েছে। এর মধ্যে ১১৭টি ওষুধের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য নির্ধারণ করে দেয় ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর। এর বাইরে কোম্পানিগুলো ওষুধের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিলে সবকিছু বিবেচনা করে দাম নির্ধারণ করা হয়। এসব ওষুধের দাম ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। কোনো ওষুধেরই দাম অতিরিক্ত বাড়ানো হয়নি। অযৌক্তিকভাবে দাম বৃদ্ধির প্রমাণ দিতে পারেননি কেউ। তবে অতিরিক্ত দাম নিয়ন্ত্রণে মাঠ পর্যায়ে তদারকি করা হবে। জনবল সংকটের কারণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতা নিতে চিঠি দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া হাতের লেখা স্টিকার বানিয়ে, খুদে বার্তায় দাম বাড়ানো যাবে না। যদি এমন অভিযোগ পাওয়া যায়, সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এমনকি যেসব ফার্মেসি অনৈতিকভাবে ওষুধের দাম বাড়াবে, নিবন্ধন বাতিল করা হবে তাদের।
জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে পাঠানো চিঠিতে ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণে ১৭টি সুপারিশ করা হয়। এগুলো হলো– সব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে ওষুধ শিল্পের কাঁচামাল আমদানির জন্য এলসি খোলার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকারের নির্দেশনা দেওয়া যেতে পারে; ওষুধ শিল্পের কাঁচামালের ওপর শুল্ক হ্রাস বা প্রত্যাহার করা যেতে পারে, চাহিদামতো ওষুধ উৎপাদন যাতে বাধাগ্রস্ত না হয়, সেদিকে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের নজরদারি বৃদ্ধি; যেসব ওষুধের চাহিদা বেশি, সেগুলোর উৎপাদন ও সরবরাহ বৃদ্ধি করে বাজারে সংকট দূর করা; ফার্মেসিগুলো যেন বেআইনিভাবে মূল্যবৃদ্ধি করতে না পারে, সেদিকে তদারকি সংস্থার নজরদারি বৃদ্ধি; জাতীয় ঔষধ নীতি কঠোরভাবে অনুসরণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ, সরকার কর্তৃক অতি প্রয়োজনীয় ওষুধের মূল্য নির্ধারণ এবং নির্ধারণকৃত দামের অতিরিক্ত মূল্যে বিক্রয় বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ; জীবন রক্ষাকারী ওষুধগুলোর মূল্যের ওপর সরকারের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা; এ শিল্পের কাঁচামাল, ওষুধ ও বিভিন্ন চিকিৎসা সরঞ্জাম উৎপাদন, বাজারজাতকরণ ও মূল্য নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের সমন্বয়ে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ; ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর কর্তৃক প্রকাশিত নির্দেশক মূল্যের বাইরে যেন কোনো কোম্পানি ওষুধের দাম বাড়াতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে এবং বর্তমানে উৎপাদিত প্রায় দেড় হাজার জেনেরিকের সব ওষুধের যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণে অধিদপ্তরের কর্তৃত্ব বা এখতিয়ার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে।